২০০ মেগাপিক্সেল রোবোটিক ক্যামেরাযুক্ত বিশ্বের প্রথম ‘রোবট ফোন’ আনলো অনার

বিগত কয়েক বছর ধরে সিনেমা নির্মাতাদের ও কন্টেন্ট নির্মাতাদের হাতে হাতে দেখা যাচ্ছে ক্যামেরা গিম্বল, যা ভিডিওগ্রাফির জন্য এখন রীতিমত আবশ্যক হয়ে গেছে। সম্প্রতি এই ফিচারটি স্বয়ং স্মার্টফোনের মধ্যেই সমন্বয় করে প্রচলিত ক্যামেরা নকশা থেকে বেরিয়ে এবার রোবোটিক ক্যামেরা-যুক্ত ‘অনার রোবট ফোন’ উন্মোচন করেছে অনার। চীনের জন্য এক্সক্লুসিভ ফ্ল্যাগশিপ ফোনটির সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হলো পেছনের প্যানেলে থাকা মোটরচালিত গিম্বল আর্ম, যার মাধ্যমে ক্যামেরা নিজে ঘুরতে, কাত হতে এবং ব্যবহারকারীর দিকে ফোকাস করতে পারে। ২০২৬ সালের মোবাইল ওয়ার্ল্ড কংগ্রেসে প্রথমবারের মতো প্রিভিউ হওয়া এই ফোনটি নিয়ে এতদিনের জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে চলতি মাসের শুরুতেই চীনের বাজারে আনুষ্ঠানিকভাবে উন্মোচন করেছে অনার।

ফোনটির প্রধান ক্যামেরায় রয়েছে ২০০ মেগাপিক্সেলের সেন্সর, যা চারদিকে স্বাধীনভাবে নড়াচড়া করতে সক্ষম একটি টাইটানিয়াম অ্যালয় ৩-অ্যাক্সিসবিশিষ্ট গিম্বলের সঙ্গে যুক্ত। ৬০টির বেশি উৎপাদন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে গিম্বলটি তৈরি করতে ১০০টিরও বেশি সূক্ষ্ম যন্ত্রাংশ ব্যবহার করা হয়েছে। মাত্র ৬ মিলিমিটার পুরু এবং ২.৬ গ্রাম ওজনের একটি ক্ষুদ্র মোটর পুরো রোবোটিক ক্যামেরা মডিউলটি পরিচালনা করে। গিম্বলটির মেশিনিং-নির্ভুলতা রাখা হয়েছে মাত্র ০.০০৫ মিলিমিটারে, ফলে ক্যামেরাটি অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে বিভিন্ন দিকে নড়াচড়া করতে পারে। পুরো গিম্বল কাঠামোটি তৈরি করা হয়েছে অ্যারোস্পেস-গ্রেড টাইটানিয়াম দিয়ে। আগের প্রজন্মের নকশার তুলনায় নতুন কাঠামোটি ৩৪ শতাংশ ছোট হওয়া সত্ত্বেও এর টর্ক ঘনত্ব বেড়েছে ৪৪ শতাংশ, অর্থাৎ তুলনামূলক কম জায়গা ও ওজনের মধ্যে ক্যামেরাকে নড়াচড়া করানোর জন্য এটি আরও বেশি শক্তি সরবরাহ করতে সক্ষম।

মূল ক্যামেরায় রয়েছে ১/১.২৮-ইঞ্চি সেন্সর ও এফ/১.৬ অ্যাপারচার, সঙ্গে ৪কে ভিডিও রেকর্ডিং-এর সুবিধা। এআই-ভিত্তিক সাবজেক্ট ট্র্যাকিং, স্বয়ংক্রিয় ফ্রেমিং ও ভয়েস কমান্ডের মাধ্যমে ক্যামেরা নিয়ন্ত্রণ করা যায় ফোনটিতে। এর সঙ্গে রয়েছে ২০০ মেগাপিক্সেলের পেরিস্কোপ টেলিফটো ক্যামেরা, ২.৭x অপটিক্যাল জুম এবং ৫০ মেগাপিক্সেলের আলট্রাওয়াইড ক্যামেরা।

ভিডিও নির্মাতাদের জন্য অনার জার্মান সিনেমা প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ARRI-এর সঙ্গে কাজ করেছে। এতে লগ-সি৩ ভিডিও এনকোডিং, ডিভাইসেই এলইউটি কালার গ্রেডিং এবং সিনেমা মোড রয়েছে। ছয়টি প্রোফেশনাল ক্যামেরা মুভমেন্ট মোড—ডিফল্ট স্ট্যাবিলাইজেশন, পিচ লক, এফপিভি, এফপিভি ভার্টিক্যাল, সুপার স্ট্যাবল এবং রোটেশন, সমর্থন করে এই গিম্বলটির কল্যাণে। ARRI-এর কালার সায়েন্সের মাধ্যমে ২.৩৯:১ সিনেমাটিক ওয়াইডস্ক্রিন রেশিও পাওয়া যায় ভিডিওতে।

রোবোটিক অংশটির কার্যকারিতা শুধু ক্যামেরাতেই সীমাবদ্ধ নয়। অনারের নিজস্ব ইয়োইয়ো এআই অ্যাসিস্ট্যান্ট চারপাশের পরিবেশ ও ব্যবহারকারীকে শনাক্ত করে বিভিন্ন কাজ করতে পারে। ফোনটিতে মাথা নাড়া, উঁকি দেওয়া ও নাচার মতো ১০০টির বেশি মুখভঙ্গি ও নড়াচড়ার অ্যানিমেশন রয়েছে। ইয়োইয়ো প্রো মোড জটিল কাজ স্বয়ংক্রিয়ভাবে সম্পন্ন করতে পারে এবং কাস্টম স্কিলও ব্যবহার করা যায়। এআই ফোকাস ট্র্যাকিং-এর মাধ্যমে গিম্বল চালু করা, জয়স্টিক নিয়ন্ত্রণ, সাবজেক্ট ট্র্যাকিং ও ফোকাস বদলানো সম্ভব; ভিডিও কলেও ক্যামেরা নিজে সুবিধামতো অবস্থান পরিবর্তন করতে পারে।

ফোনটির হার্ডওয়্যারে রয়েছে ৬.৩১-ইঞ্চির এলটিপিও ডিসপ্লে, ১২০হার্টজ রিফ্রেশ রেট ও সর্বোচ্চ ৬,৮০০ নিট উজ্জ্বলতা। ফোনটির প্রসেসর হিসেবে রয়েছে স্ন্যাপড্রাগন ৮এলিট জেন ৫ চিপ। সর্বোচ্চ ১৬জিবি র‍্যাম +১টেরাবাইট স্টোরেজের সংস্করণে পাওয়া যাচ্ছে ফোনটি। সঙ্গে রয়েছে ৭,০৬০মিলিঅ্যাম্পায়ার-আওয়ার সিলিকন-কার্বন ব্যাটারি, ১২০ওয়াট তারযুক্ত ও ৫০ওয়াট ওয়্যারলেস চার্জিং। ফোনটির পুরুত্ব ৯.৬ মিমি এবং গিম্বলসহ বড় ক্যামেরা হাউস থাকার কারণে ওজন ২৪৮ গ্রাম।

চীনে ১২জিবি+৫১২জিবি সংস্করণের দাম ৯,৯৯৯ ইউয়ান (বাংলাদেশি টাকায় প্রায় ১লক্ষ ৮২হাজার টাকা), আর ১৬জিবি+১টিবি সংস্করণের দাম ১২,৯৯৯ ইউয়ান (বাংলাদেশি টাকায় প্রায় ২লক্ষ ৩৭হাজার টাকা)। চীনের বাজারে আনুষ্ঠানিকভাবে উন্মোচনের পর ফোনটির প্রি-অর্ডার/প্রি-সেল শুরু হয়েছে, তবে বাজারে সরাসরি বিক্রি শুরু হবে আগামী ১৮ আগস্ট থেকে। আপাতত আন্তর্জাতিক বাজারে ফোনটি আনার কোনো ঘোষণা দেয়নি অনার। এমনকি চীনের বাইরে আন্তর্জাতিক বাজারে ফোনটি ভবিষ্যতেও মুক্তি পাওয়ার সম্বাবনা অনিশ্চিত। প্রতিষ্ঠানটি তাই ডিভাইসটিকে সাধারণ ফ্ল্যাগশিপের চেয়ে ভ্লগার, লাইভস্ট্রিমার, ফটোগ্রাফার ও মোবাইল কনটেন্ট নির্মাতাদের জন্য বিশেষায়িত স্মার্টফোন হিসেবেই তুলে ধরছে।