কিছুদিন আগেও মোবাইল ওয়ালেট অ্যাপ্লিকেশন ব্যবহারের মাধ্যমে পেমেন্ট করাকে ‘অলস প্রজন্মের’ এক ধরনের বিলাসিতা মনে করা হতো। সেই জায়গা থেকে অনেক দূর এগিয়েছি আমরা। অনেক কিছু পরিবর্তন হয়েছে। কোভিড-১৯-এর কারণে আমাদের জনসংখ্যার বেশিরভাগ অংশ তথাকথিত ’অলস প্রজন্মে’ পরিণত হয়েছে।
আমরা কিছুটা পেছনে ফিরে তাকালে দেখবো, গত কয়েক বছরে মানব উন্নয়নের বিভিন্ন সূচকে বাংলাদেশ অনেক উন্নতি করেছে। প্রযুক্তি ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের উন্নতি ঈর্ষণীয়। বর্তমানে আমাদের দেশে ইন্টারনেট ব্যবহারের হার ৬০ দশমিক ৭ শতাংশ। এই পরিস্থিতি বিভিন্ন ব্যবসা ও সেবায় উন্নতির অনেক সুযোগ তৈরিতে সহায়তা করেছে।
বাংলাদেশে এই উন্নতির ছোঁয়া লেগেছে পেমেন্ট সেক্টরেও। আর্থিক অন্তর্ভুক্তি সর্বোচ্চ চূড়ায় অবস্থানকালে মহামারি করোনাভাইরাস বৈশ্বিক বাণিজ্য ও ব্যবসার ব্যাপক ক্ষতি সাধন করায় সবকিছু থমকে গিয়েছিলো। এই প্রভাব পড়েছে আমাদের দেশীয় অর্থনীতিতেও। নজিরবিহীন, অপ্রত্যাশিত এবং অচিন্ত্যনীয় আক্রমণে আমাদের ব্যক্তিগত, সামাজিক ও অর্থনৈতিক জীবন বিপর্যস্ত। অত্যন্ত ভয়াবহ এই অবস্থার মধ্যেও ডিজিটাল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস অসাধারণ অবদান রেখেছে।
মহামারি শুরুর দিনগুলো ছিল ভয় ও অজানা ঝুঁকিতে পরিপূর্ণ। এ সময় অনেকে এটিএম বুথে যাওয়া থেকেও বিরত থেকেছেন। তখন আক্রান্ত হওয়ার ভয়ে নগদ টাকার ব্যবহার মারাত্মকভাবে কমে যায়। এসব কারণ মানুষকে ধীরে ধীরে ক্যাশহীন, কন্টাক্টহীন পেমেন্টের দিকে যেতে উৎসাহিত করেছে। পরিস্থিতির কারণে মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস, ডিজিটাল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস এবং অনলাইন পেমেন্ট’র মতো কয়েকটি কন্টাক্টলেস পেমেন্ট সিস্টেম বেশ আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে। এ সময় এসব সেবা এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে বিরামহীন সংযোগ প্রয়োজনীয় হয়ে পড়ে। কিন্তু এভাবে সেবা দেওয়ার জন্য অবকাঠামোগত প্রস্তুতি ছিল না। ফলে শেষ পর্যন্ত গ্রাহকদের পুরোপুরি সেবা দেওয়া সম্ভব হয়নি।
সাধারণভাবে বলতে গেলে মহামারি করোনাভাইরাস জোর করেই স্বস্তির জায়গা থেকে আমাদের বের করে এনেছে এবং পেমেন্ট সিস্টেমে অভ্যাসের পরিবর্তন ঘটিয়েছে। তারপরও জনসংখ্যার একটি অংশ বিভিন্ন পণ্য ক্রয়ের ক্ষেত্রে ডিজিটাল পেমেন্টের পরিবর্তে ‘ক্যাশ’ ব্যবহার করছে। সবকিছু মিলিয়ে আমাদের মৌলিক অর্থ ব্যবস্থাপনা ও পেমেন্ট সংক্রান্ত আচরণে অনেক বড় পরিবর্তন এসেছে।
সময়ের সঙ্গে কোভিড-১৯ আমাদের অনেকের কাছে হয়ে উঠেছে অনেকটাই স্বাভাবিক। আমাদের জীবনধারণ প্রক্রিয়ায় এবং এর সঙ্গে কীভাবে খাপ খাওয়ানো হবে সেদিকটায় রয়েছে করোনাভাইরাসের ব্যাপক প্রভাব। পেমেন্ট সেক্টরে উদ্ভাবনী চিন্তায় বেশ ভালোভাবে মনোনিবেশ করেছে অনেকে। ইতোমধ্যে অনেক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। তারপরও এখনও অনেক জায়গা রয়েছে যেখানে আমাদের কাক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে হলে আরও বেশি উন্নতি করা প্রয়োজন। এরমধ্যে আছে ডিজিটাল পেমেন্ট বিষয়ে অজ্ঞতা দূর করা, পেমেন্ট অ্যাপ্লিকেশন্স অ্যান্ড সার্ভিস প্রোভাইডারদের মধ্যে সত্যিকারের ইন্টারঅপারেবিলিটি গড়ে তোলা, আরও বেশি টোকেনাইজড পেমেন্ট নিয়ে আসা, নতুন ফিনটেক সার্ভিস চালু করা এবং ডিজিটাল পেমেন্টে সার্ভিসেস’র নিরাপত্তা বাড়ানো।
এটা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, বর্তমানে বাংলাদেশে সবচেয়ে জনপ্রিয় উঠতি ট্রেন্ডগুলোর মধ্যে অন্যতম একটি হলো ডিজিটাল পেমেন্ট। এর মাধ্যমে সাম্প্রতিক কার্যক্রম ডিজিটাল ইকো-সিস্টেমের মধ্যে চলে এসেছে। এটি মহামারি করোনাভাইরাসের চ্যালেঞ্জগুলোকে ডিঙিয়ে দেশের সার্বিক অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। এই অবস্থা ধরে রাখার সঙ্গে সঙ্গে সঠিক সময়ে সঠিক নীতিমালা ও সিদ্ধান্ত নিতে পারলে মহামারির ক্ষতি দ্রুত পুষিয়ে নিতে এবং ভবিষ্যত উন্নতির পথে এগিয়ে যেতে পারবে বাংলাদেশ।
লেখক: হেড অব পেমেন্ট ল্যাব, কনা সফটওয়্যার ল্যাব লিমিটেড