কিশোরদের ‘আসক্ত’ করার অভিযোগ, প্রথমবার বিচারের মুখোমুখি টিকটক

কিশোরদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর ক্ষতিকর প্রভাব ফেলার অভিযোগে টিকটকের বিরুদ্ধে করা মামলাগুলোর মধ্যে প্রথমবারের মতো একটি মামলা বিচারে যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের আলাবামা অঙ্গরাজ্যের একটি জুরি টিকটক ও এর চীনা মালিকানা প্রতিষ্ঠান বাইটড্যান্সের বিরুদ্ধে অঙ্গরাজ্যটির আনা অভিযোগ শুনবে।

সোমবার (২৮ সেপ্টেম্বর) আলাবামার মন্টগোমারি স্টেট কোর্টে বিচার শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। বিচার দুই থেকে তিন সপ্তাহ চলতে পারে। এতে টিকটকের অভ্যন্তরীণ কার্যক্রমের এমন কিছু তথ্য প্রকাশ্যে আসতে পারে, যেগুলো গোপন রাখার চেষ্টা করে আসছে প্রতিষ্ঠানটি।

আলাবামার অ্যাটর্নি জেনারেল স্টিভ মার্শাল গত বছর মামলাটি করেন। মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে, টিকটক ও বাইটড্যান্স কিশোরদের জন্য প্ল্যাটফর্মটিকে আসক্তিকরভাবে তৈরি করেছে এবং এর নিরাপত্তা সম্পর্কে ভোক্তাদের বিভ্রান্ত করেছে। মার্শাল রিপাবলিকান দলের সদস্য।

এ ধরনের অভিযোগে অন্তত আরও ২৭টি অঙ্গরাজ্য ও ওয়াশিংটন ডিসি টিকটকের বিরুদ্ধে মামলা করেছে।

টিকটক বলেছে, কিশোরদের নিরাপত্তাকে প্ল্যাটফর্ম তৈরির ক্ষেত্রে তারা অগ্রাধিকার দিয়েছে। ব্যবহারকারীদের তৈরি কনটেন্টের জন্য অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলোকে দায় থেকে সুরক্ষা দেওয়া যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল কমিউনিকেশনস ডেসেন্সি অ্যাক্টের ২৩০ নম্বর ধারা তাদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য বলেও যুক্তি দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।

আলাবামার মামলায় বলা হয়েছে, টিকটকের শেষ না হওয়া ভিডিও প্রবাহ এটিকে সবচেয়ে আসক্তিকর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিণত করেছে। প্ল্যাটফর্মটির অ্যালগরিদম তরুণ ব্যবহারকারীদের ক্রমেই আরও তীব্র সহিংসতা ও আত্মক্ষতির বিষয়বস্তুর দিকে নিয়ে যায় বলেও অভিযোগ করা হয়েছে। এর ফলে কিশোরদের মানসিক স্বাস্থ্য সংকট তৈরি হয়েছে এবং অঙ্গরাজ্যটিতে আত্মক্ষতির কারণে জরুরি বিভাগে যাওয়া বেড়েছে বলে দাবি করেছে আলাবামা।

টিকটকের বিরুদ্ধে আরও অভিযোগ করা হয়েছে, গুগল, অ্যাপল ও মাইক্রোসফটের অ্যাপ স্টোরে কিশোরদের জন্য অ্যাপটিকে নিরাপদ হিসেবে দেখাতে যৌন ও সহিংস কনটেন্টে তরুণদের প্রবেশাধিকার সীমিত করার বিষয়ে মিথ্যা দাবি করেছে প্রতিষ্ঠানটি। একই সঙ্গে চীনা সরকারের মার্কিন ব্যবহারকারীদের তথ্য পাওয়ার সুযোগ রয়েছে কি না, সে বিষয়েও ব্যবহারকারীদের বিভ্রান্ত করার অভিযোগ করা হয়েছে। মামলায় জরিমানা ও অন্যান্য প্রতিকার চাওয়া হয়েছে।

গোপন নথি প্রকাশের সম্ভাবনা

টিকটকের অভ্যন্তরীণ কার্যক্রম নিয়ে প্রমাণের বড় একটি অংশ এতদিন প্রকাশ্যে আসেনি। কারণ, বিচারের জন্য নির্বাচিত কয়েকটি মামলায় টিকটক সমঝোতা করেছে এবং আদালতের নথি গোপন বা ব্যাপকভাবে কালো কালি দিয়ে ঢেকে রাখার চেষ্টা করেছে।

অঙ্গরাজ্যগুলোর মামলার পাশাপাশি কিশোরদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব ফেলার অভিযোগে টিকটকের বিরুদ্ধে ব্যক্তি, স্কুল জেলা ও পৌরসভাগুলোর পক্ষ থেকে হাজার হাজার মামলা রয়েছে। এসব মামলায় মেটা প্ল্যাটফর্মস, স্ন্যাপ ও অ্যালফাবেটের ইউটিউবও আসামি।

বিচারের জন্য নির্বাচিত আগের সব মামলাই টিকটক সমঝোতার মাধ্যমে নিষ্পত্তি করেছে। এর মধ্যে পাঁচ তরুণ এবং কেন্টাকির একটি স্কুল জেলার করা মামলাও রয়েছে।

আলাবামার মামলায় বলা হয়েছে, টিকটক ব্যবহারকারীদের নিজেরাই বয়স জানানোর সুযোগ দেয়। তবে অ্যাকাউন্ট না খুলে ভিডিও দেখার মাধ্যমে বয়সসংক্রান্ত প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগও রয়েছে। ফলে অ্যাকাউন্ট না থাকলেও ব্যবহারকারীর ভিডিও দেখার অভ্যাসসংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ করতে পারে প্রতিষ্ঠানটি।

কার্যকর বয়সসীমা না থাকায় তরুণ ব্যবহারকারীদের জন্য কনটেন্ট বাছাই করা ‘কিডস মোড’ও পুরোপুরি অকার্যকর হয়ে পড়ে বলে মামলায় দাবি করা হয়েছে।

অঙ্গরাজ্যটির আরও অভিযোগ, টিকটক শিশুদের তথাকথিত ‘ফিল্টার বাবল’-এর মধ্যে আটকে রাখে। ব্যবহারকারীর আগ্রহের বিষয় নিয়ে ক্রমেই আরও তীব্র কনটেন্ট দেখানো হয়, যার মধ্যে সহিংসতা বা ক্ষতিকর বিষয়বস্তুও থাকতে পারে।

গত মাসে মেটা ৪৭টি অঙ্গরাজ্য, ওয়াশিংটন ডিসি ও যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অঞ্চলের সঙ্গে ১৭ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলারের একটি সমঝোতা করেছে। মেটা কোনো অন্যায় স্বীকার করেনি। সমঝোতার আওতায় কিশোরদের ইনস্টাগ্রাম ও ফেসবুক ব্যবহারে পরিবর্তন আনার কথা রয়েছে। এই সমঝোতার ৫ বিলিয়ন ডলার টিকটক, স্ন্যাপ ও ইউটিউব একই শর্ত গ্রহণ করলে তার সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে।

এই সমঝোতা নিয়ে টিকটক এখন পর্যন্ত প্রকাশ্যে কিছু বলেনি।

চলতি বছর টিকটকের যুক্তরাষ্ট্রের কার্যক্রম মার্কিন বিনিয়োগকারীদের নেতৃত্বাধীন একটি প্রতিষ্ঠানের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। এতে বাইটড্যান্সের মালিকানা রয়েছে ২০ শতাংশ।