একজন সাধারণ মানুষ সারা দিনে গড়ে ৪ থেকে ৫ ঘণ্টা মোবাইল ফোন ব্যবহার; যা তরুণদের ক্ষেত্রে আরও বেশি হয়ে থাকে। স্মার্টফোনের প্রতি নির্ভরশীলতা এবং আসক্তি অজস্র সময় অপচয়ের পাশাপাশি মানবস্বাস্থের ওপর ফেলে বিরূপ প্রভাব। ব্যবহারকারীর প্রতিনিয়ত কিছু সাধারণ ভুল বা বদভ্যাসের জন্য এই ক্ষতির মাত্রা অনেকাংশেই বেড়ে যায়। গবেষণায় দেখা গেছে, ঘাড় ও মেরুদণ্ডে অতিরিক্ত চাপ, চোখের ক্লান্তি, ঘুমের ব্যাঘাত, আঙুল ও কবজির সমস্যা থেকে শুরু করে শরীরের স্বাভাবিক অঙ্গবিন্যাস নষ্ট হওয়ার পেছনেও দায়ী হতে পারে স্মার্টফোন ব্যবহারের কিছু দৈনন্দিন অভ্যাস।
‘টেক্সট নেক’ চাপ বাড়াচ্ছে ঘাড়ের ওপর
একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের মাথার গড় ওজন প্রায় ৫.৫ কেজি। কিন্তু ফোন দেখার সময় মাঘা সামনের দিকে ঝুঁকলে সেই ওজনের চাপ সরাসরি সার্ভাইক্যাল স্পাইনের ওপর পড়ে বহুগুণ বেড়ে যায়। বিশেষজ্ঞদের মতে, মাত্র ৩০ ডিগ্রি কোণে মাথা ঝুঁকলেই ঘাড়ে প্রায় ১৮ কেজি সমপরিমাণ চাপ পড়ে; যা দীর্ঘ সময় ধরে চলতে থাকলে টেক্সট নেক নামে একটি জটিলতার সৃষ্টি হয়। এটি দীর্ঘমেয়াদি ঘাড়ের ব্যথা, কাঁধে টান এবং মেরুদণ্ডের অস্বাভাবিক বক্রতার ঝুঁকি বাড়ায়।
করণীয়: ফোন সবসময় চোখের সমতলে ধরে ব্যবহার করুন এবং প্রতি ২০-৩০ মিনিট পর ঘাড় ও কাঁধ স্ট্রেচ করুন।
দীর্ঘক্ষণ ঝুঁকে বসে থাকায় পিঠে ব্যথা
শুধু ঘাড় নয়, দীর্ঘ সময় কুঁজো হয়ে ফোন ব্যবহারের কারণে কোমর ও পিঠের ওপরও অতিরিক্ত চাপ পড়ে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ভুল ভঙ্গিতে বসলে মেরুদণ্ডে ২২ কেজিরও বেশি অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হতে পারে। এর ফলে কোমর ব্যথা, পেশির ভারসাম্যহীনতা এবং দীর্ঘমেয়াদে অঙ্গবিন্যাসের সমস্যা দেখা দিতে পারে। এক গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, ১৬ থেকে ২৪ বছর বয়সী তরুণদের প্রায় ৪৫ শতাংশই বর্তমানে কোনও না কোনও ধরনের পিঠের ব্যথাজনিত সমস্যায় ভুগছেন।
করণীয়: প্রতি ৩০ মিনিট পর উঠে হাঁটুন, চেয়ারে সোজা হয়ে বসুন এবং ফোন ব্যবহার করার সময় পিঠের সঠিক ভঙ্গি বজায় রাখুন।
চোখের ওপর বাড়তি চাপ
দীর্ঘ সময় স্ক্রিনে তাকিয়ে থাকলে চোখ শুকিয়ে যাওয়া, ঝাপসা দেখা, মাথাব্যথা ও চোখে জ্বালাপোড়ার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে। চিকিৎসাবিজ্ঞানে এটি ডিজিটাল আই স্ট্রেইন নামে পরিচিত। দীর্ঘ সময় স্ক্রিনে তাকিয়ে থাকার ফলে চোখের পলক ফেলার হারও কমে যায়; যা চোখকে আরও শুষ্ক করে তোলে।
করণীয়: ২০-২০-২০ নিয়ম অনুসরণ করুন-প্রতি ২০ মিনিট পর অন্তত ২০ সেকেন্ড ২০ ফুট দূরের কোনও বস্তুর দিকে তাকান।
ঘুমের ব্যাঘাতজনিত সমস্যা
স্মার্টফোনের স্ক্রিন থেকে নির্গত নীল আলো বা ব্লু লাইট শরীরে মেলাটোনিন হরমোনের উৎপাদন ব্যাহত করতে পারে; যা ঘুম নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ফলে ঘুমাতে দেরি হওয়া, গভীর ঘুম কমে যাওয়া এবং পরদিন ক্লান্তি অনুভব করার ঝুঁকি বাড়ে।
করণীয়: ঘুমানোর অন্তত এক ঘণ্টা আগে ফোন ব্যবহার বন্ধ রাখুন অথবা ব্লু-লাইট ফিল্টার ব্যবহার করুন এবং ব্লু-কাট লেন্সযুক্ত চশমা ব্যবহার করুন।
আঙুল ও কবজিতে পুনরাবৃত্ত চাপ
এক হাতে দীর্ঘ সময় ফোন ধরা বা চ্যাটিংয়ের সময় দ্রুত টাইপ করার ফলে আঙুল ও কবজির টেন্ডনে অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হয়। সময়ের সঙ্গে এটি টেনডিনাইটিস, ট্রিগার থাম্ব সহ অন্যান্য পুনরাবৃত্তিমূলক চাপজনিত সমস্যার ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
করণীয়: দুই হাত ব্যবহার করুন, প্রয়োজনে ভয়েস টাইপিং ব্যবহার করুন এবং নিয়মিত আঙুলের ব্যায়াম করুন।
শরীরের স্বাভাবিক অঙ্গবিন্যাস বা ‘পশ্চার’ নষ্ট হচ্ছে
ফোন ব্যবহার করতে গিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা একই ভঙ্গিতে বসে থাকার কারণে কাঁধ সামনের দিকে ঝুঁকে যাওয়া, বুকের পেশি শক্ত হয়ে যাওয়া, কোমরের পেশি দুর্বল হওয়া এবং শরীরের স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বা পশ্চারে পরিবর্তন আসার মতো সমস্যা হতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে এটি চলাফেরা ও ভারসাম্যের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।
করণীয়: ফোন ব্যবহারের মাঝে নিয়মিত বিরতি নিন এবং ঘাড়, কাঁধ ও কোমরের স্ট্রেচিং ব্যায়াম করুন।
অতিরিক্ত স্ক্রিন টাইমের কারণে মানসিক চাপ
ঘন ঘন নোটিফিকেশন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং অবিরাম স্ক্রলিং মস্তিষ্ককে ক্রমাগত নতুন উদ্দীপনার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে বাধ্য করে। এর ফলে মনোযোগ ধরে রাখার ক্ষমতা কমে যেতে পারে, সৃজনশীলতা হ্রাস পেতে পারে এবং মানসিক চাপও বাড়তে পারে।
করণীয়: অপ্রয়োজনীয় নোটিফিকেশন বন্ধ রাখুন, নির্দিষ্ট সময়ে ফোন ব্যবহার করুন এবং স্ক্রিন টাইম যথাসম্ভব কমিয়ে আনার চেষ্টা করুন।