বিশ্বের সবচেয়ে মূল্যবান কোম্পানির লড়াইয়ে নতুন এক মাইলফলক ছুঁয়েছে প্রযুক্তি জায়ান্ট অ্যাপল। প্রথমবারের মতো লেনদেন চলাকালে ৫ ট্রিলিয়ন ডলারের বাজারমূল্য স্পর্শ করেছে প্রতিষ্ঠানটি। যদিও দিন শেষে বাজারমূল্য সামান্য কমে ৪ দশমিক ৯৮ ট্রিলিয়ন ডলারে নেমে আসে, তবুও বিশ্বের দ্বিতীয় কোম্পানি হিসেবে ৫ ট্রিলিয়ন ডলারের বাজারমূল্যের সীমা স্পর্শ করার রেকর্ড গড়েছে অ্যাপল।
যুক্তরাষ্ট্রের স্থানীয় সময় মঙ্গলবার (২৯ জুলাই) লেনদেনের একপর্যায়ে অ্যাপলের বাজারমূল্য ৫ দশমিক ৩৬ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছে যায়। ওই সময় কোম্পানিটির শেয়ারদর বেড়ে দাঁড়ায় ৩৪২ ডলার ৮৯ সেন্টে। পরে কিছুটা কমে দিন শেষে শেয়ারদর ৩৩৯ ডলার ৩৩ সেন্টে বন্ধ হয়। তাতেই বাজারমূল্য দাঁড়ায় প্রায় ৪ দশমিক ৯৮ ট্রিলিয়ন ডলার।
এনভিডিয়ার পর এবার অ্যাপল
বিশ্বে ৫ ট্রিলিয়ন ডলারের বাজারমূল্যের মাইলফলক প্রথম অতিক্রম করেছিল চিপ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান এনভিডিয়া। গত অক্টোবরে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) খাতে বিপুল বিনিয়োগের জোয়ারে কোম্পানিটির শেয়ারদর দ্রুত বাড়তে থাকে এবং বিশ্বের প্রথম ৫ ট্রিলিয়ন ডলারের কোম্পানিতে পরিণত হয়। তবে চলতি মাসের শুরুতেই অ্যাপল বিশ্বের সবচেয়ে মূল্যবান কোম্পানির অবস্থান পুনরুদ্ধার করে।
২০২৫ সালের জুন থেকে এ তালিকার শীর্ষে ছিল এনভিডিয়া। মঙ্গলবারের লেনদেন শেষে এনভিডিয়ার বাজারমূল্য ছিল ৪ দশমিক ৭৮ ট্রিলিয়ন ডলার। ওই দিন প্রতিষ্ঠানটির শেয়ারদর বেড়েছিল দশমিক ৫৩ শতাংশ, যা দাঁড়ায় ১৯৭ ডলার ৬৩ সেন্টে।
কীভাবে এলো ‘ম্যাজিক ফিগার’
বিশ্লেষকদের মতে, অ্যাপলের বাজারমূল্য বৃদ্ধির পেছনে একাধিক কারণ একসঙ্গে কাজ করেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় কারণ প্রতিষ্ঠানটির পণ্যের শক্তিশালী চাহিদা। পাশাপাশি প্রযুক্তি খাতের অন্যান্য বড় প্রতিষ্ঠানের মতো এআই অবকাঠামো নির্মাণে বিপুল অর্থ ব্যয় না করার কৌশলও বিনিয়োগকারীদের ইতিবাচক বার্তা দিয়েছে।
বর্তমানে প্রযুক্তি খাতের বড় প্রতিষ্ঠানগুলো ডেটা সেন্টার নির্মাণসহ এআই অবকাঠামো গড়ে তুলতে ব্যাপক বিনিয়োগ করছে। এতে ব্যয় যেমন বাড়ছে, তেমনি ঋণের চাপও বাড়ছে। অ্যাপল তুলনামূলকভাবে ভিন্ন পথ বেছে নিয়েছে। নিজস্ব বড় অবকাঠামো নির্মাণের পরিবর্তে প্রতিষ্ঠানটি গুগলের এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে নতুন সেবা চালু করছে। নতুন সংস্করণের সিরি সেই কৌশলের অন্যতম উদাহরণ। ফলে প্রতিষ্ঠানটিকে বড় অঙ্কের অবকাঠামো ব্যয় বহন করতে হচ্ছে না।
বিআরআই ওয়েলথ ম্যানেজমেন্টের বিনিয়োগ বিভাগের প্রধান টনি মেডোজ বলেন, একসময় অ্যাপলকে এআই দৌড়ে পিছিয়ে থাকা প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখা হতো, কারণ প্রতিষ্ঠানটি নিজস্ব এআই মডেল তৈরিতে তুলনামূলক কম বিনিয়োগ করেছিল। তবে সাম্প্রতিক সময়ে সেই ধারণা বদলাতে শুরু করেছে। শেয়ারদরের উল্লম্ফন চলতি বছর এখন পর্যন্ত অ্যাপলের শেয়ারদর প্রায় ২৫ শতাংশ বেড়েছে। এ সময়ে এনভিডিয়া, মেটা, অ্যালফাবেট ও মাইক্রোসফটসহ তথাকথিত ‘ম্যাগনিফিসেন্ট সেভেন’ প্রযুক্তি কোম্পানির বেশির ভাগকেই ছাড়িয়ে গেছে প্রতিষ্ঠানটি।
শুধু শেয়ারবাজারেই নয়, বিক্রির ক্ষেত্রেও ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে কোম্পানিটির কৌশলে। গত মাসে নতুন ম্যাকবুক ও আইপ্যাডের দাম বাড়ালেও আইফোনের দাম অপরিবর্তিত রাখে অ্যাপল।
বিশ্লেষকদের মতে, বছরের শেষ দিকে আইফোনের দাম বাড়তে পারে—এমন প্রত্যাশায় অনেক ক্রেতা আগেভাগেই নতুন আইফোন কিনে নিয়েছেন। ফলে স্মার্টফোন বিভাগের বিক্রি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
নতুন লিজিং কর্মসূচিও ইতিবাচক বার্তা
মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্রে নতুন একটি 'ডিভাইস লিজিং' কর্মসূচিও চালু করেছে অ্যাপল। অর্থ পরিশোধ সেবা প্রতিষ্ঠান ক্লারনার সহযোগিতায় চালু হওয়া এ কর্মসূচির মাধ্যমে মাসিক কিস্তিতে অ্যাপলের বিভিন্ন ডিভাইস ব্যবহার করা যাবে। এ কর্মসূচির আওতায় মাসে ১৭ ডলার ৯৯ সেন্ট থেকে আইফোন, ১১ ডলার ৯৯ সেন্ট থেকে অ্যাপল ওয়াচ বা আইপ্যাড এবং ২৪ ডলার ৯৯ সেন্ট থেকে ম্যাক ব্যবহার করার সুযোগ রাখা হয়েছে।
বাজার বিশ্লেষণ প্রতিষ্ঠান ফরেস্টারের ভাইস প্রেসিডেন্ট ও প্রধান বিশ্লেষক দীপাঞ্জন চ্যাটার্জি বলেন, এআই খাতে ব্যয়ের প্রতিযোগিতায় না গিয়ে অ্যাপল গ্রাহকের ব্যবহার-অভিজ্ঞতাকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।
তার মতে, নতুন লিজিং কর্মসূচি এমন একটি কৌশল, যেখানে আইফোনের দাম না কমিয়েও এককালীন বড় অর্থ পরিশোধের পরিবর্তে মাসিক কিস্তির মাধ্যমে ডিভাইস কেনাকে আরও সহজ ও গ্রহণযোগ্য করা হয়েছে।
সামনে আরও প্রবৃদ্ধির প্রত্যাশা
বিশ্লেষকদের ধারণা, এক বছর আগের একই সময়ের তুলনায় চলতি বছরের তৃতীয় প্রান্তিকে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) অ্যাপলের আয় ১৫ শতাংশের বেশি বাড়তে পারে। শক্তিশালী বিক্রি, স্থিতিশীল মূল্যনীতি এবং ব্যয় নিয়ন্ত্রণের কৌশল এ প্রবৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে তাদের প্রত্যাশা। একসময় এআই প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে থাকার সমালোচনার মুখে থাকা অ্যাপলের জন্য এ অর্জন গুরুত্বপূর্ণ বলেও মনে করছেন বিশ্লেষকরা। বিশেষ করে প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) টিম কুকের নেতৃত্বের শেষ পর্যায়ে এমন সাফল্য কোম্পানিটির ভাবমূর্তিকে আরও শক্তিশালী করতে পারে বলে তাদের ধারণা।
তবু এনভিডিয়া কেন আলোচনায়
অ্যাপল নতুন রেকর্ড গড়লেও এনভিডিয়াকে ঘিরে বাজারের আস্থা এখনও অটুট। কারণ এআই অবকাঠামো নির্মাণে ব্যবহৃত গ্রাফিকস প্রসেসর (জিপিইউ)। বাজারে এখনও সবচেয়ে শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
সেগাল মার্কো অ্যাডভাইজরসের আলফা রিসার্চ বিভাগের ভাইস প্রেসিডেন্ট বেঞ্জামিন হলের মতে, অ্যাপল ও এনভিডিয়ার বর্তমান অবস্থানের মধ্যে মৌলিক কোনও বড় পার্থক্য নেই। ভবিষ্যতে এআই খাত যেদিকেই এগোক না কেন, এনভিডিয়া সেখানে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবেই থাকবে।
২০২২ সালে চ্যাটজিপিটি উন্মুক্ত হওয়ার পর বিশ্বজুড়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়। বর্তমানে ওপেনএআইয়ের চ্যাটজিপিটি, গুগলের জেমিনি, অ্যানথ্রোপিকের ক্লড এবং মেটার লামাসহ প্রায় সব বড় এআই মডেলই এনভিডিয়ার জিপিইউ ও সিইউডিএ প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে তৈরি হচ্ছে। ফলে এআই খাতের বিস্তার যত বাড়ছে, এনভিডিয়ার গুরুত্বও ততই বাড়ছে।
তবে আপাতত বাজারমূল্যের দৌড়ে নতুন ইতিহাস লিখেছে অ্যাপল, বিশ্বের দ্বিতীয় কোম্পানি হিসেবে স্পর্শ করেছে ৫ ট্রিলিয়ন ডলারের সেই বহুল আলোচিত ‘ম্যাজিক ফিগার’।