মোবাইল ফোন ভিত্তিক ভারতীয় কনটেন্ট নির্মাতা প্রতিষ্ঠান হাঙ্গামা (বাংলাদেশ) প্রাইভেট লিমিটেডের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু হয়েছে। টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিটিআরসি’র কাছ থেকে তদন্ত প্রতিবেদন পেলে হাঙ্গামার বিরুদ্ধে ওঠা ‘অস্বাভাবিক ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড’ -এর জন্য ব্যবস্থা নেবে বাংলাদেশ ব্যাংক। সংশ্লিষ্ট বিভাগে কথা বলে এ তথ্য জানা গেছে। এদিকে বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অফ সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিস (বেসিস) ভ্যালু অ্যাডেড সার্ভিস (ভাস)এর গাইডলাইন দাবি করেছে। সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, গাইডলাইন না হলে দেশীয় এই শিল্পটি একেবারে ধ্বংস হয়ে যাবে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিটিআরসি’র এক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা নাম ও পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে জানান, মোবাইল ফোন অপারেটরগুলো এখনও হাঙ্গামার বিষয়ে কোনও প্রতিবেদন দেয়নি। তাদের জবাব এলে তা যাচাই করে দেখা হবে।
ওই কর্মকর্তা বলেন, ‘কমিশন থেকে বাংলাদেশ ব্যাংককে প্রতিবেদন পাঠানো হবে। যেহেতু ভাস সেবার কোনও গাইডলাইন নেই, লাইসেন্সিং অথরিটিও নেই। কমিশন এসবের কোনও বিষয়ই দেখে না। ফলে হাঙ্গামা (বাংলাদেশ) প্রাইভেট লিমিটেডের এই বিষয়গুলো তাদের এখতিয়ারভুক্ত নয়- মূলত এসব বিষয়ই চিঠিতে উল্লেখ করা হবে বলে তিনি জানান।’
অন্যদিকে, দেশীয় কনটেন্ট নির্মাতা প্রতিষ্ঠান (মোবাইলের রিংটোন, ওয়েলকাম টিউন, ওয়ালপেপার ইত্যাদির নির্মাতা প্রতিষ্ঠান) এবং সফটওয়্যার নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর সংগঠন বেসিস ভাস (ভ্যালু অ্যাডেড সার্ভিস-ভিএএস) গাইডলাইন নিয়ে যুদ্ধ ঘোষণা দিয়েছে। সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, গাইডলাইন না হলে দেশীয় এই শিল্পটি একেবারে ধ্বংস হয়ে যাবে।
প্রসঙ্গত, মাত্র দুই লাখ টাকা বিনিয়োগ করে বাংলাদেশ থেকে দুই বছরে প্রায় ১৩ কোটি টাকা লাভ নিয়ে গেছে ভারতীয় কোম্পানি হাঙ্গামা। এই টাকা কোম্পানিটির মূলধনের প্রায় ৩২০ গুণ। এ বিষয়টিকে ‘অস্বাভাবিক ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড’ হিসেবে দেখছে বাংলাদেশ ব্যাংক । এ কারণে কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রতিষ্ঠানটির বিষয়ে জানতে চেয়ে বিটিআরসিতে চিঠি দিয়েছে। হাঙ্গামা’র বিরুদ্ধে বাংলাদেশ ব্যাংকের অভিযোগ, দুই লাখ টাকা বিনিয়োগ করে ২০১৫ সালে ৬ কোটি ৭৪ লাখ ৮১ হাজার ২৫০ এবং ২০১৪ সালে ৬ কোটি ৭ লাখ ৩৩ হাজার ১২৫ টাকা লভ্যাংশ বাবদ ভারতে পাঠানো হয়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক অনুসন্ধান করে দেখেছে, হাঙ্গামার কর্মীসংখ্যা মাত্র এক জন। এছাড়া স্থায়ী কোনও স্থাপনা নেই। স্থায়ী স্থাপনাবিহীন ‘স্বল্প মূলধনী’ এ প্রতিষ্ঠানটি এক জন মাত্র কর্মী দিয়ে মূলধনের প্রায় ৩২০ গুণ লভ্যাংশ ভারতে পাঠানোর বিষয়টিকে ‘অস্বাভাবিক ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড’ বলে অভিহিত করছে বাংলাদেশ ব্যাংক। বিটিআরসিকে দেওয়া তাদের চিঠিতে ‘হাঙ্গামা’কে ‘শতভাগ বিদেশি মালিকানাধীন অখ্যাত একটি কোম্পানি’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রা বিনিয়োগ বিভাগ-প্রফিট, ডিভিডেন্ড রেমিটেন্স শাখায় হাঙ্গামার বিষয়ে জানতে চাইলে কেউই নিজেকে উদ্ধৃত করে কথা বলতে রাজি হননি। তবে নাম, পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে একজন কর্মকর্তা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন,‘হাঙ্গামার ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডে এক্সট্রা কিছু পাওয়া গেছে বলেই তো আমরা বিটিআরসির কাছে বিস্তারিত জানতে চেয়েছি।’ জবাব পেলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক তার বিধি মোতাবেক ব্যবস্থা গ্রহণ করবে বলে তিনি জানান। এক প্রশ্নের জবাবে ওই কর্মকর্তা বলেন,‘২০১৪ এবং ২০১৫ সালের লভ্যাংশ তারা নিয়ে গেছে। ২০১৬ সালের লভ্যাংশ নেওয়ার জন্য হাঙ্গামা এখনও আবেদন করেনি।’ আবেদন করলে কী করা হবে জানতে চাইলে তিনি বলেন,‘বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’
অন্যদিকে, হাঙ্গামার বিষয়ে প্রতিবেদন প্রকাশের পরে বিটিআরসিতে একাধিক শিল্পী যোগাযোগ করেছেন। তাদের অভিযোগ মোবাইলফোন অপারেটরগুলো তাদের গান ব্যবহার করলেও কোনও টাকা পয়সা দেয় না। এ বিষয়ে তারা বিটিআরসিকে উদ্যোগ গ্রহণ করতে বলেন। বিটিআরসি’র এক কর্মকর্তা জানান, ভাস গাইডলাইন না থাকায় এ বিষয়ে কমিশনের বিশেষ কিছু করার নেই। একটি নীতিমালা থাকলে সেই আলোকে উদ্যোগ গ্রহণ করা যেত বলে তিনি মনে করেন। তিনি জানান, ভাস গাইডলাইনটি এখন খুবই জরুরি হয়ে গেছে।
জানতে চাইলে বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেসের (বেসিস) সভাপতি মোস্তাফা জব্বার বলেন, ‘বেসিস থেকেই কনটেন্টের বিষয়টি দেখা হয় কিন্তু আমরা কিছুই করতে পারিনি। অনেকদিন আগে একবার আমরা (মোবাইলফোন অপারেটর, বিটিআরসি, বেসিস, টেলিকম অধিদফতর) বসেছিলাম ভাস গাইডলাইন নিয়ে। তারপর আর কোনও অগ্রগতি হয়নি। বছরের পর বছর গেছে। আমরা ভাস গাইডলাইন তৈরি করতে পারিনি। ’
মোস্তাফা জব্বার বলেন, ‘মোবাইলফোন অপারেটররা ভাস নিয়ে আমাদের সঙ্গে অনাচার করছে। ওদের কারণেই দেশের কনটেন্ট ইন্ডাস্ট্রি বাড়েনি। দেশীয় এই শিল্পকে ওরা গলাটিপে হত্যা করেছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা এবার শক্ত আছি। অনেক কিছু নিয়েই তো আমাদের প্রতিনিয়ত যুদ্ধ করতে হচ্ছে। এবার আমরা কনটেন্ট ও ভাস গাইডলাইন নিয়ে যুদ্ধ ঘোষণা করলাম।’
মোবাইল কনটেন্ট নির্মাতা প্রতিষ্ঠান এরিনাফোন বিডির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফজলে রাব্বি বলেন, ‘যুদ্ধ করে এখনও টিকে আছি। অনেকে হারিয়ে গেছে। কিন্তু এভাবে টিকে থাকা যায় না। ভাস গাইডলাইন ছাড়া আমাদের দেশে কনটেন্ট ‘ইন্ডাস্ট্রি’ টিকবে না।’ আবারও তিনি আশার আলো দেখছেন, এবার ভাস গাইডলাইন হবে বলে জানান । সম্প্রতি অনেকের সঙ্গে কথা হয়েছে তার। সবাই এবার আশাবাদী। এরপরও যদি ভাস গাইডলা্ইন না হয় তাহলে এ ধরনের একাধিক বিদেশি প্রতিষ্ঠানের খবর বেরিয়ে আসবে বলে তিনি মনে করেন।
/এইচএএইচ/ এপিএইচ/
আরও পড়তে পারেন: মাত্র ২ লাখ টাকা বিনিয়োগ করে ১৩ কোটি টাকা নিয়ে গেলো ভারতীয় কোম্পানি ‘হাঙ্গামা’