বয়স ৪১ বছর ৩২১ দিন। ফুটবলের এই বয়সে অনেকেই বুটজোড়া তুলে রাখেন। অথচ সেই বয়সেই ইউরোপের সেরা ফুটবলার নির্বাচিত হয়েছিলেন ইংল্যান্ডের এক কিংবদন্তি। লিওনেল মেসি, ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো কিংবা করিম বেনজেমার মতো মহাতারকারাও যে কীর্তি গড়তে পারেননি, সাত দশক আগে তা করে দেখিয়েছিলেন স্ট্যানলি ম্যাথিউস। ১৯৫৬ সালে ব্যালন ডি’অরের প্রথম বিজয়ী হয়ে ইতিহাসের পাতায় নিজের নাম লিখিয়েছিলেন এই ইংলিশ উইঙ্গার। পেরিয়ে গেছে ৭০ বছর। কিন্তু ম্যাথিউসের সবচেয়ে বেশি বয়সে ব্যালন ডি’অর জয়ের রেকর্ড আজও অক্ষত।
১৯৫৬ সালের ১৮ ডিসেম্বর ব্ল্যাকপুলের হয়ে খেলা ম্যাথিউসের হাতে উঠেছিল প্রথম ব্যালন ডি’অর। তখন তার বয়স ৪১ বছর ৩২১ দিন। পুরস্কারটির ইতিহাসে তিনিই সবচেয়ে বেশি বয়সী বিজয়ী। ভোটাভুটিতে রিয়াল মাদ্রিদের আর্জেন্টাইন তারকা আলফ্রেডো ডি স্টেফানোকে পেছনে ফেলেছিলেন তিনি। ম্যাথিউস পেয়েছিলেন ৪৭ পয়েন্ট, ডি স্টেফানোর পয়েন্ট ছিল ৪৪। মাত্র তিন পয়েন্টের ব্যবধানে ইউরোপ সেরার স্বীকৃতি জিতেছিলেন ইংলিশ কিংবদন্তি।
তৃতীয় হয়েছিলেন ফরাসি মিডফিল্ডার রেমন্ড কোপা, তার পয়েন্ট ৩৩। হাঙ্গেরির কিংবদন্তি ফেরেঙ্ক পুসকাস ৩২ পয়েন্ট নিয়ে ছিলেন চতুর্থ স্থানে। ইউরোপের ১৬টি দেশের সাংবাদিকেরা ভোট দিয়েছিলেন সেই নির্বাচনে। প্রত্যেকে পাঁচজন করে ফুটবলারকে বেছে নেন। ম্যাথিউস পেয়েছিলেন প্রথম স্থান নির্ধারণী ছয়টি ভোট।
ড্রিবলিংয়ের জাদুকর
১৯১৫ সালে ইংল্যান্ডের স্টোক-অন-ট্রেন্টে জন্ম ম্যাথিউসের। তার ফুটবলীয় দক্ষতা ছিল অসাধারণ, বিশেষ করে ড্রিবলিংয়ে। প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগের খেলোয়াড়দের অনায়াসে কাটিয়ে যাওয়ার ক্ষমতা তাকে অন্যদের থেকে আলাদা করেছিল। এ কারণেই তার নাম হয়ে যায় ‘উইজার্ড অব দ্য ড্রিবল’ তথা ড্রিবলিংয়ের জাদুকর। অনেকে তাকে ‘দ্য ম্যাজিশিয়ান’ বা জাদুকর বলেও ডাকতেন।
মূলত রাইট উইঙ্গার হিসেবে খেলতেন ম্যাথিউস। তার ক্লাব ক্যারিয়ারের বড় অংশ কেটেছে স্টোক সিটি ও ব্ল্যাকপুলে। স্টোক সিটির হয়ে ইংলিশ ফুটবলের শীর্ষ বিভাগে ওঠার স্বাদ পেয়েছিলেন। তবে ক্লাবটির সঙ্গে তার সম্পর্ক সব সময় মসৃণ ছিল না। বোনাস নিয়ে বিরোধের জেরে একবার স্টোক ছাড়ার সিদ্ধান্তও নিয়েছিলেন। হাজারো সমর্থকের অনুরোধে শেষ পর্যন্ত সেই সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসেন।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ তার ক্যারিয়ারের সেরা সময়ের বড় একটি অংশ কেড়ে নেয়। যুদ্ধ শেষে আবারও মাঠে ফেরেন তিনি। কিন্তু স্টোক সিটিতে এক ম্যাচের একাদশে জায়গা না পাওয়া এবং পরের ম্যাচে সতীর্থের শেষ মুহূর্তের চোটে দলে ফেরার ঘটনা পুরোনো অসন্তোষকে উসকে দেয়। ১৯৪৭ সালে তাই ব্ল্যাকপুলে যোগ দেন ম্যাথিউস।
ব্ল্যাকপুলের তৎকালীন ম্যানেজার জো স্মিথ তাকে প্রশ্ন করেছিলেন, ‘তোমার বয়স ৩২। আরও কয়েক বছর খেলতে পারবে?’
ম্যাথিউসের পরবর্তী ক্যারিয়ারই ছিল সেই প্রশ্নের জবাব। ব্লুমফিল্ড রোডে নিজের স্বাভাবিক ছন্দে খেলার সুযোগ পেয়ে আরও উজ্জ্বল হয়ে ওঠেন তিনি। ব্ল্যাকপুলে যোগ দেওয়ার পরপরই তার পারফরম্যান্স তাকে ইংল্যান্ডের অন্যতম সেরা ফুটবলার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। ১৯৫৫-৫৬ মৌসুমে তার নৈপুণ্যে ব্ল্যাকপুল ইংলিশ শীর্ষ লিগে দ্বিতীয় স্থান অর্জন করে। ইউরোপের সেরাদের একজন হিসেবে তার অবস্থানও আরও সুদৃঢ় হয়।
৪১ বছরে কেন ইউরোপ সেরা?
১৯৫৬ সালে ফ্রান্স ফুটবল সাময়িকী প্রথমবারের মতো ব্যালন ডি’অর পুরস্কার চালু করে। স্বীকৃত সাংবাদিকদের ভোটে ইউরোপের সেরা ফুটবলার নির্বাচন করা হতো। সে সময় পুরস্কারটির যোগ্যতা ছিল সীমিত। ইউরোপের বাইরের অনেক দেশের তারকা ফুটবলার এতে অংশ নেওয়ার সুযোগ পেতেন না। শুরুর দিকে ইউরোপে খেলা ইউরোপীয় ফুটবলারদের মধ্যেই এটি সীমাবদ্ধ ছিল।
ম্যাথিউসের বয়স তখন ৪১ পেরিয়েছে। কিন্তু বয়স তার পারফরম্যান্সে বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি। ১৯৫৬ সালে ইংল্যান্ড জাতীয় দল অপরাজিত ছিল। ওই বছরের উল্লেখযোগ্য সাফল্যের মধ্যে ছিল ওয়েম্বলিতে ব্রাজিলকে ৪-২ গোলে হারানো ম্যাচটিও। সেই ম্যাচে আক্রমণভাগে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন ম্যাথিউস। জাতীয় দলের হয়ে তার ধারাবাহিক পারফরম্যান্সও ব্যালন ডি’অরের ভোটে প্রভাব ফেলেছিল।
শেষ পর্যন্ত ডি স্টেফানো ও কোপাদের মতো তারকাদের পেছনে ফেলে প্রথম ব্যালন ডি’অর জেতেন তিনি। বড়দিনের মাত্র এক সপ্তাহ আগে ব্ল্যাকপুল টাউন হলে তার হাতে পুরস্কার তুলে দেওয়া হয়। সেই মুহূর্তে হয়তো কেউ ভাবেননি, সাত দশক পরও তার বয়সের রেকর্ডটি অক্ষত থাকবে।