ইউরোপে ১৩ বছরের কম বয়সীদের সোশ্যাল মিডিয়ায় নিষেধাজ্ঞার প্রস্তাব

শিশুদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে বয়সসীমা নির্ধারণের প্রস্তাব করেছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)। ‘ইইউ কিডস অ্যাক্ট’ নামের এই প্রস্তাব কার্যকর হলে ১৩ বছরের কম বয়সী শিশুরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করতে পারবে না। ১৩ ও ১৪ বছর বয়সীদের ক্ষেত্রে অভিভাবকের তত্ত্বাবধান বাধ্যতামূলক হবে। আর ১৫ বছর বয়সে পৌঁছানোর পর তারা নিজেরাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অ্যাকাউন্ট খুলতে পারবে।

ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লেয়েন বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কারণে শিশুদের বিকাশমান মস্তিষ্ক ও ব্যক্তিত্বের ওপর ক্ষতির বিষয়ে যথেষ্ট প্রমাণ রয়েছে। তার ভাষ্য, বয়সসীমা নির্ধারণ করলেও প্ল্যাটফর্মগুলোর দায়িত্ব শেষ হবে না। শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্যের সুরক্ষায় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোকেও দায় নিতে হবে।

প্রস্তাব অনুযায়ী, ১৩ বছরের কম বয়সীরা সাধারণ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করতে পারবে না। তবে অভিভাবকের নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে শিশুদের জন্য বিশেষভাবে তৈরি ভিডিও শেয়ারিং সেবা ব্যবহার করতে পারবে তারা। এসব ‘মিনি অ্যাকাউন্টে’ দিনে সর্বোচ্চ এক ঘণ্টা পর্দা ব্যবহারের সীমা এবং শিশুরা কী দেখবে, তা নিয়ন্ত্রণের সুবিধা থাকতে হবে।

১৩ ও ১৪ বছর বয়সীদের জন্য অভিভাবকের মাধ্যমে সাব-অ্যাকাউন্ট খোলার সুযোগ থাকবে। এসব অ্যাকাউন্টে বয়স উপযোগী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ভিডিও শেয়ারিং প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করা যাবে। তবে সামাজিক যোগাযোগ সীমিত রাখা এবং দিনে এক ঘণ্টা পর্দা ব্যবহারের মতো সুরক্ষা ব্যবস্থা থাকতে হবে।

প্ল্যাটফর্মে আসছে নানা বিধিনিষেধ

ইইউ কিডস অ্যাক্ট কার্যকর হলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোকে শিশুদের আসক্ত করে তুলতে পারে এমন বিভিন্ন ফিচার সরাতে হবে। এর মধ্যে থাকবে এমন সুপারিশ অ্যালগরিদম, যা ব্যবহারকারীদের ক্ষতিকর কনটেন্টের ধারাবাহিকতায় আটকে রাখতে পারে।

এ ছাড়া অনন্ত স্ক্রল বা ইনফিনিট স্ক্রল, রাতে পুশ নোটিফিকেশন এবং অপরিচিত ব্যক্তির অনাকাঙ্ক্ষিত যোগাযোগ বন্ধ করতে হবে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক চ্যাটবটও ডিফল্টভাবে বন্ধ রাখতে হবে। এসব চ্যাটবটকে শিশুদের মধ্যে আবেগগত নির্ভরতা তৈরি করতে দেওয়া যাবে না।

বয়স যাচাইয়ে গুরুত্ব

প্রস্তাবের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ব্যবহারকারীর বয়স যাচাই। নতুন অ্যাকাউন্ট খোলার সময় প্ল্যাটফর্মগুলোকে বয়স যাচাই করতে হবে। বর্তমান ব্যবহারকারীদের বয়স অনুমানের জন্য ক্রেডিট কার্ডের তথ্যের মতো যৌক্তিক মাধ্যমও ব্যবহার করা যেতে পারে।

তবে বয়স যাচাইয়ের প্রযুক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রে পরিচয়পত্র বা বায়োমেট্রিক তথ্য সংরক্ষণ করা যাবে না। এ জন্য ইইউর নতুন বয়স যাচাই অ্যাপের মতো পরিচয় সুরক্ষিত রাখে এমন প্রযুক্তি ব্যবহারের কথা বলা হয়েছে।

প্ল্যাটফর্মগুলোকে আইন মেনে চলার পরিকল্পনা জমা দিতে হবে। আইন বাস্তবায়ন করা হবে ইইউর বিদ্যমান ডিজিটাল সার্ভিসেস অ্যাক্টের কাঠামোর মাধ্যমে। ওই আইনে কোনো প্রতিষ্ঠানের বৈশ্বিক বার্ষিক আয়ের সর্বোচ্চ ৬ শতাংশ পর্যন্ত জরিমানার বিধান রয়েছে। নতুন প্রস্তাবে ৯০ দিনের দ্রুত এনফোর্সমেন্ট বা আইন প্রয়োগের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।

তবে প্রস্তাবটি পাস হবে কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়। ফ্রান্সের সর্বোচ্চ আদালত এর আগে একই ধরনের একটি প্রস্তাব আটকে দিয়েছিল। আদালতের মতে, সেটি মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করতে পারে।

প্রায় ৪৫ কোটি মানুষের ইউরোপীয় ইউনিয়নে আইনটি কার্যকর হলে অন্য যেকোনো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বয়সসীমা আইনের তুলনায় বেশি ব্যবহারকারী এর আওতায় পড়বে। তবে বয়স যাচাইয়ের প্রযুক্তিগত জটিলতা এবং বিদ্যমান আইনের সঙ্গে নতুন আইনের পুনরাবৃত্তি নিয়ে ইতোমধ্যে সমালোচনা শুরু হয়েছে।