কথা বলবে বোবারাও, ইলন মাস্কের প্রতিষ্ঠানের নতুন উদ্ভাবন

বাকক্ষমতা হারিয়ে ফেলার পরও নিজের চিন্তাশক্তি থেকেই প্রযুক্তির কল্যাণে কৃত্রিম কণ্ঠে কথা বলতে সক্ষম হয়েছেন এএলএসে আক্রান্ত এক ব্যক্তি। ‘টেরি’ নামের ওই ব্যক্তি ২০২৪ সালে বালবার-অনসেট অ্যামিওট্রফিক ল্যাটেরাল স্ক্লেরোসিসে (এএলএস) আক্রান্ত হন। রোগটি তার কথা বলার ক্ষমতাকে গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করলেও মুখ ও শরীরের নড়াচড়া করার সক্ষমতা এখনও রয়েছে। ইলন মাস্কের মালিকানাধীন প্রযুক্তি-প্রতিষ্ঠান নিউরালিংকের পরীক্ষামূলক মস্তিষ্ক-কম্পিউটার ইন্টারফেস ব্যবহার করে তিনি নিজের মনের কথা কম্পিউটারনির্ভর কণ্ঠে প্রকাশ করতে পারছেন।

ধীরে ধীরে শরীরের পেশি নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা কমিয়ে দেয় অ্যামিওট্রফিক ল্যাটারাল স্ক্লেরোসিস বা এএলএস। মস্তিষ্ক ও মেরুদণ্ডের স্বেচ্ছাধীন নড়াচড়া নিয়ন্ত্রণকারী মোটর নিউরন ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে মারা যেতে থাকায় রোগীরা সময়ের সঙ্গে কথা বলা, গিলতে পারা, হাঁটা ও শ্বাস নেওয়ার মতো স্বাভাবিক কাজের সক্ষমতা হারাতে পারেন। বিশেষ করে ‘বালবার-অনসেট’ এএলএসের ক্ষেত্রে রোগের শুরুতেই ঠোঁট, জিহ্বা, চোয়াল, গলার পেশিসহ কথা বলা ও গিলতে ব্যবহৃত পেশিগুলোর নিয়ন্ত্রণে সমস্যা দেখা দিতে পারে। ফলে কথা ধীরে, অস্পষ্ট ও কষ্টসাধ্য হয়ে ওঠে এবং একপর্যায়ে কথা বলার ক্ষমতাও হারাতে পারেন রোগী।

টেরি নিউরালিংকের ‘ভয়েস’ ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের তৃতীয় অংশগ্রহণকারী। তার মস্তিষ্কের কথা বলার সঙ্গে সম্পর্কিত অংশ ‘স্পিচ মোটর রিজিয়নে’ প্রতিষ্ঠানটির প্রতিষ্ঠানটির ‘এন১’ নামের একটি ব্রেন-কম্পিউটার ইন্টারফেস (বিসিআই) ইমপ্লান্ট বসানো হয়েছে। ক্ষুদ্র ইলেকট্রোডযুক্ত এই ইমপ্লান্ট মস্তিষ্কের স্নায়ুকোষ থেকে উৎপন্ন বৈদ্যুতিক সংকেত শনাক্ত করে। এরপর সংশ্লিষ্ট সফটওয়্যার সেই সংকেত বিশ্লেষণ করে টেরি কোন শব্দ বা বাক্য বলতে চাইছেন তা শনাক্ত করে পাঠ্য ও শব্দে রূপান্তর করে। জেনারেটেড কণ্ঠটি তার এএলএসে আক্রান্ত হওয়ার আগের কণ্ঠের আদলে তৈরি করা হয়েছে।

প্রযুক্তিটি কার্যকর করতে প্রথমে টেরিকে কথা বলার সময় মুখ ও ঠোঁটের নড়াচড়া অনুকরণ করে প্রশিক্ষণ নিতে হয়েছে। পরবর্তী সময়ে তিনি মুখ না নড়িয়েই মনে মনে শব্দ বলার অনুশীলন করেন। এই প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তার মস্তিষ্কের সংকেতের সঙ্গে নির্দিষ্ট শব্দের সম্পর্ক শনাক্ত করতে সফটওয়্যারটিকে প্রস্তুত করা হয়। এরপর তিনি শুধু মনে মনে শব্দ বা বাক্যটি বলার চেষ্টা করলেই সিস্টেম তা শনাক্ত করে কৃত্রিম কণ্ঠে উচ্চারণ করতে পারে।

সম্প্রতি নিউরালিংকের প্রকাশ করা এক ভিডিওতে টেরিকে তার জীবনসঙ্গী লরির সঙ্গে কথা বলতে দেখা যায়। একপর্যায়ে তিনি চিন্তার মাধ্যমে বলেন, “আমি তোমাকে ভালোবাসি।” কৃত্রিম কণ্ঠে কথাটি শোনার পর তার স্ত্রী আবেগাপ্লুত হয়ে পড়ে তাকে জড়িয়ে ধরেন। বর্তমানে টেরি নিজে কথা বলতে না পারলেও মস্তিষ্কের ইমপ্লান্টের মাধ্যমে যোগাযোগ করতে পারছেন এবং ভয়েস ট্রায়ালের অংশ হিসেবে প্রযুক্তিটি আরও উন্নত করতে নিউরালিংককে সহায়তা করছেন। তবে এটি এখনও পরীক্ষামূলক প্রযুক্তি এবং যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসনের (এফডিএ) অনুমোদন পায়নি। এ ছাড়া প্রযুক্তিটি স্বাভাবিকভাবে কথা বলার ক্ষমতা ফিরিয়ে দেয়নি, বরং মস্তিষ্কে তৈরি হওয়া কথা বলার ইচ্ছার সংকেতকে কৃত্রিম কণ্ঠে রূপান্তর করছে।

এএলএসে আক্রান্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে এমন মস্তিষ্ক-কম্পিউটার ইন্টারফেস যোগাযোগের একটি বিকল্প পথ তৈরি করতে পারে। তবে অস্ত্রোপচারের ঝুঁকি, দীর্ঘমেয়াদে ইমপ্লান্টের কার্যকারিতা, সংকেত শনাক্তের নির্ভুলতা এবং মস্তিষ্ক থেকে সংগৃহীত তথ্যের নিরাপত্তাসহ বিভিন্ন বিষয় এখনও গবেষণার পর্যায়ে রয়েছে।