অস্ত্রোপচারের পর জ্ঞান ফিরতেই চারপাশটা স্পষ্ট দেখতে পেলেন রাইস হিবার্ট। অথচ এর কিছুদিন আগেও দৃষ্টিসীমার নিচের অংশে দেখতে না পাওয়ায় হাঁটতে গিয়ে বারবার হোঁচট খেতেন তিনি। এমনকি চলাফেরার জন্য লাঠিরও সাহায্য নিতে হতো। চিকিৎসকেরা আশঙ্কা করছিলেন, অস্ত্রোপচার না হলে ধীরে ধীরে পুরোপুরি দৃষ্টিশক্তি হারাতে পারেন ৪৮ বছর বয়সী এই ব্যক্তি।
শেষ পর্যন্ত লন্ডনের ন্যাশনাল হসপিটাল ফর নিউরোলজি অ্যান্ড নিউরোসার্জারিতে (এনএইচএনএন) তার পিটুইটারি গ্রন্থির টিউমার অপসারণ করা হয়। এই অস্ত্রোপচারে ছিল বিশেষ একটি দিক; লাইভ সার্জারির সময় প্রথমবারের মতো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে সার্জনদের সহায়তা করা হয়। অস্ত্রোপচারের পর হিবার্টের দৃষ্টিশক্তির উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছে।
অস্ত্রোপচারটি করা হয় চলতি বছরের মে মাসে। তবে রোগীর সুস্থতা নিশ্চিত হওয়ার পর এর বিস্তারিত প্রকাশ করা হয়েছে। পুরো প্রক্রিয়ায় নিয়ন্ত্রণ ছিল সার্জনের হাতেই। এআই সরাসরি অস্ত্রোপচার পরিচালনা করেনি; বরং সহায়ক প্রযুক্তি হিসেবে কাজ করেছে।
অপারেশনের সময় ক্যামেরায় ধারণ করা লাইভ ভিডিও এআই রিয়েল টাইমে বিশ্লেষণ করে মস্তিষ্কের গুরুত্বপূর্ণ গঠনগুলো শনাক্ত করেছে। বিশেষ করে পিটুইটারি গ্রন্থির আশপাশের রক্তনালি ও দৃষ্টিনিয়ন্ত্রণকারী স্নায়ুগুলো চিহ্নিত করে সার্জনদের ঝুঁকিপূর্ণ অংশ এড়িয়ে টিউমার অপসারণে সহায়তা করেছে। এ ক্ষেত্রে অস্ত্রোপচারের আগে করা কোনো স্ক্যান নয়, সরাসরি অস্ত্রোপচারের সময়কার ভিডিও বিশ্লেষণ করেছে এআই।
মস্তিষ্কের এই অংশে পিটুইটারি গ্রন্থি, রক্তনালি ও দৃষ্টিনিয়ন্ত্রণকারী স্নায়ু খুব কাছাকাছি অবস্থান করে। ফলে মাত্র এক মিলিমিটারের ভুলও গুরুতর জটিলতা তৈরি করতে পারে—দৃষ্টিশক্তি হারানো, স্ট্রোক এমনকি মৃত্যুও হতে পারে। এ কারণে টিউমার অপসারণের সময় গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলো শনাক্ত করা অত্যন্ত জরুরি।
ইউসিএলের রোবোটিকস ও এআই বিশেষজ্ঞ ড. সোফিয়া বানো জানান, সিস্টেমটি শত শত অস্ত্রোপচারের ভিডিও দিয়ে প্রশিক্ষিত। গুরুত্বপূর্ণ শারীরিক গঠন, অস্ত্রোপচারের যন্ত্র এবং যন্ত্রের সঙ্গে টিস্যুর মিথস্ক্রিয়া রিয়েল টাইমে শনাক্ত করার জন্য এটি তৈরি করা হয়েছে।
হিবার্টের টিউমারটি ধরা পড়ে ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে। হাঁটার সময় হঠাৎ জ্ঞান হারিয়ে খিঁচুনি হওয়ার পর হাসপাতালে পরীক্ষা করাতে গিয়ে পিটুইটারি গ্রন্থিতে প্রায় ১১ মিলিমিটার আকারের টিউমারটি শনাক্ত হয়। শুরুতে অস্ত্রোপচার ছাড়াই তার চিকিৎসা চলছিল। পরে হরমোনের ভারসাম্যহীনতা ও দৃষ্টিশক্তির সমস্যা বাড়তে থাকে।
দৃষ্টিসীমার নিচের অংশে দেখতে না পাওয়ার কারণে হাঁটার সময় বারবার হোঁচট খেতেন হিবার্ট। একপর্যায়ে লাঠি ব্যবহার শুরু করেন তিনি। অস্ত্রোপচার না করলে টিউমারটি তার দৃষ্টিশক্তির জন্য আরও বড় হুমকি হয়ে উঠতে পারত এবং শেষ পর্যন্ত অন্ধত্বের কারণ হতে পারত।
অস্ত্রোপচারের পর অবশ্য পরিস্থিতি বদলে যায়। হিবার্ট জানান, জ্ঞান ফেরার পর তিনি ঘরের সবকিছু স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিলেন। এক সপ্তাহের মধ্যেই চশমা বা লাঠির সাহায্য ছাড়াই হাঁটতে শুরু করেন তিনি। বর্তমানে বাড়িতে সুস্থ হয়ে উঠছেন এবং ধীরে ধীরে প্রতিদিনের হাঁটার সময়ও বাড়াচ্ছেন।
প্রযুক্তিটি ইউসিএলের হকস ইনস্টিটিউটে তৈরি। ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর হেলথ অ্যান্ড কেয়ার রিসার্চ (এনআইএইচআর) ও গুগলের অর্থায়নে পরিচালিত একটি ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের অংশ হিসেবে এটি ব্যবহার করা হচ্ছে। এর আগে প্রযুক্তিটি গবেষণা ও সার্জনদের প্রশিক্ষণের কাজে ব্যবহার করা হয়েছে। তবে হিবার্টের অস্ত্রোপচারেই প্রথমবার কোনো রোগীর লাইভ সার্জারিতে এই প্রযুক্তি ব্যবহার করা হলো।
গবেষকেরা বলছেন, ভবিষ্যতে জটিল অস্ত্রোপচারে গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ শনাক্ত করার পাশাপাশি অস্ত্রোপচারের যন্ত্রের অবস্থান এবং টিস্যুর সঙ্গে যন্ত্রের মিথস্ক্রিয়াও পর্যবেক্ষণে এআই ব্যবহার করা যেতে পারে। এর মাধ্যমে জটিল অস্ত্রোপচারে সার্জনদের আরও নির্ভুলভাবে সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।