কালিয়াকৈর হাই-টেক পার্কে বিনিয়োগ করতে চায় গুগল-মেটা-টিকটক

গাজীপুরে কালিয়াকৈর হাই-টেক পার্কে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক একটি কোম্পানির প্রস্তাবিত এআই ডেটা সেন্টার প্রকল্পে গুগল, মেটা ও টিকটকসহ বিশ্বের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বিনিয়োগের প্রস্তাব দিয়েছে বলে জানিয়েছেন ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম। প্রকল্পটির নির্মাণকাজ বর্তমানে চলছে। শনিবার (৮ আগস্ট) গাজীপুরের কালিয়াকৈর হাই-টেক পার্ক পরিদর্শনে গিয়ে মন্ত্রী এ তথ্য জানান।

মন্ত্রী বলেন, কালিয়াকৈর হাই-টেক পার্কে প্রাণ ফিরেছে। প্রযুক্তিনির্ভর শিল্পের বিকাশ, দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির সম্ভাবনা এবং চ্যালেঞ্জ দেখতে তিনি পার্কটি পরিদর্শন করেন।

তিনি জানান, নির্বাচনী ইশতেহারের আলোকে ‘ন্যাশনাল গ্রিন ইন্ডাস্ট্রিয়াল পলিসি’ বাস্তবায়ন এবং এআই হাব ও সফটওয়্যার-অ্যাপ-হার্ডওয়্যার উৎপাদনে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে কালিয়াকৈর হাই-টেক পার্কে বিনিয়োগ ত্বরান্বিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিনিয়োগকারীদের জন্য ফিসকাল ও নন-ফিসকাল প্রণোদনার প্রস্তাবও প্রস্তুত করা হচ্ছে।

কালিয়াকৈর হাই-টেক পার্কে এ পর্যন্ত মোট ৮৫টি প্রতিষ্ঠানকে জমি বা স্পেস বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে বিদেশি প্রতিষ্ঠান সাতটি। ৪০টি প্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যে ব্যবসা বা উৎপাদন কার্যক্রম শুরু করেছে। ২৮টি প্রতিষ্ঠানের নির্মাণকাজ চলছে এবং ১৭টি প্রতিষ্ঠানের শিগগিরই নির্মাণকাজ শুরু হবে।

পার্কে মোট বিনিয়োগ প্রস্তাবের পরিমাণ প্রায় ১ দশমিক ৬৩৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এর মধ্যে এখন পর্যন্ত বিনিয়োগ হয়েছে প্রায় ২৮৩ মিলিয়ন ডলার, যা প্রায় ৩ হাজার ২৪৫ কোটি টাকা। আর সরকার মৌলিক অবকাঠামো উন্নয়নে এখন পর্যন্ত ৫০০ কোটি টাকার বেশি ব্যয় করেছে।

বিদেশি বিনিয়োগ প্রসঙ্গে মাহবুব আনাম বলেন, চীন, জাপান, ভারত, দক্ষিণ কোরিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সাতটি প্রতিষ্ঠান থেকে মোট প্রায় ৬২৯ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের বিনিয়োগ প্রস্তাব এসেছে।

তিনি বলেন, কালিয়াকৈর হাই-টেক পার্ক শুধু দেশীয় প্রযুক্তি উৎপাদনের কেন্দ্র নয়, ভবিষ্যতে বিদেশি প্রযুক্তি কোম্পানির উৎপাদন, সংযোজন, গবেষণা-উন্নয়ন ও রপ্তানির গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র ও হাব হিসেবে গড়ে ওঠার সম্ভাবনা রয়েছে।

বর্তমানে পার্কটিতে তিনটি মোবাইল ফোন উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান—অনার, শাওমি ইত্যাদি, দুটি ল্যাপটপ উৎপাদনকারী, একটি এটিএম ও ক্যাশ রিসাইকেলার মেশিন উৎপাদনকারী, ছয়টি ফাইবার অপটিক্যাল কেবল উৎপাদনকারী এবং তিনটি গাড়ি উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান হুন্দাইসহ কার্যক্রম পরিচালনা করছে।

এ ছাড়া আইওটি ডিভাইস, রাউটার, সুইচ, সিসিটিভি, এসি, রেফ্রিজারেটর, হোম অ্যাপ্লায়েন্স, কিডনি ডায়ালাইসিস মেশিন, কিওস্ক ও এটিএম মেশিনসহ বিভিন্ন প্রযুক্তিপণ্য উৎপাদিত হচ্ছে। ডেটা সেন্টার স্থাপনের কাজ করছে দুটি কোম্পানি।

বিনিয়োগ বাড়াতে নীতিগত সুবিধার বিষয়ে মন্ত্রী বলেন, হাই-টেক পার্কে বিনিয়োগ আরও বাড়াতে মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানিতে শুল্ক-কর সুবিধা, বিদ্যুৎ ও গ্যাসসহ প্রয়োজনীয় সেবায় ভ্যাট সুবিধা, হাই-টেক পণ্যের তালিকা সম্প্রসারণ এবং ম্যানুফ্যাকচারিংয়ের পাশাপাশি অ্যাসেম্বলরদেরও সুবিধার আওতায় আনার প্রস্তাব রয়েছে।

একই সঙ্গে স্থানীয় বাজারে পণ্য বিপণনের ক্ষেত্রে কাঁচামালের শুল্ক-কর রেয়াত, স্থিতিশীল আয়কর সুবিধা এবং ইভি ব্যাটারি, সোলার ব্যাটারি, ইউপিএস ব্যাটারি ও ই-বাইকের মতো নতুন প্রযুক্তি খাতের জন্য পৃথক প্রণোদনা কাঠামো তৈরির প্রস্তাবও করা হচ্ছে।

মাহবুব আনাম জানান, ২০০১ সালে বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে সরকার গঠনের পর দেশে প্রথম ‘আইসিটি পলিসি-২০০২’ প্রণয়নের ধারাবাহিকতায় ২০০৪ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি কালিয়াকৈরে ২৩১ দশমিক ৬৫ একর জমিতে হাই-টেক পার্ক প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত হয়। ২০১৬ সালে আরও ৯৭ দশমিক ৩৩ একর জমি যুক্ত করা হয়। বর্তমানে পার্কটির মোট আয়তন প্রায় ৩৭১ একর।

তিনি বলেন, মৌলিক অবকাঠামো উন্নয়নের পর দেশি-বিদেশি কোম্পানিগুলোকে জমি ও রেডি স্পেস বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে সফটওয়্যার, অ্যাপ, হার্ডওয়্যার ও তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর শিল্পের বিকাশ, বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা বৃদ্ধির সুযোগ তৈরি হয়েছে।

ব্যবসায়িক ইকোসিস্টেম যথাযথভাবে গড়ে তোলা গেলে পার্কটি থেকে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ১ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান হবে বলে জানান মন্ত্রী।

অবকাঠামোগত সক্ষমতার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি ও পূর্বানুমেয় নীতিগত সুবিধা নিশ্চিত করা গেলে কালিয়াকৈর হাই-টেক পার্কে বিনিয়োগের গতি আরও বাড়তে পারে। এর মাধ্যমে দেশে প্রযুক্তিপণ্যের স্থানীয় উৎপাদন বৃদ্ধি, আমদানিনির্ভরতা হ্রাস, রফতানি সম্প্রসারণ এবং উচ্চ দক্ষতার কর্মসংস্থান সৃষ্টির সুযোগ তৈরি হবে বলেও তিনি মনে করেন।

সরকারের ঘোষিত ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নের অগ্রগতির অংশ হিসেবে মন্ত্রী এই পরিদর্শন করেন। সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারে আইসিটি খাতে সফটওয়্যার, অ্যাপ ও হার্ডওয়্যার শিল্পে বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে নিয়ে যাওয়া এবং ‘মেইড ইন বাংলাদেশ’ উদ্যোগের মাধ্যমে দেশীয় পণ্যকে বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতামূলক করার অঙ্গীকার রয়েছে।

এ সময় কালিয়াকৈর হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (অতিরিক্ত সচিব) মো. ফজলুর রহমানসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা, সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তর, স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

এর আগে কালিয়াকৈরে অবস্থিত ইউনিভার্সিটি অব ফ্রন্টিয়ার টেকনোলজি, বাংলাদেশ (ইউএফটিবি)-এ আয়োজিত একটি অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে যোগ দেন মন্ত্রী।