স্মার্টফোন এখন দৈনন্দিন জীবনের অপরিহার্য অনুষঙ্গ। নতুন ফোন কেনার সময় অনেকেই কম দামে ভালো কনফিগারেশনের আশায় আনঅফিসিয়াল বা গ্রে-মার্কেটের ফোনের দিকে ঝুঁকেন। অফিসিয়াল ডিভাইসের তুলনায় কিছুটা কম দামে পাওয়া যাওয়ায় এসব ফোন ক্রেতাদের কাছে আকর্ষণীয় মনে হলেও এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে নানা ধরনের ঝুঁকি।
প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের মতে, সাময়িকভাবে কিছু অর্থ সাশ্রয় হলেও দীর্ঘমেয়াদে আনঅফিসিয়াল ফোন ব্যবহারকারীদের জন্য বড় ধরনের সমস্যার কারণ হতে পারে।
আসুন জেনে নেওয়া যাক অফিসিয়াল ও আনঅফিসিয়াল ফোনের মূল পার্থক্য এবং আনঅফিসিয়াল ফোন কেনার অবধারিত ঝুঁকিগুলো।
১. ট্যাক্স ফাঁকি ও অবৈধ আমদানির ঝুঁকি
আনঅফিসিয়াল ফোন বলতে সাধারণত এমন ডিভাইসকে বোঝানো হয়, যা বৈধ শুল্ক ও কর পরিশোধ ছাড়া দেশে আনা হয়েছে।
রাজস্ব ক্ষতি: এসব ফোন বিক্রির মাধ্যমে রাষ্ট্র রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হয়। একই সঙ্গে অবৈধ আমদানি ও চোরাচালান নিরুৎসাহিত করার সরকারি প্রচেষ্টাও বাধাগ্রস্ত হয়।
আইনগত জটিলতা: অবৈধভাবে দেশে আসা হ্যান্ডসেট কেনা বা ব্যবহার করা পরোক্ষভাবে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডকে উৎসাহিত করার শামিল।
২. যেকোনো সময় বন্ধ হতে পারে নেটওয়ার্ক
আনঅফিসিয়াল ফোন ব্যবহারের সবচেয়ে বড় ঝুঁকিগুলোর একটি হলো নেটওয়ার্ক বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা।
এনইআইআর ডাটাবেজ: বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) ন্যাশনাল ইকুইপমেন্ট আইডেন্টিটি রেজিস্টার (এনইআইআর) ব্যবস্থার মাধ্যমে দেশে ব্যবহৃত মোবাইল ফোনের আইএমইআই নম্বর নিবন্ধন করে থাকে। এর ফলে অবৈধ বা আনঅফিসিয়াল ফোনের আইএমইআই বিটিআরসি-র ডাটাবেজে নিবন্ধিত থাকে না।
নেটওয়ার্ক বিচ্ছিন্নতা: বৈধভাবে নিবন্ধিত নয় এমন ডিভাইস ভবিষ্যতে মোবাইল নেটওয়ার্ক থেকে বিচ্ছিন্ন বা ব্লক হয়ে যেতে পারে। এ অবস্থায় ফোনটি শুধু ওয়াই-ফাই নির্ভর ডিভাইসে পরিণত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।
৩. ওয়ারেন্টি সুবিধায় বড় পার্থক্য
অফিসিয়াল ফোনের সঙ্গে সাধারণত ১ থেকে ২ বছরের ব্র্যান্ড ওয়ারেন্টি এবং অনুমোদিত সার্ভিস সেন্টারের সুবিধা থাকে। অন্যদিকে আনঅফিসিয়াল ফোনে ব্র্যান্ডের কোনো দায়বদ্ধতা থাকে না।
বেশিরভাগ ক্ষেত্রে বিক্রেতারা ‘শপ ওয়ারেন্টি’ বা সীমিত সার্ভিস সুবিধা দিলেও গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ নষ্ট হলে মেরামতের খরচ ক্রেতাকেই বহন করতে হয়।
বিশেষ করে ডিসপ্লে, মাদারবোর্ড বা ক্যামেরার মতো যন্ত্রাংশ প্রতিস্থাপনে ব্যয় অনেক সময় নতুন ফোন কেনার কাছাকাছি পৌঁছে যেতে পারে।
৪. রিফারবিশড ও নকল যন্ত্রাংশের আশঙ্কা
প্রযুক্তি বাজারে অনেক আনঅফিসিয়াল ফোনকে নতুন হিসেবে বিক্রি করা হলেও বাস্তবে সেগুলোর একটি অংশ রিফারবিশড বা পুনর্নবীকরণ করা ডিভাইস হতে পারে।
বাহ্যিকভাবে নতুন মনে হলেও এসব ফোনে ব্যবহৃত ব্যাটারি, ডিসপ্লে কিংবা অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ নকল বা নিম্নমানের হওয়ার ঝুঁকি থাকে। ফলে ডিভাইসের স্থায়িত্ব ও নিরাপত্তা দুটোই প্রশ্নের মুখে পড়ে।
ফোনটি বৈধ কি না যাচাই করবেন যেভাবে
আপনার ফোনটি বৈধ কি না জানবেন যেভাবে ফোন কেনার আগে বা পরে সেটি অফিসিয়াল বা বৈধ উপায়ে নিবন্ধিত কি না, তা সহজেই যাচাই করা যায়। ফোনের ডায়াল প্যাডে গিয়ে *#০৬# চেপে আপনার হ্যান্ডসেটের ১৫ ডিজিটের আএমইআই নম্বরটি জেনে নিন। মোবাইলের মেসেজ অপশনে গিয়ে লিখুন: KYD <স্পেস> ১৫ ডিজিটের আএমইআই নম্বর (যেমন: KYD 123456789012345)। মেসেজটি পাঠিয়ে দিন ১৬০০২ নম্বরে। ফিরতি মেসেজে বিটিআরসি আপনাকে জানিয়ে দেবে ফোনটি বৈধ নাকি অবৈধ।
সচেতন ক্রেতার জন্য পরামর্শ
জেনে রাখা ভালো সামান্য কিছু টাকা বাঁচানোর জন্য আনঅফিসিয়াল ফোন কিনে যেকোনও মুহূর্তে নেটওয়ার্ক লক হওয়া, ওয়ারেন্টি না পাওয়া এবং আইনি ঝুঁকিতে পড়ার কোনো মানে হয় না। একজন সচেতন নাগরিক ও স্মার্ট ক্রেতা হিসেবে, মানসিক শান্তি এবং দীর্ঘস্থায়ী সুরক্ষার জন্য সর্বদা বিটিআরসি নিবন্ধিত অফিসিয়াল স্মার্টফোন কেনাই বুদ্ধিমানের কাজ।