শিশুদের জন্য সোশ্যাল মিডিয়া সীমিত করলে কী হয়, জবাব খুঁজতে যুক্তরাজ্যের গবেষণা

শিশুদের জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার সীমিত করলে তাদের মানসিক স্বাস্থ্য, ঘুম এবং পরিবার ও বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটানোর ওপর কী ধরনের প্রভাব পড়ে— তা জানতে একটি বড় পরিসরের গবেষণা শুরু করতে যাচ্ছে যুক্তরাজ্য।

এই গবেষণার ঘোষণা এসেছে এমন এক সময়ে, যখন বিশ্বের বিভিন্ন দেশ শিশুদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার কথা ভাবছে। গত ডিসেম্বরে অস্ট্রেলিয়া প্রথম দেশ হিসেবে ১৬ বছরের নিচে শিশুদের জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিষিদ্ধ করে। যুক্তরাজ্যসহ আরও কয়েকটি দেশেও একই ধরনের পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য রাজনৈতিক চাপ বাড়ছে।

তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কিছু দিক শিশুদের জন্য ক্ষতিকর—এমন প্রমাণ থাকলেও, সুস্থ শিশুদের মধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে সীমা আরোপ করলে সামগ্রিকভাবে কী প্রভাব পড়ে, তা নিয়ে এখনো বড় পরিসরের পরীক্ষামূলক গবেষণা হয়নি।

কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক অ্যামি অরবেন, যিনি এই গবেষণার সহ-নেতৃত্ব দিচ্ছেন, বলেন, ‘এটি বিশ্বে প্রথম গবেষণা, যেখানে এ প্রশ্নটি পরীক্ষামূলকভাবে যাচাই করার চেষ্টা করা হচ্ছে।’

‘আইআরএল ট্রায়াল’ নামের এই গবেষণায় যুক্তরাজ্যের ওয়েস্ট ইয়র্কশায়ারের ব্র্যাডফোর্ড এলাকার ৩০টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রায় ৪ হাজার শিক্ষার্থী অংশ নেবে। গবেষণাটি মূলত অষ্টম, নবম ও দশম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের নিয়ে পরিচালিত হবে।

গবেষণার শুরুতে অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য, ঘুম, বন্ধুত্বসহ বিভিন্ন বিষয়ে প্রশ্নপত্র পূরণ করতে হবে এবং তাদের প্রধান ডিভাইসে একটি গবেষণা অ্যাপ ইনস্টল করতে হবে।

প্রতিটি স্কুলে প্রতিটি শ্রেণিকে এলোমেলোভাবে দুই ভাগে ভাগ করা হবে। এক দলের ক্ষেত্রে অ্যাপটি শুধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের তথ্য সংগ্রহ করবে। অন্য দলের ক্ষেত্রে টিকটক, ইনস্টাগ্রাম, ফেসবুক, এক্স (সাবেক টুইটার), লিংকডইন, রেডিট, ইউটিউব ও স্ন্যাপচ্যাট ব্যবহারে দৈনিক এক ঘণ্টার সীমা নির্ধারণ করা হবে। পাশাপাশি রাত ৯টা থেকে সকাল ৭টা পর্যন্ত এসব অ্যাপে প্রবেশ নিষিদ্ধ থাকবে।

গবেষকরা জানিয়েছেন, একটি স্কুলের নির্দিষ্ট শ্রেণির সব শিক্ষার্থীর ওপর একই নিয়ম প্রযোজ্য হবে। অধ্যাপক অরবেন বলেন, ‘একজন শিক্ষার্থীর কাছ থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম সরিয়ে নেওয়া আর পুরো বন্ধু গোষ্ঠীর ক্ষেত্রেই সেটি সীমিত করা—এই দুটির প্রভাব একেবারেই ভিন্ন হতে পারে।’

তবে হোয়াটসঅ্যাপের মতো মেসেজিং অ্যাপগুলো এই সীমাবদ্ধতার বাইরে থাকবে, কারণ সেগুলো পারিবারিক যোগাযোগের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন গবেষকরা।

ছয় সপ্তাহ পর শিক্ষার্থীদের আবারও প্রশ্নপত্র পূরণ করতে হবে। আগামী এপ্রিল মাসে প্রাথমিক পরীক্ষামূলক ধাপ শুরু হবে এবং মূল গবেষণা শুরু হওয়ার কথা রয়েছে অক্টোবরে। গবেষণার প্রাথমিক ফলাফল প্রকাশ পেতে পারে ২০২৭ সালের গ্রীষ্মে।

এদিকে যুক্তরাজ্যের পার্লামেন্টের উচ্চকক্ষ হাউস অব লর্ডসে শিশুদের কল্যাণ ও স্কুলবিষয়ক একটি বিলে সংশোধনী আনার প্রস্তুতি চলছে, যেখানে শিশুদের জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পুরোপুরি নিষিদ্ধ করার প্রস্তাব রয়েছে। এই সংশোধনীতে বিভিন্ন দলের লর্ডদের সমর্থন রয়েছে। এটি পাস হলে পরবর্তী সময়ে হাউস অব কমন্সে আলোচনা হবে।

যুক্তরাজ্যের প্রযুক্তিবিষয়ক মন্ত্রী লিজ কেন্ডাল জানিয়েছেন, সরকারের পরামর্শ প্রক্রিয়া কয়েক মাসের মধ্যেই শেষ হবে এবং গ্রীষ্ম নাগাদ এ বিষয়ে চূড়ান্ত অবস্থান জানানো হবে।

তবে সংশোধনী উত্থাপনকারী লর্ড জন ন্যাশ জানিয়েছেন, তিনি অবিলম্বে নিষেধাজ্ঞা কার্যকরের পক্ষে। বলেন, ‘সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের বয়সসীমা ১৬ বছরে উন্নীত করতে দেরি করলে আমরা সামাজিক বিপর্যয়ের ঝুঁকিতে পড়ব।’

গবেষকরা স্বীকার করেছেন, এই গবেষণার কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে— যেমন শিক্ষার্থীরা অন্যের ডিভাইস ব্যবহার করতে পারে বা অংশগ্রহণ না করার সিদ্ধান্ত নিতে পারে। তবুও তারা আশা করছেন, এই গবেষণা কিশোরদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে সীমা আরোপের বাস্তব প্রভাব সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দেবে।

ব্র্যাডফোর্ড সেন্টার ফর হেলথ ডেটা সায়েন্সের প্রধান ও গবেষণার সহ-নেতা ডা. ড্যান লিউয়ার বলেন, ‘আমাদের মূল লক্ষ্য হলো উদ্বেগের মাত্রা। পাশাপাশি বিষণ্নতার দিকটিও আমরা পর্যবেক্ষণ করব।’ এছাড়া ঘুমের ধরন, বুলিংয়ের অভিজ্ঞতা, পরিবার ও বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটানো এবং নিজেদের অন্যদের সঙ্গে তুলনা করার প্রবণতাও বিশ্লেষণ করা হবে।

গবেষকরা মনে করছেন, এই গবেষণার ফল শুধু যুক্তরাজ্য নয়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিয়ে সিদ্ধান্তহীনতায় থাকা অন্যান্য দেশগুলোর জন্যও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সরবরাহ করবে।

সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান