পূর্বাভাস মিললেও পৌঁছায় না সতর্কবার্তা, বেড়েই চলেছে বজ্রপাতে মৃত্যু

বজ্রপাত ও তীব্র বজ্রঝড়ের আগাম পূর্বাভাস দেওয়ার সক্ষমতা আগের চেয়ে অনেক বেড়েছে বাংলাদেশের। তবে সেই সতর্কবার্তা এখনও সময়মতো পৌঁছায় না সবচেয়ে ঝুঁকিতে থাকা কৃষক, জেলে ও খোলা জায়গায় কাজ করা মানুষের কাছে। ফলে উন্নত পূর্বাভাস ব্যবস্থা থাকলেও বজ্রপাতে প্রাণহানি আশঙ্কাজনকভাবেই রয়ে গেছে।

এমন প্রেক্ষাপটেই বিশ্বের অন্যান্যে দেশের সঙ্গে বাংলাদেশেও রবিবার (২৮ জুন) পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক বজ্রপাত নিরাপত্তা দিবস। দিবসটির এবারের প্রতিপাদ্য— ‘শুনলে বজ্রধ্বনি, ঘরে যাই তখনই’।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, গত ১২ বছরে দেশে বজ্রপাতে মারা গেছেন ৩ হাজার ৮৬০ জন।

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬ সালে বজ্রপাতকে জাতীয় দুর্যোগ ঘোষণা করা হয়। বছরভিত্তিক পরিসংখ্যান বলছে, ২০১৫ সালে বজ্রপাতে মারা যান ২২৬ জন। এরপর ২০১৬ সালে ৩৯১ জন, ২০১৭ সালে ৩৮৮ জন, ২০১৮ সালে ৩৫৯ জন, ২০১৯ সালে ৪০১ জন, ২০২০ সালে সর্বোচ্চ ৪২৭ জন, ২০২১ সালে ৩৬৩ জন, ২০২২ সালে ৩৩৭ জন, ২০২৩ সালে ৩২২ জন, ২০২৪ সালে ২৭১ জন এবং ২০২৫ সালে ২৪৩ জনের মৃত্যু হয়। চলতি বছরের ১৪ জুন পর্যন্ত বজ্রপাতে প্রাণ হারিয়েছেন আরও ১৩২ জন।

বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের তথ্য অনুযায়ী, দক্ষিণ এশিয়ায় প্রতি এক হাজার বর্গকিলোমিটারে বজ্রপাতে মৃত্যুর হার সবচেয়ে বেশি বাংলাদেশে। আর বিশ্বে বজ্রপাতে মৃত্যুর সংখ্যায় ভারতের পরেই বাংলাদেশের অবস্থান।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এখন আর বজ্রপাতের পূর্বাভাস দেওয়া নয়, বরং সেই তথ্য দ্রুত মানুষের হাতে পৌঁছে দেওয়া।

এক থেকে চার ঘণ্টা আগেই পূর্বাভাস

বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদফতরের দাবি, বর্তমানে বজ্রঝড় শুরু হওয়ার এক থেকে চার ঘণ্টা আগেই পূর্বাভাস দেওয়া সম্ভব হচ্ছে।

তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সমস্যা হচ্ছে ‘লাস্ট মাইল কমিউনিকেশন’ বা শেষ ধাপে বার্তা পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে। অধিকাংশ সতর্কবার্তা টেলিভিশন, ওয়েবসাইট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করা হলেও মাঠে থাকা কৃষক, জেলে ও শ্রমজীবী মানুষের বড় একটি অংশ সেই বার্তা পান না।

এখনও দেশে জাতীয় পর্যায়ে মোবাইল সেল ব্রডকাস্ট প্রযুক্তিনির্ভর জরুরি সতর্কবার্তা ব্যবস্থা চালু হয়নি। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর মতে, দুর্যোগের সময় এই প্রযুক্তিই সবচেয়ে দ্রুত ও কার্যকরভাবে মানুষের কাছে সতর্কবার্তা পৌঁছে দিতে পারে।

এ বিষয়ে সেভ দ্য সোসাইটি অ্যান্ড থান্ডারস্টর্ম অ্যাওয়ারনেস ফোরামের (এসএসটিএএফ) সাধারণ সম্পাদক রশিম মোল্লা বলেন, প্রযুক্তি থাকলেও সবচেয়ে ঝুঁকিতে থাকা মানুষের কাছে সময়মতো সতর্কবার্তা পৌঁছায় না।

বিষয়টি নিয়ে জাতিসংঘও বেশ উদ্যোগী। জাতিসংঘের লক্ষ্য ২০২৭ সালের মধ্যে সবাইকে সতর্কবার্তার আওতায় আনা। মিসরের কপ-২৭ সম্মেলনে জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস এই ঘোষণা দেন।

বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (ডব্লিউএমও), জাতিসংঘের দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাসবিষয়ক কার্যালয় (ইউএনডিআরআর), আন্তর্জাতিক টেলিযোগাযোগ ইউনিয়ন (আইটিইউ) এবং আন্তর্জাতিক রেডক্রস ও রেডক্রিসেন্ট ফেডারেশন (আইএফআরসি) যৌথভাবে এই উদ্যোগ বাস্তবায়ন করছে।

আইটিইউর মতে, কার্যকর আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থার জন্য মোবাইল নেটওয়ার্ক, ডিজিটাল সংযোগ, জরুরি টেলিযোগাযোগ এবং সেল ব্রডকাস্ট প্রযুক্তির সমন্বয় জরুরি।

জলবায়ু পরিবর্তনে বাড়ছে বজ্রপাতের ঝুঁকি

বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বায়ুমণ্ডল আরও অস্থিতিশীল হয়ে উঠছে। ফলে শক্তিশালী বজ্রঝড় এবং বজ্রপাতের ঘটনাও বাড়ছে।

সম্প্রতি আবহাওয়া অধিদফতরে আয়োজিত এক গোলটেবিল বৈঠকে আবহাওয়াবিদ খান মো. গোলাম রব্বানী বলেন, দেশে কন্টিনিউয়িং কারেন্ট লাইটনিং বেড়েছে। এ ধরনের বজ্রপাত দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ বহন করে এবং এর তাপমাত্রা প্রায় ৫০ হাজার ডিগ্রি ফারেনহাইট পর্যন্ত হতে পারে।

তিনি আরও জানান, পজিটিভ লাইটনিং-এর ঘটনাও বাড়ছে। এটি মূল মেঘ থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরেও আঘাত হানতে পারে। ফলে আকাশ তুলনামূলক পরিষ্কার থাকলেও মানুষ বজ্রপাতে আক্রান্ত হতে পারেন।

জ্যেষ্ঠ আবহাওয়াবিদ বজলুর রশিদ বলেন, আগে বজ্রপাত মূলত প্রাক-বর্ষা মৌসুমে সীমাবদ্ধ থাকলেও এখন বর্ষা মৌসুমেও এর প্রকোপ বাড়ছে।

সবচেয়ে ঝুঁকিতে হাওরাঞ্চল

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) গবেষকদের মতে, দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের হাওর এলাকা বজ্রপাতের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চল।

সুনামগঞ্জের জামালগঞ্জ, সুনামগঞ্জ সদর, বিশ্বম্ভরপুর, নেত্রকোনা এবং মৌলভীবাজারের কয়েকটি এলাকা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। বিস্তীর্ণ খোলা মাঠ ও জলাভূমিতে কাজ করা মানুষের আশ্রয় নেওয়ার সুযোগ কম থাকায় প্রাণহানিও বেশি হয়।

কী করতে হবে

বিশেষজ্ঞদের মতে, বজ্রপাতের পূর্বাভাস দেওয়ার পাশাপাশি এখন সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে ‘লাস্ট মাইল কমিউনিকেশন’ বা শেষ ধাপের সতর্কবার্তা ব্যবস্থাকে।

তাদের সুপারিশের মধ্যে রয়েছে– সেল ব্রডকাস্ট প্রযুক্তি, স্বয়ংক্রিয় এসএমএস, মসজিদের মাইক, কমিউনিটি সাইরেন, স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবক নেটওয়ার্ক এবং স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে আবহাওয়া অধিদফতরের সমন্বয় বাড়ানো।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদফতরের পরিচালক মো. মমিনুল ইসলাম বলেন, আমাদের পূর্বাভাস দেওয়ার সক্ষমতা অনেক বেড়েছে। এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো, ঝুঁকিতে থাকা মানুষের কাছে সময়মতো সেই সতর্কবার্তা পৌঁছে দেওয়া, যাতে তারা নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে পারেন।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের এই সময়ে শুধু পূর্বাভাস যথেষ্ট নয়। প্রকৃত সাফল্য তখনই, যখন বজ্রপাতের আগেই মাঠে কাজ করা মানুষের হাতে সতর্কবার্তা পৌঁছে যাবে।