সরকার ফেসবুক বন্ধ রাখলেও দেশের ফেসবুকপ্রেমীরা বিকল্প পথে ফেসবুকে প্রবেশ করতে থাকেন।যদিও এ সময় ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের প্রতিমন্ত্রী তারানা হালিম বলেছিলেন, যারা বিকল্প পথে ফেসবুকে প্রবেশ করছেন তারা সরকারের নজরদারিতে রয়েছেন। একইসঙ্গে বিতর্ক ওঠে কয়েকজন মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও সংসদ সদস্যের ফেসবুক ব্যবহার নিয়ে। সরকার পক্ষ থেকে বলা হয়, যারা (মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও সংসদ সদস্য) ফেসবুকে ঢুকছেন তারা আসলে বিকল্প পথে নয়, সরাসরিই ফেসবুকে ঢুকছেন গোয়েন্দাগিরি করতে।
তারপরও চারদিকে আওয়াজ ওঠে বিকল্প পথে নয়, সরাসরি ফেসবুকে ঢুকতে চান তারা। সরকার থেকেও বার বার আশ্বস্ত করা হয় আইন শৃঙ্খলাবাহিনীর সবুজ সংকেত পেলেই খুলে দেওয়া হবে ফেসবুক। কিন্তু দিন যেতে থাকে। অশান্ত হয়ে উঠতে থাকেন ফেসবুকপ্রেমীরা। বন্ধের দুই তিনদিনে ফেসবুক ব্যবহারকারীর সংখ্যা (মোট ব্যবহারকারী পৌনে দুই কোটি) ১০-২০ শতাংশে নেমে আসে। মোবাইলফোন অপারেটরগুলোর ব্যান্ডউইথের বিক্রি কমতে থাকে। এক পর্যায়ে ব্যান্ডউইথ বিক্রি ৫০ ভাগের নিচে চলে আসে। অনেক ফেসবুক ব্যবহারকারী এ সময় ইন্টারনেট ব্যবহার থেকেও বিরত থাকেন। দেশের সাড়ে পাঁচ কোটি ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর মধ্যে মাত্র দুই কোটি নেটপ্রেমী এসময় নেটে ছিলেন বলে জানান সংশ্লিষ্টরা। মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়ে এফ-কমার্স-এ জড়িতরা। ফেসবুককে কেন্দ্র করে যেসব ই-কমার্স উদ্যোক্তা আত্মপ্রকাশ করেছিলেন তাদের প্রতিদিন প্রায় ১০-১৫ লাখ টাকা লেনদেন কম হতে থাকে। ফেসবুক বন্ধ থাকা সময়ে এ ক্ষতির পরিমাণ ই-কমার্স অ্যালায়েন্সের সূত্র মতে ৩-৫ কোটি টাকা। ফ্রিল্যান্সাররা ক্ষতিগ্রস্ত হন ফেসবুক-সহ মেসেঞ্জার, ভাইবার, হোয়াটসঅ্যাপ, লাইন ও ট্যাঙ্গো বন্ধ থাকায়।
তারানা হালিম চিঠি লিখলে ৬ ডিসেম্বর ফেসবুক থেকে দুই কর্মকর্তা (দীপালি লিবার হ্যান ও বিক্রম লাং) বাংলাদেশে আসেন। বৈঠক করেন সরকারের সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে। তারপরও ফেসবুক খোলে না। তবে ২২ দিন পরে গত ১০ ডিসেম্বর সরকার বন্ধ ফেসবুক খুলে দেয়। কিন্তু খোলে না মেসেঞ্জার, ভাইবার, হোয়াটসঅ্যাপ, লাইন ও ট্যাঙ্গো। এরই মধ্যে গত ১৩ ডিসেম্বর সরকার টুইটার, স্কাইপ ও ইমো বন্ধ করে দেয়। কিন্তু একদিন যেতে না যেতেই ১৪ ডিসেম্বর দেশের সব বন্ধ যোগাযোগ ও সামাজিক মাধ্যম খুলে দেয় সরকার।
খুলে দেওয়ার ঘোষণা দেওয়ার সময় তারানা হালিম বলেন, দেশে আর কখনও ফেসবুক বন্ধ হবে না। তবে জরুরি অবস্থা জারির মতো ঘটনা ঘটলে আবারও বন্ধ করা হতে পারে।
জানা গেছে, ফেসবুকসহ বন্ধ সব যোগাযোগ মাধ্যম খুলে দেওয়ার পেছনে প্রধানমন্ত্রীর তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ক উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয় মুখ্য ভূমিকা পালন করেছেন।
সিম পুনর্নিবন্ধন ও আঙুলের ছাপ প্রযুক্তি
আলোচিত ঘটনা ছিল মোবাইলফোনের সিম নিবন্ধন ও পুনর্নিবন্ধনের বিষয়টিও। মোবাইলফোনের মাধ্যমে সংঘটিত অপরাধ হ্রাস, সাইবার হয়রানি, অবৈধ ভিওআইপি বন্ধে দেশের সব মোবাইলফোন সিম নিবন্ধন ও পুনর্নিবন্ধনের ঘোষণা দেন ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের প্রতিন্ত্রী তারানা হালিম। গত ১৫ সেপ্টেম্বর থেকে মোবাইলফোন গ্রাহকের তথ্য যাচাইয়ের জন্য এসএমএস পাঠানো শুরু হয়, জানতে চাওয়া হয় জাতীয় পরিচয়পত্রের (এনআইডি) তথ্য।
দুই দফায় সিম নিবন্ধন প্রক্রিয়া শুরু হয়। প্রথম দফায় এনআইডি যাচাই-বাছাই এবং পরবর্তীতে বায়োমেট্রিক পদ্ধতিতে (আঙুলের ছাপ) নিবন্ধন। নির্বাচন কমিশনের সহায়তা নিয়ে মোবাইলফোন অপারেটরগুলো সিম নিবন্ধন যাচাইয়ের কাজ শুরু করলে বেরিয়ে পড়ে থলের বিড়াল। যাচাইকালে ভুয়া নিবন্ধনের তথ্য বেরিয়ে আসে। একটি ভুয়া এনআইডির বিপরীতে ১৪ হাজার ১১৭টি সিম নিবন্ধনের ঘটনা ধরা পড়ে। অন্যদিকে আরও ৩টি এনআইডির বিপরীতে ১১ হাজার ৮৬৬, ১১ হাজার ৩২৮ ও ৬ হাজার ১৭৯টি সিম নিবন্ধনের তথ্য যাচাই-বাছাইকালে ধরা পড়ে।
সংশ্লিষ্টদের মন্তব্য, এ ঘটনার মাধ্যমেই প্রমাণ হয় মোবাইল সিম নিবন্ধন ও পুনর্নিবন্ধনের যৌক্তিকতা। পরবর্তীতে নির্বাচন কমিশনের তথ্যভাণ্ডার ব্যবহারের অনুমতি নিয়ে মোবাইলফোন অপারেটররা নিজেরাই যাচাইয়ের কাজ করছে। এদিকে আঙুলের ছাপ দিয়ে মোবাইলের সিম নিবন্ধন প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে ১৬ ডিসেম্বর, চলবে আগামী বছরের ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত। এর আগে গত ২১ অক্টোবর সজীব ওয়াজেদ জয় সচিবালয়ে নিজের আঙুলের ছাপ মিলিয়ে বায়োমেট্রিক সিম নিবন্ধন কার্যক্রম উদ্বোধন করেন। জানা গেছে, বায়োমেট্রিক পদ্ধতিতে সিম নিবন্ধন প্রক্রিয়া শেষ হলে- শুরু হবে মোবাইল সেটের (আইএমইআই) নিবন্ধন।
এ প্রসঙ্গে তারানা হালিম বলেছেন, সিম নিবন্ধন হলে মানুষ অর্ধেক নিরাপদ হলেন। সেট নিবন্ধন হলে তিনি পুরোপুরি নিরাপদ হবেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বর্তমানে মোবাইল সিম কিনতে এনআইডির পাশাপাশি আঙুলের ছাপও লাগছে। ফেব্রুয়ারি থেকে সিম কেনার সময় এসবের পাশাপাশি সেট নম্বরও (আইএমইআই) দিতে হবে।
অন্যদিকে বছরের শুরু থেকে আলোচিত ছিল দেশে ইন্টারনেটের দাম কমানোর প্রসঙ্গটি। এ বছর আবারও ইন্টারনেট ব্যান্ডউইথের দাম কমানো হলে গ্রাহক পর্যায়ে ইন্টারনেটের দাম কমানোর বিষয়টি সামনে এলেও বছর শেষে ইন্টারনেটের দাম সেই আগের অবস্থানেই রয়ে গেছে। ইন্টারনেটের দাম কমানোর বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সংশ্লিষ্টদের উদ্যোগ নিতে বললেও সে প্রক্রিয়ারও কোনও দৃশ্যমান উদ্যোগ চোখে পড়েনি।
যদিও তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) বিভাগের প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক বলেছেন, সরকার ইন্টারনেটের মূল্যসীমা বেঁধে দেবে। দেশে মোবাইলফোনের কলের মূল্য উচ্চসীমা এবং নিম্নসীমা বেঁধে দিলেও ইন্টারনেটের ক্ষেত্রে নেই। এ কারণে জুনাইদ আহমেদ পলক বলেছিলেন, সরকার ইন্টারনেটের মূল্যের উচ্চসীমা ও নিম্ন সীমা বেঁধে দেবে। আইসিটি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
চলতি বছর আরেকটি উদ্যোগ রীতিমতো হই চই ফেলে দিয়েছিল। আর তা হলো বিনামূল্যে ইন্টারনেট সেবার ব্যবহার। ফেসবুকের সহযোগী প্রতিষ্ঠান ইন্টারনেট ডট অর্গ এ সেবা দিতে এগিয়ে আসে। রবির সহযোগিতায় গত এপ্রিল মাসে এ সেবা চালু হওয়ার কথা থাকলেও তা মে মাসে চালু হয়। প্রথমেই এতে যুক্ত হয় ফেসবুকসহ-২৯টি বিভিন্ন ধরনের পোর্টাল। রবি মোবাইলফোন ব্যবহারকারীরা বিনা খরচে (ডাটা চার্জ ছাড়াই) ওই সব সাইট ব্রাউজ করতে পারছেন। পরবর্তীতে আরও একটি সাইট এতে যুক্ত হয়।
ডিসেম্বর মাসের শেষ নাগাদ এতে ১৫০টির বেশি সাইট যুক্ত হওয়ার কথা রয়েছে। যদিও সেবাটি নিয়ে শুরুতে কিছুটা বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছিল। বলা হচ্ছিল, এটা বিনামূল্যের ইন্টারনেট। কিন্তু প্রকৃত অর্থে এটি বিনামূল্যের ইন্টারনেট সেবা। আইসিটি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক বিষয়টি সংশোধন করে দিয়ে বলেন, ইন্টারনেট কখনও ফ্রি হতে পারে না। বরং এর কিছু কিছু সেবা বিনামূল্যে দেওয়া যেতে পারে। এটি সেই সেবা। তিনি বিনামূল্যের ইন্টারনেট সেবাকে দেশে ডিজিটাল বাংলাদেশের অগ্রগতির পথে একটি মাইলফলক হিসেবে অভিহিত করেন।
এ ছাড়াও চলতি অর্থ বছরের বাজেট পাস হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কম্পিউটারের ওপর ৪ শতাংশ ভ্যাট চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। এখন কম্পিউটারসহ সংশ্লিষ্ট যন্ত্রাংশ কিনতে গেলে ৪ শতাংশ হারে ক্রেতাকে ভ্যাট দিতে হয়। যদিও কম্পিউটার ব্যবসায়ীরা বলছেন, তারা অগ্রীম ৪ শতাংশ ভ্যাট (এটিভি) দিয়ে কম্পিউটার আমদানি করেন। তাহলে আবার কেন ভ্যাট? তাদের মতে, এরফলে দেশে কম্পিউটারের দাম কমার বদলে বেড়ে যাচ্ছে। ডিজিটাল বাংলাদেশের পথে অগ্রগতিতে ধীরগতি নেমে আসতে পারে বলে সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা।
এ বছর দেশে তথ্যপ্রযুক্তি খাতে সিলিকন ভ্যালি থেকে ভেঞ্চার ক্যাপিটাল এসেছে কয়েকটি তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানে, কিছু সূচকে বাংলাদেশের তথ্যপ্রযুক্তিতে এগিয়ে যাওয়ার খবরও রয়েছে। সফটওয়্যার রফতানির পরিমাণও বেড়েছে বলে জানা গেছে।
দেশের প্রথম হাইটেক পার্ক গাজীপুরের কালিয়াকৈর হাইটেক পার্কে আনুষ্ঠানিকভাবে কাজ শুরু হওয়া, বিশ্বের পঞ্চম বৃহত্তম ডাটা সেন্টার গড়ে তোলার প্রক্রিয়ার পথে একধাপ অগ্রগতি, যশোরে সফটওয়্যার টেকনোলজি পার্কে ডিজাস্টার রিকভারি সেন্টার গড়ে তোলা, ক্লাউড সিস্টেমে যুক্ত হওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার ঘটনা, ঢাকার কারওয়ান বাজারে জনতা টাওয়ারকে সফটওয়্যার টেকনোলজি পার্ক হিসেবে উন্মুক্ত করা, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী শিক্ষার্থীদের মাঝে বিনামূল্যে ল্যাপটপ উপহার দেওয়া এবং সারাদেশে ফ্রিল্যান্সারদের আউটসোর্সিং প্রশিক্ষণ দেওয়ার মতো অসংখ্য ইতিবাচক ঘটনা ঘটেছে দেশে। এ ছাড়াও তথ্যপ্রযুক্তি খাতের অগ্রগতির কারণে বাংলাদেশের আইটিইউ পদক লাভের ঘটনাও ঘটেছে। অন্যদিকে ডিজিটাল বাংলাদেশ মডেল নিয়ে ডিজিটাল মালদ্বীপ গড়ে তোলার কাজ শুরু করেছে মালদ্বীপ সরকার। আরও কয়েকটি দেশ এই মডেল নিতে চায় বলে জানা গেছে।
এসব বিষয়ে জুনাইদ আহমেদ পলক বলেন, যে দ্রুত গতিতে আমরা এগিয়ে যাচ্ছি তাতে করে ২০২১ সালের আগেই আমরা ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ে তুলতে পারব।
/ এফএ/টিএন/