বিশ্বের উষ্ণতা বাড়াতে পারে উড়োজাহাজের তৈরি ‘কনট্রেল’, এড়াতে নতুন উদ্যোগ

আকাশে উড়োজাহাজের পেছনে সাদা রেখার মতো যে দাগ দেখা যায়, সেটিকে অনেকেই বিমানের ‘ধোঁয়া’ বলে মনে করেন। কিন্তু এগুলো আসলে কনট্রেইল বা বরফকণায় তৈরি এক ধরনের মেঘ। বিশেষ কিছু আবহাওয়ায় এই মেঘ দীর্ঘসময় স্থায়ী হয়ে পৃথিবীর তাপ আটকে রাখতে পারে। অর্থাৎ পৃথিবীর তাপমাত্রা আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।

এবার এসব উষ্ণতা বাড়ানো কনট্রেইল এড়িয়ে বিমান চলাচলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ব্যবহার করে পরীক্ষা চালাতে যাচ্ছে যুক্তরাজ্য। বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রায় ৫০ লাখ পাউন্ডের এই পরীক্ষামূলক প্রকল্পে গুগল, যুক্তরাজ্য সরকার, দেশটির আবহাওয়া দফতর, বিমান চলাচল নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা ন্যাটস এবং ক্যামব্রিজ ও ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডনের গবেষকেরা অংশ নিচ্ছেন।

কীভাবে কাজ করবে এআই

প্রকল্পটির নাম দেওয়া হয়েছে ‘অপারেশন ব্লু স্কাইজ’। প্রায় ৩০ মাসের এই পরীক্ষায় উত্তর আটলান্টিকের পূর্ব অংশের শ্যানউইক মহাসাগরীয় আকাশসীমাকে কেন্দ্র করে কাজ করা হবে। বিবিসি জানিয়েছে, বৈশ্বিক কনট্রেইল-সৃষ্ট উষ্ণায়নের প্রায় ৫ শতাংশের সঙ্গে এই আকাশপথের সম্পর্ক রয়েছে।

এআই ব্যবস্থাটি প্রথমে আগের বিমান চলাচলের তথ্য ও স্যাটেলাইট ছবি বিশ্লেষণ করবে। কোথায় আগে কনট্রেইল তৈরি হয়েছে, সেই তথ্যের সঙ্গে আবহাওয়ার বিভিন্ন উপাত্ত মিলিয়ে দেখা হবে।

এরপর এআই অনুমান করবে, কোন এলাকায় নির্দিষ্ট সময়ে কনট্রেইল তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। সেই তথ্য বিমান চলাচল নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা ন্যাটসের কাছে পাঠানো হবে। প্রয়োজন হলে নিয়ন্ত্রকেরা পাইলটকে সামান্য উচ্চতা পরিবর্তনের নির্দেশ দিতে পারবেন।

খুব বেশি বদলাতে হবে না বিমানের পথ

প্রকল্পটির অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো, কনট্রেইল এড়াতে বিমানকে বড় ধরনের ঘুরপথে নেওয়ার পরিকল্পনা নেই। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে বিমানের উচ্চতা প্রায় ২ হাজার ফুট পরিবর্তন করলেই কাজ হতে পারে।

উত্তর আটলান্টিকের আকাশপথে আবহাওয়া বা ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতি এড়াতে বিমানের উচ্চতা পরিবর্তন করা এমনিতেই নিয়মিত ঘটনা। ফলে নতুন পদ্ধতিটি বিমান পরিচালনার ক্ষেত্রে বড় কোনো পরিবর্তন তৈরি করবে না।

পরীক্ষামূলক কার্যক্রম ২০২৬-২৭ এবং ২০২৭-২৮ সালের শীত মৌসুমের নির্দিষ্ট সন্ধ্যা ও রাতে চালানো হবে। ওই সময়ে আকাশপথে প্রায় ১০ হাজার ফ্লাইট চলাচল করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে এর একটি ছোট অংশকেই কনট্রেইল এড়াতে উচ্চতা পরিবর্তন করতে হতে পারে।

কেন কনট্রেইল নিয়ে এত চিন্তা

উচ্চ আকাশে বিমানের ইঞ্জিন থেকে বের হওয়া গরম গ্যাস যখন অত্যন্ত ঠান্ডা বাতাসের সংস্পর্শে আসে, তখন জলীয়বাষ্প জমে বরফের ক্ষুদ্র কণায় পরিণত হয়। এর ফলেই তৈরি হয় কনট্রেইল।

বেশিরভাগ কনট্রেইল অল্প সময়ের মধ্যে মিলিয়ে যায়। তবে আকাশে আর্দ্রতা বেশি এবং তাপমাত্রা খুব কম থাকলে এগুলো দীর্ঘসময় টিকে থাকতে পারে। ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ে তৈরি করতে পারে মেঘের মতো স্তর। এই মেঘ পৃথিবী থেকে বের হয়ে যেতে চাওয়া তাপের কিছু অংশ আটকে দিতে পারে।

গুগলের প্রযুক্তি কর্মকর্তা ড. পল হজসন বিবিসিকে জানিয়েছেন, বিমান চলাচলের কারণে সৃষ্ট মোট জলবায়ু উষ্ণায়নের প্রায় এক-তৃতীয়াংশের সঙ্গে কনট্রেইলের সম্পর্ক থাকতে পারে। তবে সঠিক পরিমাণ নিয়ে বৈজ্ঞানিক অনিশ্চয়তা রয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেছেন।

বাড়তি জ্বালানি খরচ কতটা

তবে বিমানের উচ্চতা পরিবর্তন করলে অতিরিক্ত জ্বালানি খরচ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে প্রশ্ন উঠেছে, কনট্রেইল এড়াতে গিয়ে যদি বেশি জ্বালানি পোড়াতে হয়, তাহলে আদৌ জলবায়ুর লাভ হবে কি না।

অপারেশন ব্লু স্কাইজের গবেষকেরা বলছেন, অতিরিক্ত জ্বালানি ব্যবহারের কারণে যে কার্বন নিঃসরণ হবে, তার তুলনায় কনট্রেইল এড়িয়ে যাওয়ার সম্ভাব্য জলবায়ু সুবিধা বেশি হতে পারে।

গুগলের ড. হজসনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, আগের পরীক্ষাগুলোতে বিমানের উচ্চতা সামান্য পরিবর্তনের মাধ্যমে কনট্রেইল তৈরি বা এর উষ্ণায়ন প্রায় ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ পর্যন্ত কমানোর সম্ভাবনা দেখা গেছে।

প্রকল্পটির মডেলিং অনুযায়ী, শ্যানউইক আকাশসীমায় পুরোপুরি পথ পরিবর্তন করতে হলে কোনো কোনো বিমানের অতিরিক্ত প্রায় ১০০ কেজি জ্বালানি প্রয়োজন হতে পারে।

যুক্তরাজ্যের জন্য ‘বিশ্বের প্রথম’ পরীক্ষা

যুক্তরাজ্যের বিমান চলাচলমন্ত্রী কিয়ার মেদার বলেছেন, আটলান্টিকের ওপর বিমানের উড্ডয়নপথে ছোটখাটো পরিবর্তনের মাধ্যমে বিমান চলাচলকে আরও পরিবেশবান্ধব করার সম্ভাবনা এই প্রকল্পে পরীক্ষা করা হবে। তাঁর ভাষায়, এটি একটি বিশ্ব-প্রথম উদ্যোগ।

যুক্তরাজ্য সরকার এই প্রকল্পে প্রায় ২৬ লাখ ৫০ হাজার পাউন্ড অর্থ দিচ্ছে। অন্যদিকে গুগল এআই গবেষণা, প্রকৌশল ও কম্পিউটিং অবকাঠামোর মাধ্যমে প্রায় ১৪ লাখ পাউন্ড সহায়তা করছে বলে বিবিসি জানিয়েছে।

তবে এই প্রযুক্তির প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা যেমন রয়েছে, তেমনি বিমান চলাচল বাড়তে থাকলে প্রযুক্তির মাধ্যমে এর পরিবেশগত ক্ষতি কতটা কমানো সম্ভব, সেই প্রশ্নও থাকছে। বিশেষ করে গুগলের মতো প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেরাই বিপুল শক্তি ব্যবহারকারী এআই ডেটা সেন্টারে বিনিয়োগ করছে।

সব মিলিয়ে, অপারেশন ব্লু স্কাইজ দেখাবে এআই শুধু সফটওয়্যার, চ্যাটবট বা তথ্য বিশ্লেষণের কাজে নয়, আকাশপথের পরিবেশগত সমস্যাও মোকাবিলায় ব্যবহার করা যায় কি না। পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশের পর তা অন্য দেশ ও বিমান সংস্থাগুলো কনট্রেইল কমানোর কাজে ব্যবহার করতে পারবে কি না, সেটিই এখন দেখার বিষয়।