চ্যাটজিপিটি কী, সেটা এখন সবার জানা। আপনি জানতে চাইবেন— কোন বিষয়ে কী গবেষণা হয়েছে, সঙ্গে সঙ্গে জবাব নিয়ে হাজির হয়ে যাবে আপনার সামনে। এমনকি কী বিষয়ে প্রতিবেদন করতে পারেন, তার আইডিয়াও চেয়ে দেখতে পারেন, পেয়ে যাবেন। কঠিন কঠিন বৈজ্ঞানিক বিষয়ে জানতে চাইতে পারবেন, মজার কোনও কবিতা লিখতে বলে দেখতে পারেন, এমনকি আপনার হয়ে গল্পের প্লটও সাজিয়ে দেবে। কেবল একটি নির্দেশনা দিয়ে আপনি পেতে পারেন, যা চাইছেন। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার এই আবিষ্কারে বড় অংশের মানুষ যেমন চাকরি হারাবে বলা হচ্ছে, তেমনই মানুষের বুদ্ধিমত্তা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি পড়বে বলে শঙ্কা জানাচ্ছেন অনেকে। এই কাজগুলো যে মানুষেরা বছরের পর বছর করে আসছেন, আসলেই কি তাদের চাকরি তাহলে হুমকির মুখে? এ নিয়ে কী বলছেন বিশেষজ্ঞরা।
সানফ্রান্সিসকো-ভিত্তিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তি নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান ওপেন এআই-এর ইন্টারনেটে সাড়া ফেলে দেওয়া চ্যাটবটটির নাম চ্যাটজিপিটি। এখানে জিপিটি-এর পূর্ণ রূপ জেনারেটিভ প্রি-ট্রেইনড ট্রান্সফরমার। উন্নত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তির চ্যাটবটটি কথোপকথনমূলক উপায়ে আপনার সঙ্গে যোগাযোগ করে আপনার প্রয়োজন মেটায়।
চমক আছে সন্দেহ নেই
এরইমধ্যে চ্যাটজিপিটি বিশ্বজুড়ে ব্যবহারকারীদের বিস্মিত করেছে। ঢাকায় বসে আপনি এমন একটি অ্যাপে আপনার শহরে ঘটে যাওয়া ঘটনার বিষয়ে জানতে চাইছেন, তার সবই সে একসঙ্গে করে হাজিরও করে দিচ্ছে। এই চমক রয়েছে।
গত বছরের নভেম্বরে চ্যাটজিপিটি সবার জন্য উম্মুক্ত করা হয়। এটাকে বলা হচ্ছে ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল, যা কথোপকথনের মাধ্যমে মানুষকে সাহায্য করতে পারে। যদি চ্যাটজিটিপি মুহূর্তের মধ্যে যেকোনও বিষয়ে অ্যাকাডেমিক ক্ষেত্রে উত্তীর্ণ হওয়ার মতো রচনা লিখে ফেলতে পারে, তবে এই অ্যাকাডেমিক রচনার ভবিষৎ কী? বর্তমান সময়ে পৃথিবীর বিখ্যাত বুদ্ধিজীবী ও দার্শনিক নোয়ামচমস্কি চ্যাটজিপিটির বিষয়ে বলেছেন, এটা মূলত ‘অত্যাধুনিক চৌর্যবৃত্তি’। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বা এআই আসলে হলো— পৃথিবীর ৯৯ শতাংশ মানুষের মেধা, চিন্তাশক্তি ও ব্রেইনকে অচল করার ব্যবস্থা। যদিও বিশেষজ্ঞরা বলছে, চ্যাটজিপিটির কাছে কিছু পেতে হলে মানুষকে সক্রিয় হতে হবে, যথাযথ প্রশ্ন করতে হবে মানুষকে।
প্রযুক্তি উদ্ভাবন করবে মানুষ, ব্যবহারও করবে মানুষ
ইতিহাস থেকে দেখা যায়, প্রযুক্তির প্রভাব নিয়ে শঙ্কা বরাবরই থাকে, কিন্তু তা বাস্তবায়ন হয় না। স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রপাতি কর্মসংস্থান কমিয়ে উৎপাদন বৃদ্ধি করেছে। কিন্তু অন্যের কর্মসংস্থান হয়েছে, মানুষকে বদলাতে হয়েছে। প্রযুক্তি অসাধারণ হওয়ার পরও চাকরি প্রতিস্থাপন হয়ে গেছে, এমন উদাহরণ হাতে গোনা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন কম্পিউটার ও ইন্টারনেটের কথা। এই প্রযুক্তি আসার আগে-পরে নানা কথা শোনা গেছে, মানুষকে আর লাগবে না, মানুষ বেকার হয়ে না খেতে পেয়ে মারা যাবে। কিন্তু আসলে তেমনটা হয়নি। মানুষকে কেবল কাজের ধরন বদলে ফেলতে হয়েছে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কারণে বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চায় আসলে কি অনেক প্রভাব পড়বে, নাকি এটা খুব সাময়িক। মানুষের এই চ্যাটজিপিটি টাইপ জিনিসের প্রতি মোহ দ্রুত কেটে যাবে কিনা— প্রশ্নে আইবিএম থমাস জে. ওয়াটসন রিসার্চ সেন্টারের স্টাফ রিসার্চ সায়েন্টিস্ট ওমর শিহাব বলেন, ‘মানুষ যখন কোনও বুদ্ধিবৃত্তিক কাজ করে তার মানে এই না যে, পুরো প্রজেক্টের শতভাগ খুবই সৃজনশীল। এর মধ্যে কিছু কাজ থাকে আসলে একটু বোরিং, যেমন- তথ্য সংগ্রহ করা, প্রবন্ধ বা বক্তব্যের কাঠামো দাঁড় করানো ইত্যাদি। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার টুল যেমন- চ্যাটজিপিটি এসব ভালোই পারে। কিন্তু মূল কাজ যেমন- একটি মৌলিক বক্তব্য বা ন্যারেটিভ এগুলো, সে ভালো পারে না। কাজেই এটি আপনার অ্যাসিসট্যান্ট হিসেবে কাজ করবে। কিন্তু এটি আপনাকে প্রতিস্থাপন করে দেবে না। এটি হয়তো আপনার ১০ শতাংশ সময় বাঁচাবে, যে সময় আপনি আরও সৃজনশীল কাজে ব্যবহার করতে পারবেন। ফলে চাকরি হারানোর মতো বিষয়গুলো খুব ভেবে বলা হচ্ছে বলে আমার মনে হয় না।’
প্রশ্ন না বুঝাতে পারলে ভুল উত্তরের ফাঁদে পড়তে হবে
চ্যাটজিপিটি কখনও কখনও দেখতে যুক্তিসঙ্গত হলেও এরইমধ্যে এমন অনেক অভিযোগ পাওয়া গেছে যে, এটি ভুল বা অর্থহীন উত্তরও লিখে থাকে। কোনও প্রশ্ন সঠিকভাবে উপস্থাপন না করতে পারলে এটি ভুল তথ্য, অপতথ্য এমনকি গুজবও আপনার সামনে হাজির করতে পারে। যা উদ্বেগের বিষয়। গবেষণা বলছে, এরইমধ্যে বটটিকে শিক্ষা ক্ষেত্রে অপব্যবহারেরও নজির পাওয়া গেছে। এই কারণেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করা হয়েছে কিনা, সেটা চিহ্নিত করার জন্যও অ্যাপ বানানোর কাজ করতে হচ্ছে। যারা ব্যবহার করছেন, তারা একদিকে খুব স্বস্তির কতা জানালেও তথ্য কতটুকু চুরি হচ্ছে, ডিজিটাল জগতে নিজেকে কতটা উন্মুক্ত করে ফেলছেন, সেই শঙ্কাও জানাচ্ছেন। চ্যাটজিপিটির বহুমাত্রিক ব্যবহারের ফলে আপনার তথ্য হুমকির মুখে পড়ে যাচ্ছে কিনা— প্রশ্নে সাইবার সিকিউরিটি বিশেষজ্ঞ তানভীর জোহা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘চ্যাটজিপিটির যে মেথডোলজি, সেখানে ইন্টারনেটে অ্যাভেইলেবল তথ্যের সমন্বয়ে সে উত্তর করবে। এখানে তথ্য ফাঁসের ঝুঁকি এখনও নেই। তবে মানুষের সৃজনশীলতা কমার ঝুঁকি আছে। আমি লক্ষ্য করেছি, এরইমধ্যে অনেকে চ্যাটজিপিটি ব্যবহার করে প্রেজেন্টেশন বানায়। তার মানে, এই জিনিস মানুষের চিন্তাশক্তিটা কমিয়ে দিচ্ছে। দিন শেষে মানুষের সৃজনশীলতার বিষয়টি কিন্তু ভিন্ন জিনিস। রোবট দিয়ে সেটার সমাধান সম্ভব না। ফলে এটার এক্সপ্যানশন কিন্তু অনেক সাবধান করছে পশ্চিমারা। চাইলে সিদ্ধান্ত নেওয়ার কাজ তাকে দিয়ে করানো যায়, কিন্তু খেয়াল করে দেখবেন— সেটা করাচ্ছে না।’
তিনি আরও বলেন, ‘চ্যাটজিপিটির মাধ্যমে পাসওয়ার্ড প্রটেকটিভ জিনিস থেকে তথ্য নেওয়ার বিষয়টি যেনো ভবিষ্যতে না হয়, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।’