স্মার্টফোনের সঙ্গে ইয়ারবাড বা অন্য কোনো স্মার্ট ডিভাইস সংযুক্ত করা, ছোটখাটো ফাইল শেয়ার করা কিংবা তারবিহীনভাবে কোনো এক্সটার্নাল ডিভাইস যুক্ত করতে ব্লুটুথ আমাদের নিত্যদিনের সঙ্গী। ডিজিটাল ডিভাইসে থাকা এই প্রযুক্তি সবার পরিচিত হলেও এর নামের পেছনের ইতিহাস অনেকেরই অজানা। মজার বিষয় হলো, ‘ব্লুটুথ’ নামটির সঙ্গে আধুনিক তারবিহীন প্রযুক্তির সরাসরি কোনো সম্পর্ক নেই। এর উৎস খুঁজতে গেলে ফিরে যেতে হয় প্রায় এক হাজার বছর আগের স্ক্যান্ডিনেভিয়ার এক ভাইকিং রাজার ডাকনামে।
তারবিহীন এই প্রযুক্তির নাম এসেছে ডেনমার্কের রাজা হ্যারাল্ড গোরমসনের ডাকনাম ‘ব্লুটুথ’ থেকে। দশম শতকের এই রাজা ডেনমার্ককে একত্রিত করার পাশাপাশি নরওয়ের কিছু অংশে নিজের প্রভাব বিস্তার করেছিলেন। ইতিহাসে তাকে স্ক্যান্ডিনেভিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলকে একত্রিত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনকারী শাসক হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
তবে হ্যারাল্ড কেন ‘ব্লুটুথ’ নামে পরিচিত হয়েছিলেন, তা নিয়ে নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিক তথ্য সীমিত। প্রচলিত একটি ব্যাখ্যা অনুযায়ী, তার একটি দাঁত নীলচে বা গাঢ় রঙের হয়ে গিয়েছিল। সেখান থেকেই ‘ব্লুটুথ’ ডাকনামের উৎপত্তি। তবে নামটির প্রকৃত উৎস নিয়ে ভিন্ন ঐতিহাসিক ব্যাখ্যাও রয়েছে।
আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে এই ভাইকিং রাজার যোগসূত্র তৈরি হয় ১৯৯৬ সালে। সে সময় ইন্টেল, এরিক্সন, নোকিয়াসহ কয়েকটি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান স্বল্প-পাল্লার বেতার যোগাযোগ প্রযুক্তির জন্য একটি অভিন্ন মান তৈরির কাজ করছিল। লক্ষ্য ছিল বিভিন্ন নির্মাতার কম্পিউটার, মোবাইল ফোন ও অন্যান্য ডিভাইসকে তার ছাড়াই একে অপরের সঙ্গে সংযুক্ত করা।
ইন্টেলের প্রকৌশলী জিম কার্ডাচ এই প্রকল্পের অস্থায়ী কোডনেম হিসেবে ‘ব্লুটুথ’ নামটি প্রস্তাব করেন। এর পেছনে ছিল রাজা হ্যারাল্ডের ঐতিহাসিক ভূমিকার সঙ্গে নতুন প্রযুক্তির উদ্দেশ্যের একটি প্রতীকী মিল। হ্যারাল্ড যেমন বিভিন্ন অঞ্চলকে একত্রিত করেছিলেন, তেমনি এই প্রযুক্তির লক্ষ্য ছিল বিভিন্ন ডিভাইস ও প্রযুক্তিকে একটি অভিন্ন বেতার সংযোগ ব্যবস্থার আওতায় আনা।
তবে শুরুতে ‘ব্লুটুথ’ নামটি স্থায়ীভাবে ব্যবহারের পরিকল্পনা ছিল না। প্রকল্পটির জন্য ‘পার্সোনাল এরিয়া নেটওয়ার্কিং’ (প্যান) ও ‘রেডিও-ওয়্যার’-এর মতো বিকল্প নামও বিবেচনা করা হয়েছিল। কিন্তু ‘প্যান’ নামটি আগে থেকেই অন্য একটি প্রযুক্তিগত ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হওয়ায় এবং ‘রেডিও-ওয়্যার’-এর ট্রেডমার্ক-সংক্রান্ত প্রক্রিয়া সময়মতো সম্পন্ন না হওয়ায় শেষ পর্যন্ত অস্থায়ী কোডনেম ‘ব্লুটুথ’ই স্থায়ী নাম হিসেবে থেকে যায়।
ব্লুটুথের ইতিহাস শুধু নামের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এর লোগোর নকশাতেও রাজা হ্যারাল্ডের পরিচয় সরাসরি প্রতিফলিত হয়েছে। ব্লুটুথের প্রতীকটি প্রাচীন স্ক্যান্ডিনেভীয় ইয়াংগার ফুথার্ক রুনলিপির দুটি রুন—হাগাল ও জারকান এর সমন্বয়ে তৈরি। হাগাল রুনটি ‘এইচ’ এবং জারকান রুনটি ‘বি’ ধ্বনির প্রতিনিধিত্ব করে। এই দুটি রুন পাশাপাশি যুক্ত করে তৈরি করা হয়েছে একটি একক প্রতীক, যা হ্যারাল্ড ব্লুটুথের নামের আদ্যক্ষরকে নির্দেশ করে।
ব্লুটুথের নাম ও লোগোর পেছনের এই ইতিহাস প্রযুক্তির সঙ্গে অতীতের এক অপ্রত্যাশিত সংযোগ তুলে ধরে। রাজা হ্যারাল্ডের ‘ব্লুটুথ’ নাম এবং বিভিন্ন অঞ্চলকে একত্রিত করার ইতিহাস থেকেই অনুপ্রেরণা নিয়ে তৈরি এই প্রযুক্তির পরিচয় আজ বিশ্বজুড়ে ডিভাইসগুলোর মধ্যে সংযোগ স্থাপনের প্রতীক হয়ে উঠেছে। ফলে প্রতিদিনের প্রযুক্তি ব্যবহারের আড়ালেও যে শত শত বছরের ইতিহাস ও সংস্কৃতির ছাপ থাকতে পারে, ব্লুটুথ তারই একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ।