জনপ্রিয় মেসেজিং অ্যাপ হোয়াটসঅ্যাপের প্রাইভেসি ও নিরাপত্তা সংক্রান্ত দাবিকে ঘিরে নতুন আইনি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে এর মূল কোম্পানি মেটা। ব্যবহারকারীদের কাছে ভুয়া বা বিভ্রান্তিকর দাবি উপস্থাপনের অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্রে মেটা ও হোয়াটসঅ্যাপের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়েছে।
ব্লুমবার্গের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, শুক্রবার (২৩ জানুয়ারি) সান ফ্রান্সিসকোর একটি মার্কিন জেলা আদালতে এই মামলা করা হয়। মামলাটি করেছেন অস্ট্রেলিয়া, ব্রাজিল, ভারত, মেক্সিকো ও দক্ষিণ আফ্রিকার একদল আন্তর্জাতিক বাদী।
মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে, মেটা ও হোয়াটসঅ্যাপ ব্যবহারকারীদের তথাকথিত ‘ব্যক্তিগত’ বার্তা সংরক্ষণ, বিশ্লেষণ এবং সেগুলোতে প্রবেশাধিকার রাখে। এমনকি হোয়াটসঅ্যাপে ব্যবহারকারীদের চ্যাট লগের মূল বিষয়বস্তু সংরক্ষণ করা হয়, যা কোম্পানির কর্মীরাও দেখতে পারেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
এই তথ্য সামনে এসেছে বলে দাবি করা হয়েছে কয়েকজন বেনামী হুইসেলব্লোয়ারের মাধ্যমে। বাদীপক্ষের আইনজীবীরা মামলাটিকে ক্লাস-অ্যাকশন হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার জন্য আদালতের কাছে আবেদন জানিয়েছেন।
হোয়াটসঅ্যাপ দীর্ঘদিন ধরেই দাবি করে আসছে যে, অ্যাপটিতে পাঠানো বার্তা, ছবি, ভিডিও ও কল শুধুমাত্র প্রেরক ও প্রাপকই দেখতে বা শুনতে পারেন। কোম্পানির দাবি অনুযায়ী, ‘এনড-টু-এনড এনক্রিপশন’ ব্যবহারের কারণে মেটা বা হোয়াটসঅ্যাপ নিজেরাও এসব তথ্য দেখতে পারে না। হোয়াটসঅ্যাপ ও ফেসবুক মেসেঞ্জার উভয়ই সিগন্যাল প্রোটোকল ব্যবহার করে।
ডিফল্টভাবে সব ব্যবহারকারীর জন্য এনক্রিপশন চালু থাকে এবং অ্যাপের মধ্যেই লেখা থাকে— “এই চ্যাটের কনটেন্ট কেবল এই চ্যাটের মানুষরাই পড়তে, শুনতে বা শেয়ার করতে পারবেন।”
মেটা এই মামলাকে সরাসরি ‘ভিত্তিহীন’ ও ‘কল্পকাহিনি’ বলে উড়িয়ে দিয়েছে। কোম্পানির মুখপাত্র অ্যান্ডি স্টোন ব্লুমবার্গকে বলেন, “হোয়াটসঅ্যাপের বার্তা এনক্রিপ্টেড নয়— এমন কোনও দাবি সম্পূর্ণ মিথ্যা ও হাস্যকর। হোয়াটসঅ্যাপ গত এক দশক ধরে সিগন্যাল প্রোটোকলের মাধ্যমে এনড-টু-এনড এনক্রিপশন ব্যবহার করছে। এই মামলা নিছক একটি কল্পকাহিনি।”
মেটা আরও জানিয়েছে, তারা বাদীপক্ষের আইনজীবীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার পথও অনুসরণ করবে।
এনক্রিপশন কী?
এনক্রিপশন হলো এমন একটি প্রযুক্তি, যার মাধ্যমে তথ্যকে গোপন কোডে রূপান্তর করা হয়, যাতে অননুমোদিত কেউ তা পড়তে বা পরিবর্তন করতে না পারে। এটি অনলাইন যোগাযোগ সুরক্ষা, সংবেদনশীল তথ্য সংরক্ষণ এবং ডিজিটাল পরিচয় যাচাইয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
এনক্রিপশনের প্রধান দুটি ধরন রয়েছে—
সিমেট্রিক এনক্রিপশন: একই কী দিয়ে তথ্য এনক্রিপ্ট ও ডিক্রিপ্ট করা হয়।
অ্যাসিমেট্রিক এনক্রিপশন: এখানে দুটি কী থাকে— একটি পাবলিক ও একটি প্রাইভেট।
এনড-টু-এনড এনক্রিপশন নিশ্চিত করে যে, তথ্য প্রেরণ থেকে গ্রহণ পর্যন্ত পুরো পথে সুরক্ষিত থাকে— যা হোয়াটসঅ্যাপের মতো দ্রুত যোগাযোগমাধ্যমের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এনক্রিপ্টেড অ্যাপের নিরাপত্তা অনেকটাই ব্যবহারকারীর ডিভাইসের নিরাপত্তার ওপর নির্ভরশীল। যদি কেউ আনলকড ফোনে প্রবেশ করতে পারে, স্পাইওয়্যার ইনস্টল করে বা প্রতারণার মাধ্যমে অ্যাকাউন্ট অন্য ডিভাইসের সঙ্গে যুক্ত করে, তাহলে এনক্রিপ্টেড বার্তাও ফাঁস হতে পারে।
উল্লেখ্য, ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে সাইবার জালিয়াতি রোধে ভারত সরকার হোয়াটসঅ্যাপ ও টেলিগ্রামের মতো মেসেজিং অ্যাপগুলোকে ধারাবাহিক সিম-বাইন্ডিং এবং ওয়েব/কম্প্যানিয়ন ডিভাইস ব্যবহারে সময়সীমা নির্ধারণের নির্দেশ দেয়।
সূত্র: ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস