আদালতে নিষিদ্ধ মেটার স্মার্ট চশমা, গোপন রেকর্ডিং নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ

নিরাপত্তা ও ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষার বিষয়টি বিবেচনায় ইংল্যান্ড ও ওয়েলসের সব আদালত ভবনে মেটার ক্যামেরাযুক্ত স্মার্ট চশমা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। আদালতে প্রবেশের সময় কারও কাছে এ ধরনের চশমা থাকলে তা সাময়িকভাবে জব্দ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আদালত থেকে বের হওয়ার সময় চশমাটি মালিককে ফেরত দেওয়া হবে।

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইংল্যান্ড ও ওয়েলসের আদালত পরিচালনাকারী সংস্থা হিজ ম্যাজেস্টিস কোর্টস অ্যান্ড ট্রাইব্যুনালস সার্ভিস বা এইচএমসিটিএস এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আদালতের ভেতরে ছবি ও ভিডিও ধারণের ওপর বিদ্যমান আইনি বিধিনিষেধের কারণেই স্মার্ট চশমার ক্ষেত্রে এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

এইচএমসিটিএসের এক মুখপাত্র দ্য গার্ডিয়ানকে বলেছেন, আদালত ও ট্রাইব্যুনালের ভেতরে ছবি তোলা বা ভিডিও ধারণের বিষয়ে স্পষ্ট আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে। সে কারণেই মেটার স্মার্ট চশমা আদালত ভবনে ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হচ্ছে না।

কেন স্মার্ট চশমা নিয়ে এত উদ্বেগ?

মেটার স্মার্ট চশমা দেখতে অনেকটা সাধারণ চশমার মতো হলেও এতে ক্যামেরা ও মাইক্রোফোন রয়েছে। ফলে ব্যবহারকারী চাইলে আশপাশের দৃশ্য বা কথোপকথনের অংশ ধারণ করতে পারেন। যদিও ক্যামেরা চালু হলে চশমায় একটি দৃশ্যমান আলো জ্বলে ওঠে, তারপরও গোপনে তথ্য ধারণের আশঙ্কা নিয়ে বিভিন্ন জায়গায় প্রশ্ন উঠেছে।

দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রেস্তোরাঁ, থিয়েটার ও পানশালার মতো জায়গায়ও এ ধরনের চশমা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। আদালতের মতো সংবেদনশীল জায়গায় যেখানে সাক্ষ্য, ব্যক্তিগত তথ্য ও বিচারিক কার্যক্রম নিয়ে আলোচনা হয়, সেখানে এই ঝুঁকি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

স্মার্টফোন থাকলেও চশমায় নিষেধাজ্ঞা কেন?

আদালতে নির্দিষ্ট শর্ত মেনে স্মার্টফোন নিয়ে প্রবেশের সুযোগ থাকলেও স্মার্ট চশমার ক্ষেত্রে একই ধরনের সুবিধা রাখা হয়নি।

এর কারণ হিসেবে মূলত চশমার রেকর্ডিং সুবিধার বিষয়টিকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। একজন ব্যক্তি কখন স্মার্ট চশমা দিয়ে ছবি বা ভিডিও ধারণ করছেন, তা আশপাশের মানুষ সবসময় সহজে বুঝতে নাও পারেন।

এইচএমসিটিএসের বক্তব্য অনুযায়ী, আদালতের বিচারিক কার্যক্রম রেকর্ড না করার শর্তেই স্মার্টফোন ব্যবহারের কিছু সুযোগ রয়েছে। কিন্তু মেটার স্মার্ট চশমার ক্ষেত্রে নিরাপত্তার স্বার্থে কোনও ব্যতিক্রম রাখা হচ্ছে না।

আদালতে আগেও ঘটেছে এমন ঘটনা

আদালতে স্মার্ট চশমা ব্যবহারের বিষয়টি এর আগেও বিতর্ক তৈরি করেছে। দ্য গার্ডিয়ানের আরেক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি বছরের শুরুতে যুক্তরাজ্যের হাইকোর্টে একটি মামলার শুনানির সময় লাইমোনাস জাকশতিস নামে এক ব্যক্তি স্মার্ট চশমা পরে উপস্থিত হয়েছিলেন। সাক্ষ্য দেওয়ার সময় বিচারক রাকুয়েল অ্যাগনেলো কেসি তাকে চশমাটি খুলে ফেলতে নির্দেশ দেন।

বিচারকের সন্দেহ ছিল, তিনি চশমার মাধ্যমে বাইরে থেকে প্রশ্নের উত্তর পাওয়ার সহায়তা নিচ্ছেন। তবে জাকশতিস এমন অভিযোগ অস্বীকার করেন। তিনি দাবি করেন, চশমাটি তার ফোনের সঙ্গে সংযুক্ত ছিল না।

ঘটনাটি আদালতে স্মার্ট চশমার ব্যবহার নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি করে। কারণ এ ধরনের ডিভাইস শুধু ছবি ও ভিডিও ধারণ করতে পারে না, ভবিষ্যতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক বিভিন্ন সুবিধার সঙ্গেও যুক্ত হতে পারে।

নিউইয়র্কেও নিষিদ্ধ হয়েছে স্মার্ট চশমা

ইংল্যান্ড ও ওয়েলসই প্রথম নয়। যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কেও আদালত ভবনে ক্যামেরা ও রেকর্ডিং সুবিধাযুক্ত স্মার্ট চশমার ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

নিউইয়র্ক স্টেট কোর্ট সিস্টেমের নতুন নিয়ম অনুযায়ী, ২০ জুলাই ২০২৬ থেকে আদালত ভবনে এ ধরনের চশমা নিয়ে প্রবেশ করা যাবে না। নিরাপত্তাকর্মীরা প্রবেশের সময় চশমা জমা নেওয়ার ব্যবস্থা করতে পারবেন। নিউইয়র্ক স্টেট বার অ্যাসোসিয়েশনের প্রকাশিত তথ্যেও আদালত ভবনে স্মার্ট চশমা নিষিদ্ধ করার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে। মূল লক্ষ্য হলো আদালতের কার্যক্রম বা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অনুমতি ছাড়া রেকর্ড করার সম্ভাবনা কমানো।

জাকারবার্গের নিরাপত্তা দলও পড়েছিল প্রশ্নের মুখে

চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার একটি আদালতে মেটার প্রধান নির্বাহী মার্ক জাকারবার্গের নিরাপত্তা দলের কয়েকজন সদস্যকে মেটার স্মার্ট চশমা পরে দেখা যায়।

দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, একটি গুরুত্বপূর্ণ মামলার শুনানির সময় আদালতের বিচারক ক্যারোলিন বি. কুল জাকারবার্গের নিরাপত্তাকর্মীদের সতর্ক করেছিলেন। আদালতের কার্যক্রম স্মার্ট চশমার মাধ্যমে রেকর্ড করা হলে তাদের বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে বলে সতর্ক করা হয়।

প্রযুক্তির সুবিধা বনাম ব্যক্তিগত গোপনীয়তা

স্মার্ট চশমার ব্যবহার শুধু ছবি ও ভিডিও ধারণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। আধুনিক স্মার্ট চশমায় কণ্ঠনির্ভর নিয়ন্ত্রণ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক সহায়তা এবং বিভিন্ন তথ্য শনাক্ত করার মতো সুবিধা যুক্ত হচ্ছে।

ফলে দৈনন্দিন জীবনে প্রযুক্তিটির ব্যবহার আরও বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। একই সঙ্গে প্রশ্ন উঠছে, ব্যবহারকারীর আশপাশের মানুষের সম্মতি ছাড়া কতটা তথ্য সংগ্রহ করা যাবে এবং সেই তথ্য কীভাবে ব্যবহার করা হবে।

বিশেষ করে আদালত, হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কিংবা ব্যক্তিগত আলোচনার মতো সংবেদনশীল জায়গায় এ ধরনের প্রযুক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রে স্পষ্ট নীতিমালা প্রয়োজন হতে পারে।

তবে স্মার্ট চশমার সব ব্যবহারকে নেতিবাচক হিসেবে দেখারও সুযোগ নেই। মেটার স্মার্ট চশমা দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী বা বিশেষ সহায়তা প্রয়োজন এমন মানুষের জন্য প্রযুক্তিনির্ভর কিছু সুবিধা দেওয়ার সম্ভাবনাও তৈরি করেছে।

সব মিলিয়ে ইংল্যান্ড ও ওয়েলসের আদালতে মেটার স্মার্ট চশমা নিষিদ্ধ করার ঘটনা দেখিয়ে দিচ্ছে, নতুন প্রযুক্তি মানুষের জীবনে যত দ্রুত প্রবেশ করছে, তার ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ ও ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষার প্রশ্নও তত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান, হিজ ম্যাজেস্টিস কোর্টস অ্যান্ড ট্রাইব্যুনালস সার্ভিস, নিউইয়র্ক স্টেট কোর্ট সিস্টেম ও নিউইয়র্ক স্টেট বার অ্যাসোসিয়েশন।