সর্বশেষ নিলাম অনুষ্ঠানে মোবাইলফোন অপারেটর বাংলালিংক ৯ দশমিক ৪ মেগাহার্টজ তরঙ্গ (স্পেক্ট্রাম) কিনেছে। এখন মোট তরঙ্গ ৪০ মেগাহার্টজ। অপারেটরগুলোর মধ্যে যা তৃতীয় সর্বোচ্চ। যা দিয়ে বাংলালিংক তার গ্রাহকদের আরও উন্নত সেবা (ভয়েস ও ডাটা) দিতে পারবে বলে মনে করেন অপারেটরটির প্রধান নির্বাহী এরিক অস।
এরিক বলেন, বর্তমানে বাংলালিংক প্রতি মেগাহার্টজ তরঙ্গে প্রায় ১২ লাখ গ্রাহককে সেবা দিচ্ছে। ৯ এপ্রিল থেকে অতিরিক্ত তরঙ্গ (৯.৪ মেগাহার্টজ) ব্যবহার করলে এ সংখ্যা নেমে আসবে প্রায় ৯ লাখে। তখন গ্রাহকরা আরও ভালো সেবা পাবেন।
এরিক অস সোমবার (১৫ মার্চ) রাজধানীর গুলশানে বাংলালিংক কার্যালয়ে আমন্ত্রিত কয়েকজন সাংবাদিককে এসব তথ্য জানান। তিনি জানান, ইন্ডাস্ট্রি রেভিনিউ কমার পরও বাংলালিংকের রেভিনিউ, মার্কেট শেয়ার ও ডাটা (ইন্টারনেট) মার্কেট শেয়ার বাড়ছে। এতে প্রমাণ হয় যে, গ্রাহকরা আমাদের ওপর আস্থা রেখেছেন। তিনি জানান, কোনও মোবাইল ব্যবহারকারী যদি দুটো সিম ব্যবহার করেন তবে একটা বাংলালিংকের হবেই। এটা প্রমাণিত।
তিনি আরও জানান, ২০২০ সালে ফোর-জিতে বাংলালিংকের ব্যবহারকারী ১১৬ শতাংশ, রেভিনিউ মার্কেট শেয়ার ০ দশমিক ৩ ও ডাটা রেভিনিউ মার্কেট শেয়ারে প্রবৃদ্ধি হয়েছে দশমিক ৪ শতাংশ। গতবছর গ্রাহকপ্রতি ডাটার ব্যবহার ছিল গড়ে ২ দশমিক ৪ জিবি, প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৫৫ দশমিক ৩ শতাংশ।
কলড্রপ বাড়ার বিষয়ে জানতে চাইলে এরিক অস বলেন, ২০২০ সালে জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত আমাদের কলড্রপ হয়েছে ১৪ কোটি ৬৫ লাখ মিনিট, যা প্রতিযোগীদের চেয়ে অনেক কম। টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রক সংস্থার নির্দেশনা আছে কলড্রপ ২ শতাংশের নিচে থাকতে হবে। বাংলালিংকের তা দশমিক ৮ শতাংশ।
এক সময়ের পড়ন্ত বাংলালিংককে টেনে দ্বিতীয় অবস্থানে নিয়ে এসেছেন এরিক। এয়ারটেল রবি একীভূত করার পর বাংলালিংক তিনে নেমেছে। কী ছিল সেই ম্যাজিক? জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘মানুষ! মানুষ কী চায় তা সবার আগে বুঝতে হবে। আমরা পেরেছিলাম। এরপরে দক্ষতা। সহকর্মীদের বিশ্বাস করা। এসব আমার ছিল। অবস্থান বা কত নম্বরে আছি তা নিয়ে ভাবি না। আমি ভাবতে চাই গ্রাহক আমার সেবায় সন্তুষ্ট কিনা, আস্থা রাখতে পারছে কিনা। এ কারণে ২০২০ সালে মোবাইল শিল্পে সামগ্রিকভাবে প্রবৃদ্ধি না হলেও বাংলালিংকের হয়েছে। আমাদের ওপর গ্রাহকরা আস্থা হারায়নি বলেই আমরা এগিয়েছি।
অন্য অপারেটরের চেয়ে বাংলালিংকের ইন্টারনেটের দাম বেশি বলে অভিযোগ আছে- এমন প্রশ্নের জবাবে এরিক বলেন, আমরা ইন্টারনেটের দামের দিক থেকে দ্বিতীয় সর্বনিম্ন (সর্বনিম্ন টেলিটক)। কিন্তু গতির (স্পিড) দিক থেকে আমরা প্রথম। তিনি জানান, ২০২০ সালের দুই কোয়ার্টারে ওকলা টেস্টে বাংলালিংক প্রথম হয়েছে। গড় গতি ১৪ দশমিক ১৬ এমবিপিএস।
নতুন কেনা তরঙ্গ কী কাজে ব্যবহার হবে জানতে চাইলে এরিক বলেন, ফোর-জির জন্য ব্যবহার হবে। এতে ফোর-জির গ্রোথ ভালো হবে। বাংলালিংকের টাওয়ার যেখানে পৌঁছাবে সেখানে আমরা ফোর-জি পৌঁছাবো।
বাংলালিংক কেন গ্রামীণফোন বা রবির সঙ্গে তরঙ্গ (শেষ বা ৯ নম্বর ব্লক) নিলাম যুদ্ধে অংশ নিল না? যা বরাদ্দ পাওয়া গেছে, তাতেই তুষ্ট আপনারা? এতে গ্রাহক সেবার মানে কি ছাড় দেওয়া হলো? এমন প্রশ্নের জবাবে বাংলালিংকের প্রধান নির্বাহী বলেন, আমাদের ওই যুদ্ধে অংশ নেওয়ার প্রয়োজন হয়নি। তার আগেই আমরা পর্যাপ্ত তরঙ্গ (৯.৪ মেগাহার্টজ) বরাদ্দ নিয়ে নিই। এখন সব মিলিয়ে ৪০ মেগাহার্টজ তরঙ্গ রয়েছে আমাদের। আমরা এতেই সন্তুষ্ট। এই তরঙ্গ দিয়েই অন্যদের চেয়ে আমরা গ্রাহকদের ভালো সেবা দিতে পারবো।
বাংলালিংকের বিনিয়োগ বিষয়ে জানতে চাইলে এরিক বলেন, বিনিয়োগ নিয়ে আমাদের বিশাল পরিকল্পনা রয়েছে। বিনিয়োগ বাড়াচ্ছি। তরঙ্গ বরাদ্দ নিতে এক হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করছি।
বাংলালিংকের গ্রাহকরা শিগগিরই কোনও সুখবর পেতে যাচ্ছে? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বাংলালিংকের গ্রাহকদের জন্য ফোর-জি এক্সপেরিয়েন্সটা গুরুত্বপূর্ণ। এ ছাড়া আছে কম কলড্রপ। ট্যারিফ (ভয়েস ও ডাটা) নিয়ে আমি খুব বেশি অভিযোগ শুনিনি। এসবই গ্রাহকরা উপভোগ করছেন। এটা সব সময়ের জন্যই সুখবর।
ফাইভ-জি নিয়ে কতদূর এগোলেন? জবাবে এরিক অস বলেন, এটা একটা জাতীয় প্রকল্প। নতুন ইকোসিস্টেম। এটা শিল্পক্ষেত্রের জন্য বেশি প্রযোজ্য। আপনি যদি একটা গাড়ি দূর থেকে নিয়ন্ত্রণ করতে চান তবে ফাইভ-জির প্রয়োজন হবে। এটি মূলত সব প্রযুক্তির মিশ্রণ। থ্রি-জি, ফোর-জির একটি সমন্বিত রূপ। আমাদের মনে রাখতে হবে, আমরা মাত্র ৩ বছর আগে ফোর-জিতে প্রবেশ করেছি। এটা অত্যন্ত ব্যয়বহুল অপারেটরগুলোর জন্য। গ্রাহকের জন্য নয়। তারপরও, নতুন যাই হোক, আমরা সরকারের সঙ্গে থাকবো। সরকার যখন এটা ওপেন করবে তখন বাংলালিংকও তাতে যাবে।
তিনি এও মনে করিয়ে দেন, ফাইভ-জিতে গেলেই হবে না। সেজন্য উন্নত হ্যান্ডসেটও লাগবে। দেশে ফোরজি হ্যান্ডসেটের স্বল্পতার কারণে এখনও এ সেবা সবার কাছে পৌঁছানো যাচ্ছে না। মোট মোবাইলের মধ্যে মাত্র ৩০ শতাংশ স্মার্টফোন।
বাংলাদেশের সঙ্গে ২০ বছরের সম্পর্ক এরিকের। প্রথম বাংলাদেশে আসেন ২০০১ সালের জুনে। শুরুর দিকে তার কাজের ক্ষেত্র ছিল ভিন্ন। ২০০৪ সালে তিনি গ্রামীণফোনের প্রধান নির্বাহী হিসেবে যোগ দেন। গ্রামীণফোনে ৩ বছরের মেয়াদ শেষে অন্য প্রজেক্টে চাকরি করেন। পরে ২০১৫ সালে বাংলালিংকের প্রধান নির্বাহী হিসেবে যোগ দেন। বাংলাদেশে থাকাটা বেশ উপভোগ করেন এরিক। তিনি এদেশের মানুষের সঙ্গে মিশতে পছন্দ করেন। পছন্দ করেন এ দেশের খাবার। দুই সন্তানের সঙ্গে সময় কাটান। আর পছন্দ করেন নিজের দেশ নরওয়েতে স্কি করতে।
তিনি মনে করেন ভালো লিডার হতে গেলে বিনয়ী হতে হবে। শুধু কথা বলা নয়, শুনতেও হবে অন্যকে।
ছবি: হিটলার এ হালিম