আজিমপুরে বড় ভাইয়ের বন্ধুদের দেখে জুডোর প্রতি তার আগ্রহ জন্মে। সময় গড়াতে এই খেলায় এমনভাবে মজে গিয়েছিলেন যে অন্য কোনও পেশায় যাওয়ার চিন্তাও করেননি কামরুন নাহার হীরু। ’৮০-এর দশকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগে লেখাপড়া শেষ করে যখন বন্ধু-বান্ধবরা বিসিএস পরীক্ষা দিয়ে ক্যারিয়ারের নতুন দিক খুঁজে নিচ্ছিল, তখন হীরু সে পথে পা না বাড়িয়ে জুডোতেই থেকে যান। আর এখন তো দেশের ৫৪ ফেডারেশন ও অ্যাসোসিয়েশনের মধ্যে একমাত্র নির্বাচিত নারী সাধারণ সম্পাদক ৬২ বছর বয়সী সাবেক এই খেলোয়াড়।
১৯৭৭ সালে জুডোতে তার পা রাখা। সাফল্য পেতেও দেরি হয়নি। ১৯৮৬ পর্যন্ত টানা জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপের মুকুট ছিল তার মাথায়। এছাড়া ১৯৮১ সালে ইন্দোনেশিয়াতে চতুর্থ এশিয়ান জুডো চ্যাম্পিয়নশিপে ব্রোঞ্জ পদক জিতেছিলেন। মেয়েদের খেলা থেকে দেশের হয়ে ওটাই প্রথম পদক জয়।
খেলাধুলার পাশাপাশি পড়ালেখাতেও কম যাননি হীরু। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বেরিয়ে অন্য পেশাতে দৃষ্টি দেননি। খেলোয়াড়ি জীবন শেষে হন সংগঠক। আর এখন তো সময়ের বাঁকবদলে হীরুই ফেডারেশনের বড় কর্মকর্তার পদে আসীন।
২০২১ সালের অক্টোবরে জুডো ফেডারেশনের নির্বাচনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন। যদিও পথটা সহজ ছিল না। তার বাবা চাইতেনই না এমন খেলাতে মেয়ে থাকুক। বাংলা ট্রিবিউনকে হীরু সেই দিনগুলোর স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বলেছেন, ‘দেখা যেত ভোরে আমি দৌড়াতে যেতাম আর বাবা নামাজ পড়তে। তখন তার সঙ্গে দেখা হয়ে গেলে বিব্রত হতাম। বাবা চাইতেন না মার-দাঙ্গা খেলাতে থাকি। অন্য খেলাতে যাই। কিন্তু অনেক সাধনার পর রয়ে গেলাম। বড় ভাইয়ের বন্ধুদের দেখে মূলত আসা।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করে বেরিয়ে আসার পর বন্ধু-বান্ধবরা বিসিএসের মাধ্যমে ক্যারিয়ার খুঁজতে শুরু করলেও হীরুর মন নেই সেখানে। জুডোতে ক্যারিয়ার খুঁজতে লাগলেন। ১৯৮৬ সালে খেলা ছেড়ে সংগঠক হলেন। নির্বাহী কমিটিতে আসলেন। তারপর জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের জুডোর কোচের পদে চাকরি করেছেন দীর্ঘদিন।
আর এখন সেই প্রিয় খেলার ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক তিনি। বিসিএস দেননি বলে হীরুর কোনও পরিতাপ নেই, ‘তখন অনেকেই বলছে বিসিএস দিয়ে চাকরিতে ঢুকে পড়তে। কিন্তু নেশার কারণে রয়ে যাই। কারণ অন্য কাজে গেলে হয়তো খেলাধুলাতে থাকতে পারতাম না। এ নিয়ে আমার কোনও আফসোসও নেই।’
শুধু দেশেই নন, দেশের বাইরেও সফল হীরু। ২০০৩ সাল থেকে সাউথ এশিয়ান জুডো ফেডারেশনে স্পোর্টস ডিরেক্টর হিসেবে আছেন। চার বছর পরপর নির্বাচন হয় সেখানে। ২০১৯ সালে সবশেষ নির্বাচনেও জিতেছেন। এছাড়া এশিয়ান জুডো ফেডারেশনের স্পোর্টস কমিশনের সদস্য তিনি।
হীরু ২০১৬ সালেই দেশের জুডো ফেডারেশনে সাধারণ সম্পাদক হতে পারতেন। কিন্তু প্রতিদ্বন্দ্বী একেএম সেলিমের কাছে ১৬-১১ ভোটে হেরে স্বপ্নপূরণ হয়নি। কোনও এক ‘অদৃশ্য হাতের কারণে’ সেবার জিততে পারেননি। এবার কাউন্সিলররা তাকে পুরোপুরিভাবে সমর্থন দেওয়াতে নির্বাচনের প্রয়োজনই পড়েনি।
জুডো ফেডারেশনে শুধু সাধারণ সম্পাদকই মহিলা নন, আছে আরও ৬ জন নির্বাহী কমিটির সদস্য। এর মধ্যে একজন সহ-সভাপতি ও যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এবং বাকি চারজন সদস্য।
ছেলেদের সঙ্গে লড়াই করে এই পর্যন্ত আসতে কঠিন পথ পাড়ি দিতে হয়েছে হীরুকে। সেটা কীভাবে? হীরু শোনালেন, ‘কঠোর পরিশ্রম ও অধ্যবসায় থেকে এই পর্যন্ত এসেছি। আমি বিশ্বাস করি চেষ্টা করলে মানুষ সফল হতে পারবে। আমার এই পথচলায় কেউ সহযোগিতা করেছে, কেউ আবার পুরোপুরি সহযোগিতা করেনি্। আমার কথা হলো, এই পরিস্থিতিতে লড়াই করতে হবে। পেছনে ফিরে তাকালে চলবে না।’
আর ফেডারেশনের নির্বাহী কমিটিতে মেয়েদের আধিক্য নিয়ে এই কর্মকর্তার ব্যাখ্যা, ‘সবচেয়ে বেশি মেয়ে কর্মকর্তা এই ফেডারেশনে। সারা দেশ থেকে মেয়েরা যারা ভালো করছে, তাদের নির্বাহী কমিটিতে জায়গা হয়েছে। অনেক সময় কাউন্সিলর হয়ে আসাটা কঠিন। তারপরও আমরা চেষ্টা করছি তাদেরকে এগিয়ে আনার। চেষ্টা করছি জায়গা দেওয়ার।’
আগের চেয়ে মেয়েদের অংশগ্রহণ বাড়ছে জুডোসহ অন্য খেলাতে। হীরু তাই আশাবাদী, ‘নারীদের স্বাধীনতা না থাকলে এগিয়ে যাওয়া যায় না। কাজের পরিবেশ করে দিতে হবে। তাহলেই এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ হবে। আমি চাই সামনের দিকে জুডোর আরও প্রসার ঘটাতে। এসএ গেমসে পদক জিততে।’