স্মার্টফোন শিশুর কথা বলা শেখায় কীভাবে প্রভাব ফেলে?

খাওয়ানো, কান্না থামানো কিংবা কিছুক্ষণ ব্যস্ত রাখার জন্য ছোট্ট শিশুর হাতে স্মার্টফোন বা ট্যাবলেট তুলে দেওয়া এখন অনেক বাবা-মায়েরই নিত্যদিনের অভ্যাস। কিন্তু এই সাময়িক স্বস্তি ভবিষ্যতে শিশুর ভাষা-বিকাশে দীর্ঘমেয়াদি বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে। একাধিক সাম্প্রতিক গবেষণার ফলাফল ইঙ্গিত দিচ্ছে, অল্প বয়সে অতিরিক্ত ডিভাইস ব্যবহার শিশুদের বাকবিকাশে বিলম্বের বা স্পিচ ডিলের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিতে পারে।

জন্মের পর থেকেই একটি শিশুর মস্তিষ্ক চারপাশের মানুষের সঙ্গে কথা বলা, মুখের অভিব্যক্তি দেখা, আই কন্টাক্ট, শব্দ অনুকরণ এবং প্রশ্ন-উত্তরের মতো পারস্পরিক যোগাযোগের মাধ্যমে ভাষা শেখে। বিকাশবিজ্ঞানীরা এই প্রক্রিয়াকে ‘সার্ভ অ্যান্ড রিটার্ন ইন্টার্যাকশন’ বলে থাকেন। অর্থাৎ, শিশু কোনও শব্দ, অঙ্গভঙ্গি বা প্রতিক্রিয়া দেখানোর চেষ্টা করলে অভিভাবকও জবাব দিয়ে সাড়া দেন। এই আদান-প্রদানের মধ্য দিয়েই মস্তিষ্কে ভাষা, স্মৃতি ও সামাজিক যোগাযোগের সঙ্গে সম্পর্কিত স্নায়বিক সংযোগ দ্রুত বিকশিত হতে থাকে।

সমস্যা তৈরি হয় তখন, যখন সেই পারস্পরিক যোগাযোগের জায়গা দখল করে নেয় ডিভাইসের স্ক্রিন। স্মার্টফোনের ভিডিও বা অ্যানিমেশন শিশুকে বিনোদন দিলেও সেটি তার সঙ্গে বাস্তব কথোপকথনে অংশ নেয় না, শিশুর প্রতিক্রিয়ার অপেক্ষা করে না বা তার ভুল উচ্চারণে সংশোধন করে না কিংবা নতুন শব্দ বলার জন্য উৎসাহিত করে না। ফলে শিশুর সামনে সাজানো-গুছানো ভাষা শোনার সুযোগ থাকলেও ভাষা ব্যবহার ও অনুশীলনের সুযোগ কমে যায়। বিশেষজ্ঞদের মতে, ভাষা শেখার জন্য শব্দ শোনা যতটা জরুরি, ততটাই গুরুত্বপূর্ণ মানুষের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করা।

কানাডার দ্য হসপিটাল ফর সিক চিলড্রেনের গবেষণায় প্রায় ৯ শতাধিক শিশুর তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, প্রতিদিন স্ক্রিন ব্যবহারের সময় অতিরিক্ত প্রতি ৩০ মিনিট বাড়লে বাকবিকাশে বিলম্বের ঝুঁকি প্রায় ৪৯ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়। একই ধরনের উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন মিশিগান মেডিসিনের শিশু বিশেষজ্ঞরাও। তাদের মতে, শিশু যত বেশি সময় স্ক্রিনে কাটায়, তত কম সময় সে বাবা-মা বা পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে, আর এই ঘাটতিই ভাষা বিকাশে প্রভাব ফেলতে পারে।

অন্যদিকে জেএএমএ পেডিয়াট্রিক্স নামে এক মেডিক্যাল জার্নালের গবেষণায় দেখা গেছে, বেশি সময় স্ক্রিন ব্যবহার করা তিন বছর বয়সী শিশুরা প্রতিদিন গড়ে ১ হাজার ১৩৯টি কম পরিপক্ক শব্দ শোনে, নিজেরা ৮৪৩টি কম শব্দ উচ্চারণ করে এবং অভিভাবকের সঙ্গে ১৯৪ সংখ্যক কম কথোপকথনে অংশ নেয়। এই সংখ্যাগুলোই ব্যাখ্যা করে কেন দীর্ঘ সময় স্ক্রিনে মনোনিবেশিত শিশুদের ভাষা বিকাশ প্রক্রিয়া ধীর হয়ে যায়।

বিষয়টি শুধু বাকবিকাশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। ‘এক্সেসিভ গ্যাজেট এক্সপোজার অ্যান্ড চিলড্রেনস স্পিচ ডিলে’ শীর্ষক গবেষণায় বলা হয়েছে, অতিরিক্ত গ্যাজেট ব্যবহার শিশুদের মনোযোগ, সামাজিক যোগাযোগ এবং শেখার দক্ষতার ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে যেসব শিশু অটিজম স্পেকট্রাম ডিজঅর্ডারের ঝুঁকিতে রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত স্ক্রিন ব্যবহার ভাষা ও সামাজিক দক্ষতার ঘাটতিকে আরও প্রকট করে তুলতে পারে। ভাষা বিকাশে বিলম্বের প্রভাব কেবল শৈশবেই সীমাবদ্ধ থাকে না। পরিণত বয়সে শব্দভাণ্ডার সীমিত থাকা, স্পষ্টভাবে নিজের ভাব প্রকাশে অসুবিধা, সহপাঠীদের সঙ্গে যোগাযোগে অস্বস্তি এবং বিদ্যালয়ে শেখার ক্ষেত্রেও পিছিয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। তবে সময়মতো মা-বাবা সতর্ক হয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিলে অধিকাংশ শিশুর ক্ষেত্রেই সমস্যাটি থেকে পরিত্রাণ পাওয়া সম্ভব হয়।

আশঙ্কার বিষয় হলো, বর্তমান ও আগামী প্রজন্মের অধিকাংশ শিশুরাই এই সমস্যার ভুক্তভোগী। আর এই সমস্যাটিও রাতারাতি সমাধানযোগ্য নয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, শিশুকে দীর্ঘ সময় স্ক্রিনের সামনে বসিয়ে রাখার পরিবর্তে তার সঙ্গে নিয়মিত কথা বলা, গল্প শোনানো, বই পড়ে শোনানো, গান গাওয়া এবং খেলাধুলায় অংশ নেওয়াই ভাষা বিকাশের সবচেয়ে কার্যকর উপায়। প্রয়োজনে ডিভাইস ব্যবহার করতে হলেও তা যেন সীমিত সময়ের জন্য হয় এবং অভিভাবকের উপস্থিতিতে হয়, যাতে শিশুর সঙ্গে কথোপকথন অব্যাহত থাকে। এ কারণে চিকিৎসকেরা ১৮ মাসের কম বয়সী শিশুদের ক্ষেত্রে শুধু ভিডিও কলে কথা বলা ছাড়া স্ক্রিন ব্যবহার এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেন। তাদের মতে, কোনও স্মার্ট ডিভাইস একজন অভিভাবকের সঙ্গে শিশুর প্রাণবন্ত ভাবের আদান-প্রদান বা ভাব-আলাপের বিকল্প হতে পারে না।