‘হামজা আসায় বাংলাদেশের ফুটবলে ক্রেজ বেড়েছে, সাফেও ভালো করবে’

দক্ষিণ এশিয়ার ফুটবলে একসময় ভারতের আধিপত্যের অন্যতম প্রতীক ছিলেন বাইচুং ভুটিয়া। তার নেতৃত্বে তিনবার সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ জিতেছে ভারত। ২০০৫ সালে বাংলাদেশের বিপক্ষে ফাইনালে গোল করে দলকে শিরোপা জেতানোর পাশাপাশি টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড়ও হয়েছিলেন তিনি।

দুই দশকের বেশি সময় পর বাংলাদেশের ফুটবলে নতুন আশার নাম হামজা দেওয়ান চৌধুরী। ইংলিশ ফুটবলে অভিজ্ঞ এই মিডফিল্ডারকে ঘিরে দেশের ফুটবলে তৈরি হয়েছে নতুন উন্মাদনা। হামজার আগমনে জাতীয় দলের শক্তি ও জনপ্রিয়তা বেড়েছে বলে মনে করেন ভারতের সাবেক অধিনায়ক বাইচুং ভুটিয়া। তার বিশ্বাস, আসন্ন সাফ চ্যাম্পিয়নশিপে বাংলাদেশ ভালো করবে এবং ভারতের জন্যও কঠিন প্রতিপক্ষ হয়ে উঠবে।

সাফের গুরুত্ব, দক্ষিণ এশিয়ার ফুটবলের ভবিষ্যৎ, হামজার প্রভাব এবং বাংলাদেশ-ভারত দ্বৈরথ নিয়ে বাংলা ট্রিবিউনের সঙ্গে কথা বলেছেন ৫০ বছর বয়সী সাবেক এই ফুটবলার।

প্রশ্ন: বাংলাদেশে অনুষ্ঠিতব্য সাফ চ্যাম্পিয়নশিপে ভারত দ্বিতীয় সারির দল পাঠাচ্ছে। বিষয়টি কীভাবে দেখছেন?

বাইচুং ভুটিয়া: ভারত দ্বিতীয় সারির দল পাঠিয়েছে-বিষয়টিকে এভাবে দেখা ঠিক হবে না। নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে বিশেষ ম্যাচ না থাকলে হয়তো মূল দলই খেলতে আসত। তারপরও যারা আসছে, তারা ভালো মানের খেলোয়াড়। আশা করি, টুর্নামেন্টে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ফুটবল হবে।

প্রশ্ন: অনেকে মনে করেন, সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের গুরুত্ব আগের তুলনায় কমছে। আপনি কী বলবেন?

বাইচুং ভুটিয়া: সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ গুরুত্ব হারাচ্ছে, এমনটা বলা ঠিক হবে না। এখন প্রতিটি দেশই র‍্যাঙ্কিংয়ে নিজেদের অবস্থান উন্নত করতে চায়। সে জন্য তারা শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিপক্ষে খেলতে আগ্রহী। সাফে ভারত র‍্যাঙ্কিংয়ে অন্যদের চেয়ে অনেক এগিয়ে, শিরোপাও জিতেছে সবচেয়ে বেশি। স্বাভাবিকভাবেই ভারত আরও ভালো দলের বিপক্ষে খেলে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করতে চাইবে। তবে আমি চাইব, ভারত সাফে নিয়মিত খেলুক। এতে এই অঞ্চলের ফুটবল নিয়ে আগ্রহ ও উত্তেজনা বজায় থাকবে। এখানকার প্রতিদ্বন্দ্বিতা আন্তর্জাতিক ফুটবলেও কাজে লাগবে।

প্রশ্ন: সাফের আকর্ষণ ও প্রতিদ্বন্দ্বিতা বাড়াতে কী ধরনের উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে?

বাইচুং ভুটিয়া: আমার মনে হয়, ফিফা যেমন আসিয়ান কাপকে নিজেদের টুর্নামেন্ট হিসেবে শুরু করেছে, সেভাবে সাফ চ্যাম্পিয়নশিপকেও আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া যেতে পারে। তাহলে টুর্নামেন্টটির গুরুত্ব বাড়বে। দেশগুলো আরও ভালো প্রস্তুতি নিয়ে আগ্রহের সঙ্গে অংশ নেবে। পাশাপাশি শুধু দক্ষিণ এশিয়ার দেশ নয়, চীনসহ আরও দু-একটি ভালো দলকে আমন্ত্রণ জানানো যেতে পারে। এতে টুর্নামেন্টের মান ও আকর্ষণ-দুটিই বাড়বে।

প্রশ্ন: বেঙ্গালুরুতে সর্বশেষ সাফে কুয়েত ও লেবাননের অংশগ্রহণের মতো উদ্যোগের কথা বলছেন?

বাইচুং ভুটিয়া: হ্যাঁ, ঠিক তেমনই। র‍্যাঙ্কিংয়ে এগিয়ে থাকা শক্তিশালী দেশগুলো অংশ নিলে প্রতিযোগিতা বাড়বে। ভারতের আগ্রহও আরও বাড়বে। টুর্নামেন্ট জমজমাট হবে, এর পরিধি বাড়বে এবং দর্শকদের কাছেও আকর্ষণীয় হয়ে উঠবে।

প্রশ্ন: দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশ এখন বিদেশে জন্ম নেওয়া বংশোদ্ভূত ফুটবলারদের জাতীয় দলে নিচ্ছে। বিষয়টিকে কীভাবে দেখছেন?

বাইচুং ভুটিয়া: এটি ইতিবাচক উদ্যোগ। বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা ও পাকিস্তান এ ক্ষেত্রে বেশ এগিয়ে আছে। বিদেশে জন্ম নেওয়া খেলোয়াড়দেরও নিজেদের দেশের হয়ে খেলার অধিকার রয়েছে। তাদের অন্তর্ভুক্তিতে দল শক্তিশালী হচ্ছে, খেলার মান বাড়ছে। ইউরোপের অনেক দেশও এভাবে উপকৃত হয়েছে। আমার মনে হয়, এর প্রভাব সাফের ফুটবলেও পড়বে। 

হামজা চৌধুরী।প্রশ্ন: বাংলাদেশ দলে হামজা দেওয়ান চৌধুরীর অন্তর্ভুক্তি দক্ষিণ এশিয়ার ফুটবলে কতটা প্রভাব ফেলেছে?

বাইচুং ভুটিয়া: হামজা আসায় বাংলাদেশের ফুটবলে ক্রেজ বেড়েছে। আমার মনে হয়, সাফেও বাংলাদেশ ভালো করবে। একটা সময় বাংলাদেশের ফুটবল কিছুটা ঝিমিয়ে পড়েছিল। এখন আবার খেলাটি নিয়ে বেশ আলোচনা হচ্ছে। শুধু হামজা নন, তার সঙ্গে আরও কয়েকজন বংশোদ্ভূত খেলোয়াড় রয়েছেন। সব মিলিয়ে আগের তুলনায় বাংলাদেশ দল অনেক শক্তিশালী হয়েছে।

প্রশ্ন: হামজাকে নিয়ে এশিয়ান কাপের বাছাইয়ে বাংলাদেশ অনেক বছর পর ভারতের বিপক্ষে জয় পেয়েছে। এই ফলকে কীভাবে দেখছেন?

বাইচুং ভুটিয়া: আমি আগেই বলেছি, বিদেশি বংশোদ্ভূত খেলোয়াড়দের নিয়ে দক্ষিণ এশিয়ার একাধিক দেশ ভালো করছে। তাদের খেলার মান বেড়েছে, জনপ্রিয়তাও বাড়ছে। হামজাকে কেন্দ্র করে বর্তমানে বাংলাদেশেও সেটি হচ্ছে। এটা ফুটবলের জন্য ভালো দিক। এশিয়ান কাপে ভারত বাংলাদেশের কাছে হেরেছে। দীর্ঘদিন পর বাংলাদেশের ফুটবলের জন্য এটি ছিল দারুণ উজ্জীবিত হওয়ার মতো একটি দিন। তাই আমার মনে হয়, সাফেও ভারতের সামনে বাংলাদেশ ভালো চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেবে। বাংলাদেশসহ অন্য দলগুলোকেও বেশ ভালো মনে হচ্ছে।

প্রশ্ন: হামজাকে ঘিরে তৈরি হওয়া উন্মাদনা কীভাবে কাজে লাগানো উচিত?

বাইচুং ভুটিয়া: হামজাকে কেন্দ্র করে যে উন্মাদনা তৈরি হয়েছে, সেটি তৃণমূল পর্যায়ে ছড়িয়ে দেওয়া উচিত। ফুটবলের জনপ্রিয়তা বাড়াতে এই সুযোগ কাজে লাগাতে হবে। শুধু বাংলাদেশ নয়, এই অঞ্চলের সব দেশের ক্ষেত্রেই কথাটি প্রযোজ্য। একজন তারকা ফুটবলারের জনপ্রিয়তাকে কেন্দ্র করে নতুন প্রজন্মকে খেলাটির প্রতি আগ্রহী করে তোলা সম্ভব।

প্রশ্ন: বাংলাদেশ-ভারত ম্যাচে সব সময়ই বাড়তি উত্তেজনা থাকে। দুই দেশের এই প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে কীভাবে দেখেন?

বাইচুং ভুটিয়া: অবশ্যই। আমরা যখন খেলেছি, তখনো বাংলাদেশ-ভারত ম্যাচে আলাদা আমেজ ছিল। এখনো সেটি আছে। সাফল্যের দিক থেকে ভারত অনেক এগিয়ে থাকলেও দুই দলের লড়াইয়ের উত্তেজনা কখনো কমেনি। সর্বশেষ ম্যাচেও ভারত হেরেছে। তাই আমার মনে হয়, সাফে বাংলাদেশ-ভারত লড়াই এবারও বেশ উপভোগ্য হবে। ভারতকেও টুর্নামেন্টটি গুরুত্বের সঙ্গে দেখতে হবে।

প্রশ্ন: বাংলাদেশের বিপক্ষে সাফে খেলার কোন স্মৃতি সবচেয়ে বেশি মনে পড়ে?

বাইচুং ভুটিয়া: ভারত দুবার বাংলাদেশের কাছে হেরেছে। তবে সৌভাগ্যবশত আমার খেলার সময়ে বাংলাদেশের কাছে কখনো হারিনি। বিষয়টি আমার কাছে ইতিবাচক স্মৃতি হয়েই আছে।

প্রশ্ন: ক্লাব ফুটবলেও বাংলাদেশের দলের বিপক্ষে খেলার অভিজ্ঞতা রয়েছে আপনার।

বাইচুং ভুটিয়া: হ্যাঁ। ১৭ বছর বয়সে আমি ইস্টবেঙ্গলে খেলেছি। এয়ারলাইন্স গোল্ডকাপে বাংলাদেশের ব্রাদার্স ইউনিয়নের বিপক্ষে প্রথম খেলেছিলাম। সেই ম্যাচের কথা এখনো মনে আছে।

প্রশ্ন: বাংলাদেশের প্রয়াত কিংবদন্তি ফুটবলার মোনেম মুন্নার সঙ্গে ইস্টবেঙ্গলে খেলার অভিজ্ঞতা কেমন ছিল?

বাইচুং ভুটিয়া: মোনেম মুন্না আমার সিনিয়র ছিলেন। ইস্টবেঙ্গলে তার অধীনে খেলেছি। সেই অভিজ্ঞতা ছিল অন্য রকম। আমরা শিরোপাও জিতেছিলাম। অসাধারণ একজন খেলোয়াড় ছিলেন তিনি।

প্রশ্ন: একসময় আবাহনী-মোহামেডান দ্বৈরথ উপমহাদেশের ফুটবলেও আলোচিত ছিল। এখন সেই প্রতিদ্বন্দ্বিতা অনেকটাই ম্লান। অথচ ভারতে ইস্টবেঙ্গল-মোহনবাগান দ্বৈরথ এখনো আগের মতোই জনপ্রিয়। এ বিষয়ে কী বলবেন?

বাইচুং ভুটিয়া: আসলে সবারই খারাপ সময় যায়। বাংলাদেশের ক্লাব ফুটবলেও হয়তো আবার সেই পুরোনো জৌলুস ফিরে আসবে। আবাহনী-মোহামেডানের মতো প্রতিদ্বন্দ্বিতা আপনাদের দেশে ফুটবলের জনপ্রিয়তা বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

প্রশ্ন: দক্ষিণ এশিয়ার কোনো দেশকে বিশ্বকাপে খেলতে দেখতে আর কত দিন অপেক্ষা করতে হবে?

বাইচুং ভুটিয়া: এ জন্য হয়তো আরও সময় লাগবে। বিশ্বকাপে খেলতে হলে শুধু পরিকল্পনা করলেই হবে না, সেটির সঠিক বাস্তবায়নও প্রয়োজন। আমার মনে হয়, সুষ্ঠু পরিকল্পনা ও তার যথাযথ বাস্তবায়ন থাকলে একসময় দক্ষিণ এশিয়ার কোনো দেশ বিশ্বকাপে খেলতে পারবে।

প্রশ্ন: ভারতে ক্রিকেট এক নম্বর খেলা। ফুটবল এখনো সব জায়গায় সেভাবে জায়গা করে নিতে পারেনি। এর কারণ কী?

বাইচুং ভুটিয়া: এ জন্য প্রয়োজন সঠিক পরিকল্পনা। তবে ভারতের প্রতিটি প্রদেশ বা জায়গায় ফুটবল জনপ্রিয় হতে হবে, এমন কোনো কথা নেই। উদাহরণ হিসেবে কেপ ভার্দের কথা বলা যায়। দেশটির জনসংখ্যা কত? অথচ তারা বিশ্বকাপে খেলেছে এবং ভালোও করেছে। জর্ডান ও উজবেকিস্তানও ভালো করছে। সেই তুলনায় আমাদের এই অঞ্চলের দেশগুলোর জনসংখ্যা ও আয়তন অনেক বেশি। আমার মনে হয়, সুষ্ঠু পরিকল্পনা থাকলে ভবিষ্যতে অনেক কিছুই সম্ভব।

এমনিতেই দক্ষিণ এশিয়ায় ক্রিকেটের জনপ্রিয়তা অনেক। তবে ভালো ফুটবল উপহার দিতে পারলে এবং খেলাটিকে যথাযথভাবে ছড়িয়ে দিতে পারলে এর জনপ্রিয়তাও বাড়বে।

প্রশ্ন: আট বছর পর ঢাকায় ফিরছে সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ। এবার শিরোপা কার হাতে উঠতে পারে?

বাইচুং ভুটিয়া: শিরোপা জেতার মতো কয়েকটি দল রয়েছে। স্বাগতিক হিসেবে বাংলাদেশও ভালো দল। কয়েকটি দলে বংশোদ্ভূত খেলোয়াড়ও আছে। ভারতও যথেষ্ট শক্তিশালী। আমার মনে হয়, এবার ভালো প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে। শিরোপার জন্য সবাই লড়াই করবে। শেষ পর্যন্ত কে জিতবে, তা বলা কঠিন।