ইয়ারফোনের নয়েজ ক্যান্সেলিং মোড কী কানের জন্য ক্ষতিকর

কর্মস্থলে যাওয়ার পথে যাত্রীঠাসা গণপরিবহনে, ব্যস্ত ফুটপাতে হাঁটতে হাঁটতে কিংবা দূরপাল্লার ভ্রমণের সময় শহরের কোলাহল থেকে মুক্তি পেতে অনেকেই অ্যাকটিভ নয়েজ ক্যান্সেলিং (এএনসি) সুবিধাযুক্ত ইয়ারফোন বা হেডফোন ব্যবহার করেন। এই প্রযুক্তি বাইরের শব্দ কমিয়ে প্রিয় গান বা অডিও স্বচ্ছভাবে উপভোগ করার সুযোগ করে দেয়। তবে সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাজ্যের একাধিক অডিওলজিস্ট এ প্রযুক্তির দীর্ঘমেয়াদি ব্যবহার নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।

তাদের আশঙ্কা, দীর্ঘ সময় কৃত্রিমভাবে বাইরের শব্দ থেকে বিচ্ছিন্ন থাকার অভ্যাস কিছু মানুষের ক্ষেত্রে মস্তিষ্কের স্বাভাবিক শব্দ বিশ্লেষণ ক্ষমতা বা ‘লিসেনিং স্কিল’-এর ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে। বিষয়টি ইতোমধ্যে চিকিৎসক ও গবেষকদের মধ্যে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।

কীভাবে কাজ করে এএনসি প্রযুক্তি

অ্যাকটিভ নয়েজ ক্যান্সেলেশন (এএনসি) প্রযুক্তি মূলত ইয়ারফোন বা হেডফোনে থাকা এক বা একাধিক ক্ষুদ্র মাইক্রোফোনের মাধ্যমে বাইরের শব্দ শনাক্ত করে। এরপর একটি ডিজিটাল সিগন্যাল প্রসেসর (ডিএসপি) সেই শব্দের বিপরীত পর্যায়ের ইনভার্স ফেইজের অ্যান্টি-নয়েজ সিগন্যাল তৈরি করে। দুটি তরঙ্গ ডেসট্রাকটিভ ইন্টারফিয়ারেন্স প্রক্রিয়ার মাধ্যমে একে অপরকে বাতিল বা নালিফাই করে দেয়। ফলে চারপাশের নিম্ন-ফ্রিকোয়েন্সির শব্দ নয়েজ ক্যান্সেলিংয়ের সক্ষমতা অনুযায়ী উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়।

বর্তমান বাজারের অধিকাংশ অ্যাকটিভ নয়েজ ক্যান্সেলিং হেডফোন ও ইয়ারফোন বাইরের শব্দের ধরন ও ফ্রিকোয়েন্সির ওপর নির্ভর করে সাধারণত ২০ থেকে ৬০ ডেসিবেল (dB) পর্যন্ত শব্দ কমাতে সক্ষম। এর ফলে অডিও স্পষ্টভাবে শোনার জন্য ভলিউম বাড়ানোর প্রয়োজনও অনেক কমে যায়।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডাব্লিউএইচও) মতে, দীর্ঘ সময় উচ্চমাত্রার শব্দের মধ্যে থাকা স্থায়ী শ্রবণক্ষতির অন্যতম প্রধান কারণ হতে পারে। সে বিবেচনায় নয়েজ ক্যান্সেলিং প্রযুক্তি অনেক ক্ষেত্রেই ব্যবহারকারীকে অতিরিক্ত শব্দচাপ থেকে সুরক্ষা দিতে সহায়তা করে।

কেন উদ্বিগ্ন বিশেষজ্ঞরা

লন্ডনের ইম্পেরিয়াল কলেজ হেলথকেয়ার এনএইচএস ট্রাস্টের অডিওলজি বিভাগের ক্লিনিক্যাল লিড রেনি আলমেইদা জানান, সাম্প্রতিক সময়ে এমন তরুণ রোগীর সংখ্যা বেড়েছে, যাদের শ্রবণ পরীক্ষার ফলাফল স্বাভাবিক হলেও কোলাহলপূর্ণ পরিবেশে কথোপকথন বুঝতে সমস্যা হচ্ছে।

তার মতে, তরুণদের মধ্যে এএনসি-যুক্ত ইয়ারফোনের অতিরিক্ত ব্যবহার এ সমস্যার সম্ভাব্য একটি কারণ হতে পারে। বিশেষজ্ঞদের ধারণা, এটি অডিটরি প্রসেসিং ডিসঅর্ডার (এপিডি)-সদৃশ একটি সমস্যা হতে পারে, যেখানে কানে নয়, বরং মস্তিষ্কের শব্দ বিশ্লেষণ প্রক্রিয়ায় বিঘ্ন ঘটে। তবে এএনসি হেডফোনের সঙ্গে এ সমস্যার সরাসরি সম্পর্ক এখনও বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত হয়নি।

গবেষণা কী বলছে

এ বিষয়ে চিকিৎসকদের মধ্যেও মতভেদ রয়েছে। কানাডার ম্যাকগিল ইউনিভার্সিটির অফিস ফর সায়েন্স অ্যান্ড সোসাইটির মতে, বর্তমানে এ বিষয়ে প্রকাশিত অধিকাংশ তথ্যই চিকিৎসকদের ব্যক্তিগত ক্লিনিক্যাল পর্যবেক্ষণের ওপর ভিত্তি করে। অ্যাকটিভ নয়েজ ক্যান্সেলিং প্রযুক্তির দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়ে বৃহৎ পরিসরের বৈজ্ঞানিক গবেষণা এখনও সীমিত।

অন্যদিকে, বিভিন্ন শ্রবণস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের মতে, এএনসি প্রযুক্তির সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো এটি ব্যবহারকারীদের কম ভলিউমে অডিও শুনতে উৎসাহিত করে। কারণ দীর্ঘ সময় ৮৫ ডেসিবেলের বেশি শব্দের সংস্পর্শে থাকা স্থায়ী শ্রবণক্ষতির অন্যতম প্রধান কারণ।

তাই নয়েজ ক্যান্সেলিং প্রযুক্তি শ্রবণশক্তির জন্য উপকারী, নাকি দীর্ঘমেয়াদে কানের জন্য ক্ষতিকর—এই প্রশ্নের চূড়ান্ত উত্তর পেতে আরও বিস্তৃত গবেষণার প্রয়োজন।

কী পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা

বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী, টানা ঘণ্টার পর ঘণ্টা নয়েজ ক্যান্সেলিং মোড ব্যবহার না করে মাঝেমধ্যে বিরতি নেওয়া উচিত। পাশাপাশি ইয়ারফোন ব্যবহারের সময় ভলিউম নিরাপদ মাত্রায়—সাধারণত সর্বোচ্চ ভলিউমের ৭০ শতাংশের নিচে—রাখলে শ্রবণশক্তির ক্ষতির ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব।