মোবাইলফোন অপারেটরগুলোর ডিজিটাল সার্ভিস দেশীয় ই-কমার্স উদ্যোক্তাদের জন্য হুমকি?

 

e-commerce-catalog_51728মোবাইলফোন অপারেটরগুলোর ডিজিটাল সেবার মোড়কে ই-কমার্স সেবাকে হুমকি মনে করছেন দেশীয় ই-কমার্স উদ্যোক্তারা। তারা মনে করছেন, এর ফলে নেট নিউট্রালিটিতে (নিরপেক্ষতা) অসাম্য দেখা দেবে।  ফলে কোনও সুষ্ঠু প্রতিযোগিতা এই খাতে থাকবে না। দেশীয় ছোট ছোট ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানগুলো প্রতিযোগিতায় টিকতে না পেরে হারিয়ে যাবে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বর্তমানে দেশীয় ই-কমার্সের বার্ষিক লেনদেন ৩৫০ কোটি টাকার। একদিনে তা আজকের অবস্থানে আসেনি। ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের নিরলস শ্রম ও আর্থিক ক্ষতির বিনিময়ে দেশের ই-কমার্স খাত আজ  একটি শক্ত ভিত্তি পেয়েছে। বাজার তৈরি হয়েছে। এই তৈরি বাজারে এখন রাঘব বোয়ালরা ঢুকতে চাইছে। যা হুমকির মুখে ঠেলে দিয়েছে দেশীয় উদ্যোক্তাদের। তারা আরও বলছেন, ই-কমার্স খাতে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ৫ হাজার উদ্যোক্তা রয়েছেন, যাদের অধিকাংশই ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা। এই খাতে ৩ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। আগামী ৫ বছরের মধ্যে দেশের খুচরা বাজারগুলোর ২ থেকে ৩ শতাংশ অনলাইনে আনা সম্ভব হলে অনলাইন বাজারের পরিমাণ দাঁড়াবে প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা। যেখানে অন্তত ১০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে। তাদের অভিযোগ, সম্ভাবনাময় এই খাতটিকে নষ্ট করার সুগভীর ষড়যন্ত্র চলছে। ই-কমার্সের কোনও নীতিমালা ও গাইডলাইন না থাকায় ডিজিটাল সেবাদাতারা এই সুযোগটি নিচ্ছেন বলে তারা মনে করেন।

প্রসঙ্গত, দেশে ই-কমার্স খাত একটি বিকাশমান খাত হওয়ার পরও  কোনও নীতিমালা বা গাইডলাইন নেই ।      

ডিজিটাল সার্ভিসে তথা মোবাইলফোন অপারেটরগুলোর ই-কমার্সে  বিষয়ে বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার অ্যান্ড সার্ভিসেস (বেসিস) -এর সভাপতি মোস্তাফা জব্বার বলেন, ‘কোনও সন্দেহ নেই যে, বাংলাদেশের মোবাইল বিপ্লবে টেলিকম অপারেটরদের বিরাট অবদান আছে। কিন্তু এজন্য তাদের হাতে পুরো দেশ কি জিম্মি হতে পারে? তারা তাদের ইচ্ছামতো ইন্টারনেটের দাম নির্ধারণ করছে। ইচ্ছামতো প্যাকেজ বানাচ্ছে। ওরা কিনছে ব্যান্ডউইথ, আর বিক্রি করছে ডাটা। ওরা ভ্যালু অ্যাডেড সেবার পুরোটা গিলে খেতে চাইছে। শুরুতে ওরা পাইরেসিতেই লিপ্ত ছিল। ক’দিন আগে ভাস-এর শেয়ার তারা ৫০:৫০ -কে ৭০:৩০ করতে চেয়েছিল। ওরা এসএসডি কোড কাউকে দেয়, কাউকে দেয় না। মোবিক্যাশ ছাড়া ওদের সঙ্গে ব্যবসা করা যায় না। এবার তারা আমাদের ছোট ছোট ই-কমার্স উদ্যোক্তাদের পেটে লাথি মারতে ই-কমার্স গিলে খেতে চাইছে। টেলিকম অপারেটরের কর্তব্য হচ্ছে অন্যের সীমানায় নাক না গলিয়ে নিজের কাজটা ভালোভাবে করা।’

ই-কমার্স উদ্যোক্তারা বলছেন, ‘এই খাতে ইতোমধ্যে বড় বড় কোম্পানি বিশেষ করে টেলিকম অপারেটরের সক্রিয় অংশগ্রহণ শুরু হয়েছে। তারা টেলিকম সেবাদানের অনুমোদন পেলেও এই খাতে ব্যবসা শুরু করছেন। যা দেশের তরুণ ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য হুমকিস্বরূপ। এসব কোম্পানির অত্যধিক বিনিয়োগের ফলে বাজারে একটি অসম প্রতিযোগিতা শুরু হচ্ছে। তারা নিজেদের নেটওয়ার্কের মাধ্যমে সম্ভাব্য ভোক্তাদের বিনামূল্যে সাইট ভিজিট করতে দিচ্ছে। এছাড়া লোভনীয় নানা অফার তো থাকছেই। তাদের উপস্থিতির ফলে দেশীয় কোম্পানিগুলোর টিকে থাকা দায় হবে।’ ডাটা প্রোটেকশনের কোনও আইন দেশে নেই উল্লেখ করে তারা বলেন, ‘ডাটা প্রোটেকশন অ্যাক্ট না থাকায় টেলিকম অপারেটররা এ ধরনের সুযোগ নিচ্ছে। এই আইন থাকলে ডাটা (ইন্টারনেট) নিয়ে যেকেউ যেকোনও ধরনের কাজে ব্যবহার করতে পারত না।’ তারা আশঙ্কা করেন, ‘অসম প্রতিযোগিতা শুরু হলে টেলিকম অপারেটরগুলো তাদেরগুলো ছাড়া বাকি ই-কমার্সগুলোর (দেশীয়) গতি ধীর করে দিতে পারে, ব্লকও করে দিতে পারে।’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে মোবাইলফোন অপারেটরগুলোর সংগঠন অ্যামটবের মহাসচিব টিআইএম নূরুল কবির বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এটা তো ন্যাচারাল। মোবাইলে ভয়েসের দিন শেষ হয়ে আসছে। এখন হলো ডাটার (ইন্টারনেট) সময়। ডাটা রিলেটেড (সম্পর্কিত) সেবা আসবে, এটাই বাস্তবতা।’

জানতে চাইলে গ্রামীণফোনের হেড অব করপোরেট অ্যাফেয়ার্স অফিসার মাহমুদ হোসেইন বলেন, ‘আমরা যেসব সেবা দেই তার সবকিছুই ডিজিটাল। এজন্য আমরা এখন বলছি, গ্রামীণফোন ডিজিটাল সার্ভিস প্রোভাইডার। সবকিছু এখন ডিজিটাল সার্ভিসে চলে আসছে। এটা হলো আসলে ডাটার বহুমুখী ব্যবহার।’ গ্রামীণফোনের  আরেক কর্মকর্তা বলেন, ‘নতুন করে কিছু করছি না। আমরা তো আগে থেকেই (এগ্রিগেটর হিসেবে) মার্কেটে ছিলাম। মার্কেটে একাধিক উদ্যোক্তা থাকলে মার্কেটের গ্রোথ ভালো হয়, বাজার বড় হয়। গ্রাহকরা আরও উন্নত সেবা পান।’

এদিকে মোবাইল অপারেটর রবির ডিজিটাল সার্ভিস বিভাগের কান্ট্রি হেড মানজুর রহমান খান বলেন, ‘আমরা ডিজিটাল সার্ভিস মার্কেটটা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছি। তবে আমাদের সক্রিয়ভাবে ই-কমার্স মার্কেটে আসার পরিকল্পনা রয়েছে। এখন  ভিন্নরূপে মার্কেটে থেকে বাজার বোঝার চেষ্টা করছি।’

সরকারের তথ্য ও যোগাযাগ প্রযুক্তি (আইসিটি) বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, সরকার ই-কমার্স নীতিমালা করতে যাচ্ছে। এরই মধ্যে ই-কমার্স উদ্যোক্তাদের উদ্যোগে নীতিমালার খসড়া তৈরি করা হয়েছে। আগামী ২৮ অক্টোবর আইসিটি বিভাগের সম্মেলন কক্ষে এই নীতিমালা চূড়ান্তকরণের জন্য বৈঠক ডাকা হয়েছে। ওই বৈঠকে বাণিজ্যমন্ত্রী, আইসিটি বিভাগের প্রতিমন্ত্রীসহ সংশ্লিষ্টরা উপস্থিত থাকবেন। আরও জানা গেছে, ই-কমার্স বাণিজ্য মন্ত্রণালয় নাকি আইসিটি বিভাগের অধীনে থাকবে তা এখনও চূড়ান্ত হয়নি। ওই বৈঠকে বিষয়টি চূড়ান্ত হতে পারে।

আরও পড়ুন: কানাডা যাওয়ার কথা বলে 'মেজর' পদ ছেড়েছিল জাহিদ!

/এমএনএইচ/আপ-এআর/