‘ব্যান্ডউইথের দাম কমলে ইন্টারনেটের গতি বাড়ে, দাম কমে না’

ব্যান্ডউইথের দাম কমলে ইন্টারনেটের দাম কমার আওয়াজ ওঠে কিন্তু গ্রাহক পর্যায়ে ইন্টারনেটের দাম কমে না। বরং ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলো গ্রাহকের ইন্টারনেটের গতি বাড়িয়ে দেয়। তারা দাম কমাতে পারে না। তবে আইআইজি (ইন্টারন্যাশনাল ইন্টারনেট গেটওয়ে) অপারেটরগুলো আইএসপিদের জন্য ব্যান্ডউইথের দাম কমিয়ে দিতে পারে- বললেন, আইআইজি প্রতিষ্ঠান লেভেল থ্রি ক্যারিয়ার লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আহমেদ জুনায়েদ। তিনি দেশের ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান আইএসপিএবির সহ-সভাপতি ও আইআইজি ফোরামের সাধারণ সম্পাদকও। আহমেদ জুনায়েদ কোয়ালিটি ব্যান্ডউইথ, কত প্যাকেজের ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট নিলে ভালো সেবা পাওয়া যায় সেসব বিষয় একান্ত আলাপচারিতায় বাংলা ট্রিবিউনের পাঠকদের কাছে তুলে ধরেন।

আহমেদ জুনায়েদ দেশে করোনাকালে ইন্টারনেট ব্যবহারের ঊর্ধগতি, কেন ইন্টারনেটের দাম আরও কমছে না, কোন ধরনের কনটেন্টের প্রতি মানুষের আগ্রহ বাড়ছে এসব নিয়েও কথা বলেন। তবে তিনিও উদ্বিগ্ন শিশুদের ইন্টারনেট ও ডিজিটাল ডিভাইসের ব্যবহার নিয়ে। তিনি মনে করেন, শিশু সন্তানদের জন্য প্যারেন্টাল কন্ট্রোলই পারে ইন্টারনেট দুনিয়ায় তাদের নিরাপদ রাখতে। এ বিষয়ে তিনি বাবা মায়েদের প্রযুক্তিগত জ্ঞানে ঋদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান। প্রযুক্তিজ্ঞানে সন্তানের চেয়ে এগিয়ে না থাকলে তাদের নিয়ন্ত্রণ, মনিটর করা যাবে না বলে জানান তিনি। তিনি বলেন, ইন্টারনেটে নিরাপদ থাকা এবং ইন্টারনেট নিরাপদ রাখা সবার সম্মিলিত দায়িত্ব। কেউ একা এক কাজটি করতে পারবে না। সেবাদাতা ও গ্রহীতা দু’জনকেই এই গুরু দায়িত্বে এগিয়ে আসতে হবে।

বাংলা ট্রিবিউন: ব্যান্ডউইথের দাম কমলে ইন্টারনেটের দাম কমানো হয়েছে বলে প্রচার করা হয়। ব্যান্ডউইথের দাম কমানোর সঙ্গে ইন্টারনেটের দাম কমার সম্পর্ক কতটুকু? আপনার অভিজ্ঞতাটা যদি শেয়ার করতেন।

আহমেদ জুনায়েদ: ব্যান্ডউইথের দাম কমলে গেটওয়ে অপারেটরগুলো প্রতি বছরই দাম কমিয়েছে আইএসপি অপারেটরদের জন্য। আইএসপি (ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডার) অপারেটরগুলো প্রান্তিক পর্যায়ের গ্রাহকদের ব্যান্ডউইথ বাড়িয়ে দিচ্ছে সেই আগের দামেই।  আইএসপিগুলো দাম কমাতে পারছে না। প্রথমত, একটি আইএসপি তার গ্রাহকদের একটি নির্ধারিত দামের নিচে সেবা দিতে পারে না। এখানে পরিচলন ব্যয় ও ব্যান্ডউইথ পরিবহন খরচ রয়েছে। এরপরেও বলতে হবে ২০১২ সালে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের সর্বনিম্ন মাসিক বিল ছিল ১২০০-১৫০০ টাকা।  এখন সেটা ৫০০ টাকায় চলে এসেছে।  ৩০০ টাকায়ও অনেকে সেবা দিচ্ছে কিন্তু সেটা মানসম্মত নয়।  ব্যবহারকারীদের ভালোমানের ইন্টারনেট সেবা পাওয়ার জন্য মাসে ১৫০০-২০০০ টাকার সেবা নেওয়া উচিত। আমাদের আইএসপিরা ১০০০-১২০০ টাকার মধ্যেও ভালো সেবা দিচ্ছে কিন্তু আরও ভালোমানের সেবা পাওয়ার জন্য আরও কিছু বেশি খরচ করা উচিত। ব্যান্ডউইথের দাম কমলে আমাদের গ্রাহকদের কোনোভাবেই মনে করা উচিত না তারা নামমাত্র মূল্যে ভালোমানের ইন্টারনেট সেবা পাবেন। বরং তারা একই দামে আগের চেয়ে বেশি গতির ইন্টারনেট ও অন্যান্য সেবা পাবেন। দ্বিতীয়ত, আগের তুলনায় ইন্টারনেট ব্যবহারের চাহিদাও বেড়েছে বহুগুণ। মানসম্মত ইন্টারনেট সেবা পেতে হলে এখন অল্প ব্যান্ডউইথে সেবা নিশ্চিত করাও সম্ভব নয়। সেক্ষত্রে ব্যবহারের নূন্যনতম মান বজায় রাখতে হলেও এখন গ্রাহক প্রতি ১০ এমবিপিএস সেবা প্রয়োজন। 

আমাদের দেশে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেটের দাম কি বেশি?

-না, কিন্তু চ্যালেঞ্জ হচ্ছে সারাদেশে একই দামে একই মানে (কোয়ালিটি অব সার্ভিস) ইন্টারনেট দেওয়া। ঢাকায় যে দামে ইন্টারনেট দেওয়া সম্ভব তা সারাদেশে এখনও পর্যন্ত দেওয়া সম্ভব নয়। কারণ ব্যান্ডউইথের পরিবহন খরচ (ট্রান্সমিশন কস্ট) অনেক বেশি।

করোনাকালে ইন্টারনেটের ব্যবহার বেড়েছে, ব্যান্ডউইথের পরিমাণ কি বলে?

-করোনাকালে ইন্টারনেটের ব্যবহার অনেক বেড়েছে। সবচেয়ে বেশি বেড়েছিল গত বছরের এপ্রিল-জুলাই মাসে, যখন লকডাউন চলছিল। আবারও লকডাউন শুরু হচ্ছে। আবারও বাড়বে বলে মনে হচ্ছে।

চ্যালেঞ্জ হচ্ছে সারাদেশে একই দামে একই মানের  ইন্টারনেট সেবা দেওয়া। ঢাকায় যে দামে ইন্টারনেট দেওয়া সম্ভব তা সারাদেশে এখনও পর্যন্ত দেওয়া সম্ভব নয়। কারণ ব্যান্ডউইথের পরিবহন খরচ (ট্রান্সমিশন কস্ট) অনেক বেশি

সাম্প্রতিক সময়ে কোন ধরনের কনটেন্টের প্রতি মানুষের আগ্রহ বেড়েছে?

-ভিডিও অন ডিমান্ড (ভিওডি): ইউটিউব, নেটফ্লিক্স, অ্যামাজন প্রাইম, ডেইলি মোশন দেখার হার বেড়েছে। যেখানে লোকজন আইডি খুলে মুভি দেখতে পারে, সঙ্গীত বা ডকুমেন্টারি উপভোগ করতে পারে।

লাইভ ভিডিও: ফেসবুক, বিগো, লাইকি, টিকটকের ব্যবহার- যেখানে মানুষ সরাসরি সম্প্রচারে যেতে পারে, ভিডিও ক্লিপ দেখতে পারে। এগুলোর ব্যবহার অনেক বেড়েছে।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম: মানুষ এখন দিনের বেশিরভাগ সময় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কাটাতে পছন্দ করে। এছাড়া সামজিক যোগাযোগ মাধ্যমকে নির্ভর করে অনলাইনে বিভিন্ন ধরনের ব্যবসায়িক প্ল্যাটফর্ম তৈরি হচ্ছে। এসবেও লোকজন ব্যস্ত থাকছে।

ডিজিটাল ডিভাইস হাতে শিশুরা মোটেও নিরাপদ নয়। কারণ ইন্টারনেটে বহু ভারনারেবল কনটেন্ট রয়েছে যা সহজে একসেস করা যায়

শিশুদের হাতে হাতে এখন ডিজিটাল ডিভাইস, তারা ইন্টারনেটে কতটা নিরাপদ?

-শিশু বলতে বয়স সীমা কত? ৬ বছরের নিচের শিশুদের বাবা-মায়েরা সহজেই নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। যে সময় এখন চলছে, তাতে করে বাবা-মায়ের ভূমিকা এখানে সবচেয়ে বেশি। বাবা-মায়েরা সন্তানদের ব্রাউজার সিলেক্ট করে দিতে পারে। লগ-ইন দিয়ে বয়স সীমা বেঁধে দিয়ে ইউটিউব কিডস দিয়ে দিতে পারে। মোবাইলে সার্ফিং অফ রাখতে পারে- কিছু অ্যাপসের একসেস কন্ট্রোল করে, নতুন অ্যাপ ইনস্টল ও ডিলিটের ক্ষেত্রে রেস্ট্রিকশন আনতে পারে। এসব করা গেলে শিশুরা ইন্টারনেটে নিরাপদ থাকবে।

ডিজিটাল ডিভাইস হাতে শিশুরা মোটেও নিরাপদ নয়। কারণ ইন্টারনেটে বহু ভারনারেবল কনটেন্ট রয়েছে যা সহজে একসেস করা যায়। অনেক উপকারী কনটেন্টও আছে। শিশুরা ইন্টারনেট থেকে বিভিন্ন ভাষা, শিক্ষার মতো ভালো জিনিসও শিখতে পারে।

প্যারেন্টাল কন্ট্রোল বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ সাইটে প্রবেশ, দেখা ইত্যাদি থেকে রক্ষা করতে পারে। তবে বর্তমান সময়ে বাবা-মায়েরা তাদের সন্তানদের সঙ্গে কথা বলে ইন্টারনেটের খারাপ জিনিসগুলো সম্পর্কে সচেতন করতে পারেন, তাদের ডিভাইসগুলো চেক করে দেখতে পারেন আসলেই তারা অনলাইনে কী করছে

প্যারেন্টাল কন্ট্রোল এক্ষেত্রে কতটা সহায়ক হতে পারে?

আমার নিজের অভিজ্ঞতায় দেখেছি, ৭ বছরের বেশি বয়সের সন্তানরা বাসা-বাড়ির ইন্টারনেট কন্ট্রোল করে। আইএসপি নির্বাচন করা, ওয়াইফাই রাউটার ঠিক করা এবং কনফিগার করার কাজটি অনেক সন্তান করে থাকে। অনেক অভিভাবক প্রযুক্তিজ্ঞানে তার সন্তানের থেকে পিছিয়ে। এছাড়া শিশুরা অনলাইনে কী করছে সে বিষয়েও অনেক বাবা-মায়েরা উদাসীন থাকেন। ‘আমার বাচ্চারা ইন্টারনেটে অনেক ব্যস্ত থাকে, পড়াশোনা করে’-এসব অন্যদের সঙ্গে গল্প করেই তৃপ্তি বোধ করেন, গর্বও করেন। কিন্তু তাদের সন্তানরা যে অনলাইনে কী করছে সে সম্পর্কে কোনও জ্ঞান রাখেন না, সন্তান যা বলে তাই বিশ্বাস করেন- এগুলো ঠিক নয়। সন্তানদের প্রতি আরও যত্নবান হতে হবে, খেয়াল রাখতে হবে তারা কী করছে।  উদাসীনতা, খেয়াল না করা ভয়াবহ বিপদ ডেকে আনতে পারে। বাবা-মায়েরা কোনও কিছু ব্লক করে রাখলে সন্তানরা ভিপিএন (ভার্চুয়াল প্রাইভেট নেটওয়ার্ক) ব্যবহার করে সেসব সাইটে প্রবশে করতে পারে। এই প্রযুক্তিজ্ঞানটুকু যেন বাবা-মায়েরা রাখেন। শুধু ব্লক করে আত্মতৃপ্তি পেলে সর্বনাশ হবে।

প্যারেন্টাল কন্ট্রোল বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ সাইটে প্রবেশ, দেখা ইত্যাদি থেকে রক্ষা করতে পারে। তবে বর্তমান সময়ে বাবা-মায়েরা তাদের সন্তানদের সঙ্গে কথা বলে ইন্টারনেটের খারাপ জিনিসগুলো সম্পর্কে সচেতন করতে পারেন, তাদের ডিভাইসগুলো চেক করে দেখতে পারেন আসলেই তারা অনলাইনে কী করছে।

আহমেদ জুনায়েদ

আইআইজি প্রতিষ্ঠানগুলোর কি ব্যান্ডউইথে কোনও ভ্যালু অ্যাড করার সুযোগ আছে?

-অবশ্যই। আইআইজিগুলো ইন্টারনেট ব্যান্ডউইথে অতিরিক্ত ভ্যালু যোগ করতে পারে। দেখুন, কোয়ালিটি অফ সার্ভিসের সঙ্গে কোয়ালিটি অব ইন্টারনেট টার্মটার সঙ্গে পরিচিত হওয়া খুবই প্রয়োজন। এই কোয়ালিটি অব ইন্টারনেট কিন্তু নিশ্চিত করতে পারে আইআইজিগুলো। গেটওয়েগুলোর কাজই কিন্তু টায়ার ওয়ান এবং গুগল, ফেসবুক ও কন্টেন্ট প্রোভাইডারের সঙ্গে কাজ করে একটি ‘কোয়ালিটি ট্রানজিট’ নিশ্চিত করা যা গ্রাহককে কোয়ালিটি ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগ করে দেবে। তার সঙ্গে কোয়ালিটি অব সার্ভিস ও আপটাইম নিশ্চিত করর ব্যাপারগুলো তো আছেই। 

যখনই লকডাউন হয় বা কোনও জরুরি পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়, তখন অর্থনৈতিক ও সামাজিক সব কাজকর্মই কিন্তু চলে ইন্টারনেটের ওপর ভর করে

-এবারের লকডাউনে ইন্টারনেট প্রতিষ্ঠানগুলো কিভাবে সাপোর্ট ও সার্ভিস দিচ্ছে ?

-দেখুন যখনই লকডাউন হয় বা কোনও জরুরি পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়, তখন অর্থনৈতিক ও সামাজিক সব কাজকর্মই কিন্তু চলে ইন্টারনেটের ওপর ভর করে। যতায়াতে প্রতিবন্ধকতা ও পরিস্থিতি স্বাভাবিক না থাকায় আমাদের কাজও কিন্তু বেড়ে যায়। আমাদের সব ধরনের কর্মীদের ২৪ ঘণ্টা সচেতন থাকতে হয় সিস্টেম ও সার্ভিস যেন ঠিকমত চলে তা নিয়ে। আমাদের আরও বেশি অধিক সচেতন হতে হয়, কোনও গ্রাহক কোনও সমস্যা পাচ্ছে কি না সেসবে খেয়াল রাখতে হয়।

বাংলা ট্রিবিউন: সময় দেওয়ার আপনাকে ধন্যবাদ।

আহমেদ জুনায়েদ: বাংলা ট্রিবিউনের জন্য শুভেচ্ছা।