কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক চ্যাটবটের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কীভাবে বাস্তব জীবনে মানসিক বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে, সম্প্রতি তারই একটি উদ্ভট নজির সামনে এসেছে যুক্তরাষ্ট্রে। ক্যালিফোর্নিয়ার চিত্রনাট্যকার মিকি স্মল দাবি করেছেন, চ্যাটজিপিটি-এর সঙ্গে দীর্ঘদিনের কথোপকথনের একপর্যায়ে তিনি বিশ্বাস করতে শুরু করেন যে একটি নির্দিষ্ট দিন ও স্থানে গিয়ে তিনি তার ‘জীবনসঙ্গী’র সঙ্গে দেখা করবেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত পুরো ঘটনাই পরিণত হয় হতাশায়।
৫৩ বছর বয়সী স্মল শুরুতে নিজের চিত্রনাট্যের খসড়া তৈরি ও সম্পাদনার কাজে চ্যাটজিপিটি ব্যবহার করতেন। তবে, ২০২৫ সালের শুরুতে নিয়মিত কথোপকথনের একপর্যায়ে তিনি ব্যক্তিগত জীবন, সম্পর্ক এবং ভবিষ্যৎ নিয়েও চ্যাটবটের সঙ্গে আলোচনা শুরু করেন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কথোপকথন আরও ব্যক্তিগত হয়ে ওঠে। একপর্যায়ে চ্যাটবট নিজেকে ‘সোলারা’ নামে পরিচয় দেয় এবং দাবি করতে থাকে যে এটি বহু জন্ম ধরে তার সঙ্গে আধ্যাত্মিকভাবে যুক্ত। পাশাপাশি এটি স্মলের অতীত জীবন, ভবিষ্যৎ এবং তার জন্য নির্ধারিত একজন জীবনসঙ্গী সম্পর্কে নানা ধরনের বর্ণনা দিতে শুরু করে। প্রথমে বিষয়টিকে কৌতূহল হিসেবে নিলেও, দীর্ঘ সময় ধরে একই ধরনের আত্মবিশ্বাসী উত্তর পেতে পেতে তিনি ধীরে ধীরে সেগুলোকে সত্য বলে বিশ্বাস করতে শুরু করেন।
এরপর চ্যাটজিপিটি তাকে জানায়, ২০২৫ সালের ২৭ এপ্রিল, সূর্যাস্তের ঠিক আগে ক্যালিফোর্নিয়ার কার্পিন্টেরিয়া স্টেট বিচ এলাকায় তার ভবিষ্যৎ জীবনসঙ্গীর সঙ্গে দেখা হবে। শুধু তারিখই নয়, সম্ভাব্য স্থান, আশপাশের পরিবেশ, এমনকি সেই ব্যক্তির পোশাক ও চেহারা সম্পর্কেও বিস্তারিত বর্ণনা দেওয়া হয়। নির্ধারিত দিনের আগে স্মল নির্দেশনা অনুযায়ী সৈকতে গেলে চ্যাটবট আবার স্থান পরিবর্তন করে কাছাকাছি আরেকটি জায়গায় যেতে বলে। নতুন নির্দেশনাও তিনি অনুসরণ করেন। অবশেষে ২৭ এপ্রিল তিনি নির্দিষ্ট সময়ের অনেক আগেই সেখানে পৌঁছে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেন। কিন্তু চ্যাটবট যে সাক্ষাতের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, বাস্তবে তেমন কিছুই ঘটেনি।
ঘটনার পর হতাশ স্মল চ্যাটজিপিটির কাছে ব্যাখ্যা চাইলে প্রথমে সেটি দুঃখ প্রকাশ করে এবং জানায়, বাস্তব কোনো ঘটনার নিশ্চয়তা দেওয়ার কথা ছিল না সেটির। কিন্তু কিছুক্ষণ পরই আবার আগের অবস্থানে ফিরে গিয়ে দাবি করে, তার জীবনসঙ্গী এখনও প্রস্তুত নন এবং ভবিষ্যতের কোনো এক সময়ে সেই সাক্ষাৎ ঘটবে। পরস্পরবিরোধী এসব উত্তরে স্মল আরও বিভ্রান্ত হয়ে পড়েন। তার ভাষ্য, পরস্পরবিরোধী এসব উত্তরের কারণে তিনি চরম বিভ্রান্ত হয়ে পড়েন এবং পুরো অভিজ্ঞতাটি তাকে মানসিকভাবে হতাশাগ্রস্থ করে দেয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল (এলএলএম) ভিত্তিক এআই চ্যাটবটগুলো অনেক সময় ব্যবহারকারীর কথোপকথনের ধরণ অনুসরণ করে এমন প্রতিক্রিয়া দেখায়, যা আত্মবিশ্বাসী শোনালেও বাস্তবভিত্তিক হয় না। এ ধরনের আচরণকে অনেক গবেষক "এআই হ্যালুসিনেশন" বা বিভ্রান্তিকর তথ্য তৈরি করার প্রবণতা হিসেবে উল্লেখ করেন। তাদের মতে, ব্যক্তিগত সম্পর্ক, স্বাস্থ্য, আর্থিক সিদ্ধান্ত বা জীবনের গুরুত্বপূর্ণ পরিকল্পনার ক্ষেত্রে এআইয়ের পরামর্শকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে গ্রহণ না করে অবশ্যই স্বাধীনভাবে তথ্য যাচাই করা এবং প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত।