সাধারণ রক্ত পরীক্ষাতেই গুরুতর হার্ট ফেইলিউর শনাক্তে এআইয়ের সাফল্য

হৃদ্‌যন্ত্র কতটা কার্যকরভাবে রক্ত পাম্প করছে, তা জানতে সাধারণত ইকোকার্ডিওগ্রাফির মতো বিশেষায়িত পরীক্ষা প্রয়োজন হয়। তবে এবার সাধারণ রক্ত পরীক্ষার তথ্য ব্যবহার করেই হৃদ্‌যন্ত্রের গুরুতর দুর্বলতা শনাক্তের জন্য একটি মেশিন লার্নিংভিত্তিক এআই মডেল তৈরি করেছেন চীনের গবেষকেরা। পরীক্ষায় মডেলটি গুরুতর হার্ট ফেইলিউর শনাক্তে সর্বোচ্চ ৯১ দশমিক ২ শতাংশ সংবেদনশীলতা দেখিয়েছে। গবেষকদের মতে, ভবিষ্যতে কোন রোগীকে দ্রুত ইকোকার্ডিওগ্রাফির জন্য অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন, তা নির্ধারণে এটি সহায়ক হতে পারে।

গবেষণাটি পরিচালনা করেন চীনের গুয়াংজি মেডিকেল ইউনিভার্সিটির অষ্টম অধিভুক্ত হাসপাতালের গবেষক ঝিপিং মেং ও তার সহকর্মীরা। এ গবেষণায় হাসপাতালে ভর্তি দীর্ঘমেয়াদি হার্ট ফেইলিউরে আক্রান্ত ১ হাজার ৪৮০ জন রোগীর তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়। তাদের মধ্যে ৩৭৭ জনের HFrEF ছিল।

HFrEF বলতে এমন ধরনের হার্ট ফেইলিউরকে বোঝায়, যেখানে হৃদ্‌যন্ত্রের প্রধান পাম্পিং চেম্বার পর্যাপ্ত শক্তিতে সংকুচিত হতে না পারায় শরীরে স্বাভাবিক পরিমাণে রক্ত পাঠানোর ক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। অন্যদিকে, বাকি ১ হাজার ১০৩ জনের হৃদ্‌যন্ত্রের পাম্পিং ক্ষমতা পুরোপুরি স্বাভাবিক না হলেও তুলনামূলকভাবে ভালো ছিল। তাঁদের হার্ট ফেইলিউরকে ‘মাইল্ডলি রিডিউসড’ বা ‘প্রিজার্ভড ইজেকশন ফ্র্যাকশন’ শ্রেণিতে রাখা হয়—যেখানে হৃদ্‌যন্ত্রের পাম্পিং ক্ষমতা হয় সামান্য কমে যায়, অথবা মোটামুটি স্বাভাবিক থাকে। তবে পাম্পিং ক্ষমতা তুলনামূলকভাবে স্বাভাবিক থাকলেও এসব রোগীর হার্ট ফেইলিউরের উপসর্গ ও অন্যান্য জটিলতা দেখা দেওয়ার সম্ভাবনা ছিল।

সাধারণত হৃদ্‌যন্ত্রের রক্ত পাম্প করার সক্ষমতা এবং ইজেকশন ফ্র্যাকশন নির্ণয়ে ইকোকার্ডিওগ্রাফির প্রয়োজন হয়। তবে এই গবেষণায় হৃদ্‌যন্ত্রের কোনও ছবি ব্যবহার করা হয়নি। বরং সাধারণ রক্ত পরীক্ষায় পাওয়া ১৩টি জৈবিক সূচকের তথ্য দিয়ে ছয় ধরনের মেশিন লার্নিং অ্যালগরিদমকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়, যাতে রক্তের বিভিন্ন পরিবর্তনের ভিত্তিতে গুরুতর হার্ট ফেইলিউরের ধরন শনাক্ত করা যায়। এর মধ্যে ‘র‍্যান্ডম ফরেস্ট’ ও ‘এক্সজিবুস্ট’ অ্যালগরিদম সবচেয়ে ভালো ফল দেখিয়েছে। উভয়ের এইউসি (এরিয়া আন্ডার দ্য কার্ভ) স্কোর ছিল ০ দশমিক ৭৮৯, যা গুরুতর হার্ট ফেইলিউরে আক্রান্ত রোগী এবং অন্য ধরনের হার্ট ফেইলিউর থাকা রোগীদের মধ্যে পার্থক্য শনাক্ত করার ক্ষেত্রে মডেলগুলোর সক্ষমতা নির্দেশ করে।

গবেষণায় দেখা গেছে, গুরুতর HFrEF রোগীদের রক্ত পরীক্ষায় কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সূচকের মাত্রা অন্য ধরনের হার্ট ফেইলিউর থাকা রোগীদের তুলনায় ভিন্ন ছিল। এর মধ্যে রয়েছে প্রোবিএনপি, ব্লাড ইউরিয়া নাইট্রোজেন, বিলিরুবিন, গামা-গ্লুটামাইল ট্রান্সফারেজ, হেমাটোক্রিট ও ইউরিক এসিড। এসব সূচক শরীরে হৃদ্‌যন্ত্রের ওপর চাপ, কিডনি ও লিভারের কার্যকারিতা এবং রক্তের বিভিন্ন অবস্থার বিষয়ে তথ্য দিতে পারে। এআই মডেল এসব তথ্যের মধ্যে থাকা সম্পর্ক বিশ্লেষণ করে গুরুতর হৃদ্‌যন্ত্রের দুর্বলতার সম্ভাবনা নির্ধারণ করেছে। এর মধ্যে প্রোবিএনপি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবে উঠে এসেছে, কারণ হৃদ্‌যন্ত্রের ওপর চাপ বাড়লে সাধারণত এই উপাদানের মাত্রা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়ে যেতে পারে।

মডেলটির ডিফল্ট সেটিংসে গুরুতর রোগী শনাক্তের সক্ষমতা তুলনামূলকভাবে সীমিত ছিল। তবে রোগীকে উচ্চঝুঁকিসম্পন্ন চিহ্নিত করার সিদ্ধান্তের সীমা বা ‘ডিসিশন থ্রেশহোল্ড’ ০ দশমিক ১৫-এ নামিয়ে আনলে, গুরুতর HFrEF শনাক্তের সংবেদনশীলতা বেড়ে ৯১ দশমিক ২ শতাংশে পৌঁছায়। অর্থাৎ, প্রকৃত গুরুতর রোগীদের বড় অংশকে মডেলটি শনাক্ত করতে সক্ষম হয়। একই সঙ্গে এর নেগেটিভ প্রেডিকটিভ ভ্যালু ছিল ৯৩ দশমিক ৫ শতাংশ, অর্থাৎ যাদের কম ঝুঁকিসম্পন্ন চিহ্নিত করা হয়েছে, তাদের অধিকাংশের ক্ষেত্রেই গুরুতর HFrEF না থাকার পূর্বাভাস সঠিক ছিল। তবে গবেষকেরা জানিয়েছেন, মডেলটি এখনো পরীক্ষামূলক পর্যায়ে রয়েছে এটি এবং ইকোকার্ডিওগ্রাফির বিকল্প নয়। বাস্তব চিকিৎসাব্যবস্থায় ব্যবহারের আগে আরও বড় পরিসরে এর নির্ভুলতা ও কার্যকারিতা যাচাই করা প্রয়োজন।