২৩ বছর আগে ঢাকার জাতীয় স্টেডিয়ামে মালদ্বীপকে টাইব্রেকারে হারিয়ে প্রথমবারের মতো সাফ চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল বাংলাদেশ। সেই ঐতিহাসিক দলের গোলরক্ষক ছিলেন আমিনুল হক। দীর্ঘ চোট কাটিয়ে কীভাবে সাফের দলে ফিরেছিলেন, ফাইনালের রোমাঞ্চ, প্রয়াত কোচ জর্জ কোটানের অবদানসহ সবই তার স্মৃতিতে এখনো অমলিন। ২৩ বছর পর আবারও ঢাকার মাঠে সাফের শিরোপা জয়ের স্বপ্ন দেখছেন তিনি। ২০০৩ সালের শিরোপাজয়ী দলের অন্যতম সদস্য ও বর্তমান সরকারের ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক বাংলা ট্রিবিউনের সঙ্গে কথা বলেছেন সেই স্মৃতি ও নতুন করে শিরোপা জয়ের সম্ভাবনা নিয়ে।
প্রশ্ন: ২৩ বছর পর আবারও ঢাকায় সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ জেতার হাতছানি। ২০০৩ সালের সেই শিরোপাজয়ের স্মৃতি কতটা মনে পড়ে?
আমিনুল হক: একজন খেলোয়াড়ের স্বপ্ন থাকে সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ জেতা। আমার সৌভাগ্য হয়েছিল সাফের শিরোপার স্বাদ নেওয়ার। ২০০৩ সালের সেই দিনটি কখনও ভোলার নয়। এখনও মনে হয়, এই তো সেদিনের কথা। ঠাণ্ডা আবহাওয়ায় গ্যালারিভর্তি দর্শকের সামনে টাইব্রেকারে মালদ্বীপকে হারিয়ে শিরোপা জিতেছিলাম। সবাই মিলে যে উল্লাস করেছিলাম, সেটি ছিল দেখার মতো। এই স্মৃতি শুধু আমার নয়, দেশবাসীর কাছেও বিশেষভাবে স্মরণীয়।
প্রশ্ন: অথচ সেই সাফে আপনার খেলার কথাই ছিল না। চোট কাটিয়ে কীভাবে দলে ফিরেছিলেন?
আমিনুল: ২০০১ সালে চোটের কারণে প্রায় এক বছর মাঠের বাইরে ছিলাম। সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের চার মাস আগে মুম্বাইয়ে চিকিৎসক সামির দালভিরের হাতে অস্ত্রোপচার করিয়ে ঢাকায় ফিরি। এরপর জাতীয় দলের কোচ প্রয়াত জর্জ কোটান আমাকে ডাকেন। অস্ত্রোপচারের পর তখনও পুরোপুরি সুস্থ হইনি। কিন্তু কোটান ছিলেন আত্মবিশ্বাসী। নিজ উদ্যোগে আমাকে ফিট করে তোলার কাজ শুরু করেন। তার চেষ্টাতেই শেষ পর্যন্ত সাফের মঞ্চে নামার সুযোগ পাই। এরপর তো সব ইতিহাস।
প্রশ্ন: জর্জ কোটানের সেই বিশেষ উদ্যোগের কথা কি এখনও মনে পড়ে?
আমিনুল: কোটান ছিলেন আমার পিতৃতুল্য। আমি চিন্তাও করতে পারিনি, তখন ঢাকার সাফে খেলতে পারব। চোটে পড়ে দীর্ঘদিন খেলার বাইরে ছিলাম। তার ওপর মুম্বাইয়ে অস্ত্রোপচার করিয়ে আসার কয়েক দিন যেতে না যেতেই কোটান আমাকে খেলার জন্য প্রস্তুত হতে বললেন। আমি তো অবাক। কীভাবে সম্ভব! এরপর তিনি নিজেই আমাকে নিয়ে ঢাকা স্টেডিয়ামে ফিট করাতে লাগলেন। দিন গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে আমিও খেলার জন্য ফিট হয়ে গেলাম। এরপর তো ইতিহাসের সাক্ষী হলাম। এ জন্য কোটানের কাছে চিরকৃতজ্ঞ। তিনি না থাকলে হয়তো সাফের একমাত্র শিরোপাজয়ী দলের সদস্য হতে পারতাম না।
আমিনুল: আমরা ম্যাচ ধরে এগিয়েছিলাম। গ্রুপে সবার বাধা পেরিয়ে নকআউটেও অপ্রতিরোধ্য ছিলাম। ভারত ও মালদ্বীপ ফেভারিট ছিল। কিন্তু মাঠের পারফরম্যান্সে আমরা সবাইকে পেছনে ফেলে এগিয়ে যাই। মতিউর মুন্নার মিডফিল্ড থেকে করা অসাধারণ গোলে ভারতকে হারিয়েছিলাম। আর ফাইনালে ভাগ্যের পরীক্ষায় জিতে গেলাম। অসাধারণ এক স্মৃতি।
প্রশ্ন: ফাইনালের আগের রাতের অনুভূতি কেমন ছিল?
আমিনুল: ফাইনালের আগের রাতটা ছিল অন্যরকম। ট্রফি ছোঁয়ার এত কাছে দাঁড়িয়ে দলের অনেকেই ঠিকমতো ঘুমাতে পারিনি। সবার মধ্যে একটা অন্যরকম উত্তেজনা কাজ করছিল। তবে কোচ কোটানসহ দলের সবাই আমাদের সাহস জুগিয়েছিলেন। বলেছিলেন, ‘তোমরা পারবে।’ সেই আত্মবিশ্বাস নিয়েই মাঠে নেমেছিলাম।
প্রশ্ন: গ্রুপ পর্বে মালদ্বীপকে হারিয়েছিলেন। ফাইনালেও তাদের বিপক্ষে ম্যাচটি শেষ পর্যন্ত টাইব্রেকারে গড়ায়। সেই লড়াইয়ের কথা বলুন...
আমিনুল: গ্রুপ পর্বে মালদ্বীপকে ১-০ গোলে হারিয়েছিলাম। ফাইনালেও সেই প্রতিপক্ষ। নির্ধারিত ৯০ মিনিটে ১-১ গোলে ড্র হয়। অতিরিক্ত সময়েও ম্যাচের নিষ্পত্তি হয়নি। শেষ পর্যন্ত টাইব্রেকারে ভাগ্য পরীক্ষা দিতে হয়। টাইব্রেকার মানেই গোলকিপারের ওপর আস্থা বেড়ে যায় বহুগুণ। আগে থেকেই আমার ওপর সবার ভরসা ছিল যে, আমিনুল টাইব্রেকারে দারুণ করবে। করলামও তাই। ওদের শট রুখে দেওয়ার পর আমাদের সুজন শেষটা দারুণ করল। গোল করে সবাইকে আনন্দের ভেলায় ভাসিয়ে দিলো।
প্রশ্ন: ২৩ বছর পর আবারও কি সেই আনন্দের পুনরাবৃত্তি সম্ভব?
আমিনুল: কেন সম্ভব নয়? এই দলে হামজার মতো খেলোয়াড় আছে। আরও প্রবাসী খেলোয়াড় আছে। আমাদের স্থানীয়রাও খারাপ নয়। সবাই মিলে মাঠে সর্বোচ্চ চেষ্টা করলে ট্রফি আবারও জেতা সম্ভব। নিজেদের মাঠে এই সুযোগ হাতছাড়া করা ঠিক হবে না। আমাদের দলটি ভালো। আশা করি, ট্রফি জিতে দেশবাসীর মুখে হাসি ফোটাবে সবাই।
প্রশ্ন: হামজা ও অন্য প্রবাসী ফুটবলারদের অন্তর্ভুক্তি দলকে কতটা এগিয়ে রাখবে?
আমিনুল: অবশ্যই তারা দলের শক্তি বাড়িয়েছে। হামজার মতো মানসম্পন্ন খেলোয়াড় দলে থাকা বড় ব্যাপার। পাশাপাশি অন্য প্রবাসী খেলোয়াড়রাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে শুধু ব্যক্তিগত সামর্থ্য দিয়ে শিরোপা জেতা যায় না। স্থানীয় ও প্রবাসী ফুটবলারদের মধ্যে ভালো সমন্বয় থাকতে হবে। দল হিসেবে সবাইকে নিজেদের সেরাটা দিতে হবে।
প্রশ্ন: ২০০৩ সালের সেই শীতের সন্ধ্যার মতো আরেকটি স্মরণীয় রাত কি এবারও দেখতে চান?
আমিনুল: অবশ্যই। দেশের মাটিতে সাফ খেলা এবং শিরোপা জয়ের সুযোগ পাওয়া অনেক বড় ব্যাপার। ২০০৩ সালে আমরা পেরেছিলাম। এবারও আমাদের খেলোয়াড়দের সেই সামর্থ্য আছে। সমর্থকদের প্রত্যাশা অনেক। আশা করি, খেলোয়াড়রা সেই প্রত্যাশার প্রতিদান দিতে পারবে। আবারও দেশের মানুষ একসঙ্গে আনন্দ করার সুযোগ পাবে। ২০০৩ সালের সেই শীতের সন্ধ্যা থেকে রাত কখনও ভোলার নয়। এবারও তা দেখতে চাই।