মানব কোষ থেকে কৃত্রিম মস্তিষ্ক তৈরি করলো ইরান

কৃত্রিম হৃদযন্ত্র থেকে বায়োনিক অঙ্গ—আধুনিক চিকিৎসা প্রযুক্তি ইতোমধ্যেই মানবদেহের অনেক গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গের কৃত্রিম বিকল্প তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে। তবে মানবদেহের সবচেয়ে জটিল অঙ্গ মস্তিষ্কের কৃত্রিম প্রতিরূপ তৈরি এতদিন ছিল প্রায় কল্পনার বিষয়। সেই ধারণায় নতুন মাত্রা যোগ করেছেন ইরানের একদল গবেষক। তারা দাবি করেছেন, গবেষণাগারে মানুষের স্নায়ুকোষ (নিউরন) ব্যবহার করে প্রথমবারের মতো একটি কৃত্রিম মস্তিষ্ক বা ‘ব্রেন অর্গানয়েড’ তৈরি করেছেন।

যদিও এটি সম্পূর্ণ কার্যকর বা মানুষের মস্তিষ্কের বিকল্প হিসেবে প্রতিস্থাপনযোগ্য নয়, তবু ‘অর্গানয়েড ইন্টেলিজেন্স’ প্রযুক্তিভিত্তিক এই ত্রিমাত্রিক জৈব মডেল মানব মস্তিষ্কের গঠন ও স্নায়বিক কার্যকলাপ বাস্তবসম্মতভাবে অনুকরণ করতে সক্ষম বলে গবেষকদের দাবি। এর মাধ্যমে ভবিষ্যতে স্নায়ুবিজ্ঞান, ওষুধ উদ্ভাবন এবং বিভিন্ন মস্তিষ্কজনিত রোগের গবেষণায় নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হতে পারে।

ইরানের রয়ান রিসার্চ ইনস্টিটিউটের একদল গবেষকের এই উদ্ভাবনকে অর্গানয়েড ইন্টেলিজেন্স (ওআই) প্রযুক্তির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে। গবেষকদের দাবি, মানুষের স্নায়ুকোষ ব্যবহার করে তৈরি এই ব্রেন অর্গানয়েড ভবিষ্যতের জৈবভিত্তিক কম্পিউটিং গবেষণায় খুলে দিতে পারে নতুন সম্ভাবনার দ্বার।

তবে 'ব্রেন অর্গানয়েড' নাম শুনে এটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক (এআই) কোনও কৃত্রিম বা প্রতিস্থাপনযোগ্য মানব মস্তিষ্ক বলে মনে হলেও বাস্তবে বিষয়টি তা নয়। এটি মানুষের মস্তিষ্কের গঠন ও কার্যপ্রণালি অনুকরণে তৈরি একটি ত্রিমাত্রিক জৈব মডেল। এতে ব্যবহৃত জীবন্ত স্নায়ুকোষগুলো স্বাভাবিক মস্তিষ্কের মতো পরস্পরের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করে নিউরাল নেটওয়ার্ক গড়ে তোলে। এই নেটওয়ার্কের মাধ্যমে অর্গানয়েডটি সীমিত পরিসরে তথ্য গ্রহণ, সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াকরণ ও বিশ্লেষণ করতে পারে।

এই ধারণার ওপর ভিত্তি করেই বিকশিত হচ্ছে অর্গানয়েড ইন্টেলিজেন্স (ওআই)। এ ক্ষেত্রের গবেষণায় জীবন্ত নিউরনের স্বাভাবিক শেখার ক্ষমতা ও তথ্য প্রক্রিয়াকরণের বৈশিষ্ট্যকে জৈব কম্পিউটিংয়ের ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করার সম্ভাবনা অনুসন্ধান করা হচ্ছে।

প্রচলিত কম্পিউটার যেখানে সিলিকনভিত্তিক ট্রানজিস্টরের মাধ্যমে তথ্য প্রক্রিয়া বিশ্লেষণ করে, সেখানে ওআই প্রযুক্তি জীবন্ত নিউরনের বৈদ্যুতিক সংকেত আদান-প্রদান, সিন্যাপটিক সংযোগ এবং অভিযোজনক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে সম্পূর্ণ নতুন ধরনের জৈব কম্পিউটিং প্ল্যাটফর্ম তৈরির লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছে।

গবেষকদের আশা, এই প্রযুক্তি সফল হলে ভবিষ্যতে অত্যন্ত কম শক্তি ব্যবহার করে আরও দক্ষ, অভিযোজনক্ষম এবং জটিল সমস্যা সমাধানে সক্ষম নতুন প্রজন্মের জৈব কম্পিউটিং ব্যবস্থা তৈরি করা সম্ভব হবে। পাশাপাশি স্নায়ুবিজ্ঞান, ওষুধ উদ্ভাবন এবং আলঝেইমার রোগ, পারকিনসন রোগসহ বিভিন্ন স্নায়বিক রোগের গবেষণায়ও এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

প্রকল্পসংশ্লিষ্ট গবেষক মোহাম্মদ পোউর-আব্বাসি জানিয়েছেন, এই প্রযুক্তিই ভবিষ্যতে মানুষের মস্তিষ্কের কোষ দিয়ে তৈরি জীবন্ত কম্পিউটার প্রসেসর বা ব্রেইন-সেল বেইসড প্রসেসর উন্নয়নের ভিত্তি হতে পারে। তার মতে, প্রচলিত সিলিকনভিত্তিক প্রসেসরের তুলনায় এ ধরনের জৈব প্রসেসর তথ্য প্রক্রিয়াকরণের গতি উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ানোর পাশাপাশি শক্তি খরচ প্রায় ১০ লাখ গুণ পর্যন্ত কমিয়ে আনতে সক্ষম হতে পারে। তার মতে, উচ্চ কম্পিউটিং ক্ষমতা ও

অত্যন্ত কম শক্তি ব্যবহারের এই সম্ভাবনার কারণেই কোষভিত্তিক প্রসেসর প্রযুক্তি বিশ্বজুড়ে গবেষকদের আগ্রহের কেন্দ্রে চলে এসেছে।

বর্তমানে প্রযুক্তিটি গবেষণাভিত্তিক ও প্রাথমিক প্রোটোটাইপ পর্যায়ে থাকলেও, ইতোমধ্যেই এটি নতুন সম্ভাবনার উন্মোচনের মাধ্যমে বিশ্বমঞ্চে সাড়া ফেলেছে। প্রচলিত সিলিকনভিত্তিক কম্পিউটিং এর পাশাপাশি ব্রেইন অর্গানয়েডকে উন্নতর বিকল্প হিসেবে ব্যবহারের সম্ভাবনা বাস্তবে কতটা কার্যকর হবে, তা পরবর্তী পরীক্ষামূলক পর্যায়ে জানা যাবে।

গবেষকদের বিশ্বাস, ব্রেন অর্গানয়েডের ধারাবাহিক উন্নয়ন ভবিষ্যতে কম শক্তি খরচে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন কম্পিউটিং প্রযুক্তি এবং নতুন প্রজন্মের বায়োপ্রসেসর তৈরির ক্ষমতা রাখে।