দারিদ্র্যতার শেকল ভেঙে নিজেকে সেরা প্রমাণ করে অনেক দিন ধরেই দেশের গলফের পোস্টার বয় সিদ্দিকুর রহমান। দেশে গলফ যে পরিচিতি পেয়েছে, তাতে ৪০ বছর বয়সী গলফারের অবদান অনেক। পেশাদার ক্যারিয়ারে এশিয়ান ট্যুরে দুটি শিরোপা জিতেছেন। এছাড়া নিয়মিত লাল-সবুজ পতাকা গায়ে চড়িয়ে দেশ-বিদেশে খেলে যাচ্ছেন। তবে এবারই র্যাঙ্কিংয়ে ৮৩-তে নেমে যাওয়ায় ট্যুর কার্ড হারিয়ে এশিয়ান ট্যুরের সব টুর্নামেন্ট খেলতে পারছেন না। এ নিয়ে কথা হতেই সিদ্দিকুর নিজের অনেক অজানা কথাই বাংলা ট্রিবিউনের কাছে মেলে ধরেছেন।
বাংলা ট্রিবিউন: এশিয়ান ট্যুরে আগের মতো সব জায়গায় খেলতে পারছেন না। নিশ্চয়ই খারাপ তো লাগছেই..
সিদ্দিকুর: খারাপ তো লাগবেই। এখন লো র্যাঙ্কিং ও অভিজ্ঞতা দিয়ে খেলতে হচ্ছে। আগের চেয়ে এশিয়ান ট্যুরে প্রতিদ্বন্দ্বিতা অনেক বেড়েছে। গত বছর এশিয়ান ট্যুরে ইউরোপের ও বিশ্বসেরা অনেকে খেলেছেন। টুর্নামেন্টগুলো অনেক প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হয়ে গেছে, যে কারণে এই অবস্থা।
তবে খারাপ লাগলেও একটা কথা তো মনে রাখতে হবে, সবার ক্যারিয়ারে উত্থান-পতন থাকেই।
আপনি দুটো এশিয়ান ট্যুর জিতেছেন। সবশেষ ২০১৩ সালে ভারতে। এরপর আর শিরোপা জিততে পারেননি। যদিও ক্যারিয়ারে অন্য ট্রফিও কম নয়। এখনও সামনের দিকে এশিয়ান ট্যুরের শিরোপা দেখেন?
সিদ্দিকুর: যদি র্যাঙ্কিং ভালো হয়। তাহলে হয়তো আবারও এশিয়ান ট্যুরে সরাসরি খেলার সুযোগ হতে পারে। আর কে না চায় শিরোপা জিততে। আমিও চাই। তবে এর জন্য অনেক সাধনা ও রসদ প্রয়োজন। শারীরিক, মানসিক, টেকনিক্যাল সব দিক থেকেই কাজ করতে হবে আরও বেশি।
একটু বিস্তারিত খুলে বলবেন?
সিদ্দিকুর: দেখুন সবাই শুধু আমার শিরোপাটাই দেখে। সিদ্দিকুর কি চ্যাম্পিয়ন হতে পারলো? কত টাকা পেলো? খোঁজ নিতে থাকে। খারাপ করলে কেউ খবর রাখে না। ঠিক আছে তা আমি মানছি। কিন্তু সবাই কী জানে একজন সিদ্দিকুর কীভাবে বছরের পর বছর পেশাদার গলফ খেলে আসছে?
এই যেমন আমার ফিটনেস ও পারফরম্যান্স ধরে রাখতে বছরে এক কোটি টাকার মতো ব্যয় হয়। সবাই শুধু সাফল্য চায়। এই অর্থ যুক্তরাষ্ট্রে অনুশীলন, মনোবিদ, টুর্নামেন্টে অংশগ্রহণ, যাতায়াত, থাকা-খাওয়া ও অন্যান্য কিছুতে ব্যয় হয়। এই টাকা তো আমার পকেট থেকে দিতে হচ্ছে।
এই অর্থ তো আমাকে কোনও স্পন্সর কিংবা অন্য কেউ দেয় না। আমাকে অনেক কষ্ট করে জোগাড় করে নিতে হয়। সবসময় খেলে তো অনেক টাকা পাওয়া যায় না।
এছাড়া এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় যেতে হলে ভিসার জন্য দৌড়াদৌড়ি করতে হয়। এক হাতে সবকিছুই আমার জন্য কঠিন। তাও আমার সয়ে গেছে।
এখন তো বলতে পারি ক্যারিয়ারে কিছুটা খারাপ সময় যাচ্ছে...
সিদ্দিকুর: তা যাচ্ছে। তবে আমি তো খেলে যাচ্ছি। ওমানে যেতে পারলাম না। ভিসা সমস্যার জন্য। সামনে ম্যাকাও যাবো। আগে সরাসরি খেলতাম। এখন লো র্যাঙ্কিংয়ে থেকে খেলতে হচ্ছে।
একটা দিক মনে রাখতে হবে। গত প্রায় ১৫ বছর ধরে আমি বাংলাদেশের পতাকা নিয়ে দেশ-বিদেশে প্রতিনিধিত্ব করে আসছি। সারা বিশ্বের এত গলফারের মধ্যে আমি একমাত্র দেশের প্রতিনিধিত্ব করে আসছি। এটা কি কম বড় বিষয় নয়। টানা এশিয়ান ট্যুরে খেলছি। কখনও ভালো হয়েছে, কখনও খারাপ হয়েছে। দেশের হয়ে এতদিন ধরে প্রতিনিধিত্ব করে আসছি এটাও বা কয়জন পারে।
আমার কাছে মনে হয় শুধু ট্রফি বা শিরোপা বড় বিষয় নয়, দেশের হয়ে টানা খেলছি। দেশকে প্রতিনিধিত্ব করছি। বিশ্বের সবাই জানতে পারছে, বাংলাদেশের কেউ গলফ খেলতে পারছে। এটাও আমি মনে করি বড় ইতিবাচক দিক।
আপনার পর কেউ এখনও পেশাদার সার্কিট তথা এশিয়ান ট্যুরে সেভাবে নাম লেখাতে পারেনি। জামাল-সোহেলরা এগিয়ে এলেও আপনার কাছাকাছি যেতে পারেননি...
সিদ্দিকুর: কেন বাংলাদেশে গলফ সেভাবে এগোতে পারেনি, তা আপনারাই ভালো বুঝবেন। আমি তো আমার মতো চেষ্টা করে এই পর্যন্ত এসেছি। অন্যরা কম চেষ্টা করছে না। হয়তো সামনের দিকে একসময় ওরা আরও ভালো করবে। তবে এটা ঠিক, যদি অবস্থাপন্ন ঘরের ছেলেমেয়েরা পেশাদার গলফ খেলতো, দেশের গলফের চেহারা আরও বদলে যেতে পারতো। তখন এই খেলাটির দিকে সবার আরও জোর দেওয়ার সুযোগ হতো। এমন হলে কি ভালো হতো না?
আমরা শেষের দিকে চলে এসেছি। গলফ খেলে আপনি পরিতৃপ্ত কিনা..
সিদ্দিকুর: অবশ্যই। গলফ খেলেই আমার ভাগ্য পরিবর্তন হয়েছে। অর্থনৈতিকসহ সব দিক দিয়ে। এছাড়া সবাই আমাকে চেনে জানে। তবে পারফরম্যান্স খারাপ হলে যখন সমালোচনা হয়, তখন খারাপ লাগে। টুর্নামেন্টে শিরোপাই যে সবসময় সবকিছু নয়, টিকে থাকাটাও অনেক সময় বড় বিষয় থাকে, কঠিন হয়ে পড়ে, তা অনেকেই বুঝতে চায় না।
কতদিন গলফ খেলার ইচ্ছা আছে?
সিদ্দিকুর: যতদিন নিজের কাছে ভালো লাগবে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজেকে ফিট দেখতে পাবো। ভালো কিছু করার সম্ভাবনা থাকবে, ততদিন খেলবো। আমি মনে করি এখনও আমার অনেক কিছু দেওয়ার আছে।
আপনার জন্য শুভকামনা।
সিদ্দিকুর: ধন্যবাদ আপনাকে।