ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে ইলন মাস্কের মালিকানাধীন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স (সাবেক টুইটার)–এর ফরাসি সদরদফতরে অভিযান চালিয়েছে দেশটির সাইবার অপরাধ ইউনিট। একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির বর্তমান মালিক ইলন মাস্ক এবং সাবেক প্রধান নির্বাহী লিন্ডা ইয়াকারিনোকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তলব করা হয়েছে।
প্যারিস প্রসিকিউটর দপ্তর মঙ্গলবার এক বিবৃতিতে জানায়, তাদের সাইবার অপরাধ ইউনিট, ফরাসি জাতীয় পুলিশ এবং ইউরোপীয় পুলিশ সংস্থা ইউরোপলের সহায়তায় এই অভিযান চালানো হচ্ছে। একই পোস্টে তারা জানায়, ভবিষ্যতে তারা আর এক্স প্ল্যাটফর্মে কোনও বিবৃতি প্রকাশ করবে না।
প্রসিকিউটর দপ্তরের তথ্যমতে, ইলন মাস্ক ও লিন্ডা ইয়াকারিনোকে আগামী এপ্রিল মাসে “স্বেচ্ছাসেবী জিজ্ঞাসাবাদের” জন্য ডাকা হয়েছে। তবে আইনি দৃষ্টিতে এই তলব বাধ্যতামূলক। অভিযোগের সময় তারা এক্সের যথাক্রমে প্রকৃত ও আইনগত ব্যবস্থাপক ছিলেন। উল্লেখ্য, ইয়াকারিনো গত বছরের জুলাইয়ে এক্সের সিইও পদ থেকে পদত্যাগ করেন।
এই অভিযান এমন এক সময়ে এলো, যখন ইউরোপজুড়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোর বিরুদ্ধে অবস্থান আরও কঠোর হচ্ছে। গ্রিস সরকার শিগগিরই ১৫ বছরের কম বয়সীদের জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিষিদ্ধ করার ঘোষণা দিতে পারে বলে রয়টার্সকে জানিয়েছেন দেশটির এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা।
এদিকে স্পেনেও ১৬ বছরের নিচে শিশুদের জন্য সোশ্যাল মিডিয়া নিষিদ্ধ করার পরিকল্পনা করছে সরকার। দেশটির প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে “ডিজিটাল ওয়াইল্ড ওয়েস্ট” আখ্যা দিয়ে শিশুদের সুরক্ষায় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার কথা বলেন।
সানচেজ সম্প্রতি স্পেনে ৫ লাখ অনিবন্ধিত অভিবাসী ও আশ্রয়প্রার্থীদের বৈধতা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে এক্সে “ভুল তথ্য ছড়ানোর” অভিযোগ তুলে সরাসরি ইলন মাস্কের সমালোচনা করেন। এর জবাবে মাস্ক এক্সে পোস্ট দিয়ে সানচেজকে “স্পেনের জনগণের বিশ্বাসঘাতক” বলে আখ্যা দেন।
প্যারিস প্রসিকিউটর দপ্তর জানায়, চলমান তদন্তটি শুরু হয় গত বছরের জানুয়ারিতে। শুরুতে অভিযোগ ছিল অ্যালগরিদমের অপব্যবহার ও প্রতারণামূলকভাবে তথ্য আহরণের বিষয়ে। পরে এই তদন্তের আওতা বাড়িয়ে এক্সের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক চ্যাটবট গ্রোক–কেও অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
বর্তমানে যেসব গুরুতর অভিযোগ তদন্তাধীন রয়েছে, তার মধ্যে রয়েছে— শিশু নির্যাতনের ছবি সংরক্ষণ ও সংগঠিতভাবে বিতরণে সহযোগিতা, যৌনাচারমূলক ডিপফেকের মাধ্যমে ব্যক্তিগত ছবির অধিকার লঙ্ঘন, মানবতাবিরোধী অপরাধ অস্বীকার (যেমন হলোকাস্ট অস্বীকার), প্রতারণামূলকভাবে স্বয়ংক্রিয় ডেটা প্রসেসিং সিস্টেম পরিচালনা এবং অবৈধ অনলাইন প্ল্যাটফর্ম পরিচালনা।
ফরাসি এমপি এরিক বোথোরেল এক্সের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন যে, পক্ষপাতদুষ্ট অ্যালগরিদমের মাধ্যমে কনটেন্ট নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে, যার ফলে মতের বৈচিত্র্য কমে গেছে এবং ইলন মাস্ক ব্যক্তিগতভাবে প্ল্যাটফর্মের ব্যবস্থাপনায় হস্তক্ষেপ করছেন। অন্য এক অভিযোগে বলা হয়, এসব পরিবর্তনের কারণে “বমি উদ্রেককারী রাজনৈতিক কনটেন্ট” বেড়ে গেছে।
প্রসিকিউটররা আরও জানান, গ্রোক চ্যাটবটের বিরুদ্ধে হলোকাস্ট অস্বীকার ও ভুয়া দাবি ছড়ানোর অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া এআই ব্যবহার করে নারীদের ও শিশুদের পোশাক খুলে দেওয়ার মতো ছবির সৃষ্টি করার সুযোগ দেওয়ায় ইউরোপীয় ইউনিয়নও গ্রোকের বিরুদ্ধে আলাদা তদন্ত শুরু করেছে।
অভিযোগের জবাবে এক্স এক বিবৃতিতে জানায়, এই অভিযানকে তারা “আইন প্রয়োগের নাটক” বলে মনে করছে এবং একে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে আখ্যা দেয়। এক্সের দাবি, তদন্তটি ফরাসি আইনের অপব্যবহার করছে এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে হুমকির মুখে ফেলছে।
তবে প্যারিস প্রসিকিউটর দফতর বলছে, এই তদন্ত “গঠনমূলক পদ্ধতিতে” পরিচালিত হচ্ছে, যার লক্ষ্য হলো— ফ্রান্সে কার্যক্রম চালানোর ক্ষেত্রে এক্স যেন দেশটির আইন মেনে চলে।
ইউরোপল জানিয়েছে, তারা এই তদন্তে ফরাসি কর্তৃপক্ষকে সহায়তা করছে এবং ভবিষ্যতেও সহযোগিতা অব্যাহত রাখবে।
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান