টানা বৃষ্টিতে বন্যা ও পাহাড়ধসের শঙ্কা, ১৭ জেলায় সতর্কতা

টানা ভারী বৃষ্টি, উজানের ঢল এবং নদ-নদীর পানি দ্রুত বাড়তে থাকায় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বন্যা ও পাহাড়ধসের ঝুঁকি বেড়েছে। কয়েকটি নদীর পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করতে পারে বলে সতর্ক করেছে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র। একইসঙ্গে চার বিভাগের ১৭ জেলায় স্বল্পমেয়াদি বন্যার পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। চট্টগ্রাম বিভাগের পাহাড়ি এলাকাগুলোতে টানা বৃষ্টিতে পাহাড়ধসের আশঙ্কাও বেড়েছে।

মঙ্গলবার (৭ জুলাই) প্রকাশিত পূর্বাভাসে জানানো হয়, গত ২৪ ঘণ্টায় চট্টগ্রাম বিভাগে অতি ভারী এবং সিলেট ও বরিশাল বিভাগে ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টিপাত হয়েছে। একই সময়ে ভারতের মেঘালয় ও ত্রিপুরাতেও ভারী বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। আগামী চার দিন চট্টগ্রাম, সিলেট, ময়মনসিংহ ও রংপুর বিভাগ এবং ভারতের ত্রিপুরা, আসাম, মেঘালয় ও পশ্চিমবঙ্গের উজান এলাকায় ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টি অব্যাহত থাকতে পারে।

সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানিয়েছে, উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সুরমা ও কুশিয়ারা নদীর পানি দ্রুত বাড়তে পারে। এতে সিলেট ও সুনামগঞ্জে নদীর পানি সতর্কসীমার কাছাকাছি পৌঁছে কিছু নিম্নাঞ্চল সাময়িকভাবে প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

এদিকে গোমতী, মুহুরী, ফেনী, সিলোনিয়া, হালদা, সাঙ্গু ও মাতামুহুরী নদীর পানি দ্রুত বৃদ্ধি পেয়ে বান্দরবান, কক্সবাজার, ফেনী, চট্টগ্রাম ও খাগড়াছড়ির কিছু এলাকায় বিপৎসীমা অতিক্রম করতে পারে। এতে লক্ষ্মীপুর ও নোয়াখালীর নিম্নাঞ্চলসহ বিস্তীর্ণ এলাকা সাময়িকভাবে প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

এ ছাড়া মনু, ধলাই, খোয়াই, কংস, সারিগোয়াইন, সোমেশ্বরী, যাদুকাটা ও ভুগাই নদীর পানিও দ্রুত বাড়তে পারে। ফলে সিলেট, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, নেত্রকোনা, শেরপুর ও ময়মনসিংহ জেলার কিছু এলাকায় স্বল্পমেয়াদি বন্যা দেখা দিতে পারে।

উত্তরাঞ্চলে আগামী ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে তিস্তা নদীর পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করতে পারে। এতে নীলফামারী ও লালমনিরহাটের নিম্নাঞ্চলে বন্যার আশঙ্কা রয়েছে। একইসঙ্গে ধরলা ও দুধকুমার নদীর পানিও কুড়িগ্রাম ও লালমনিরহাট এলাকায় সতর্কসীমার কাছাকাছি পৌঁছাতে পারে।

বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদফতরের আবহাওয়াবিদ ওমর ফারুক বলেন, উত্তর-পশ্চিম বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট মৌসুমি লঘুচাপের প্রভাবে আগামী ৭২ ঘণ্টায় চট্টগ্রাম, রাজশাহী, ঢাকা, খুলনা, বরিশাল ও সিলেট বিভাগের বিভিন্ন স্থানে ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টি হতে পারে। অতিবৃষ্টির কারণে চট্টগ্রাম বিভাগের পাহাড়ি এলাকায় পাহাড়ধসের ঝুঁকিও বেড়েছে।

বান্দরবানে পাহাড়ধসের উচ্চঝুঁকিতে ৩০ হাজার পরিবার

টানা বৃষ্টিতে সবচেয়ে উদ্বেগজনক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বান্দরবানে। জেলার সাত উপজেলায় পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসকারী প্রায় ৩০ হাজার পরিবার পাহাড়ধসের ঝুঁকিতে রয়েছে।

জেলা প্রশাসন ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় মাইকিং শুরু করেছে। প্রস্তুত রাখা হয়েছে ১২০টি আশ্রয়কেন্দ্র এবং আটটি মেডিক্যাল টিম। সাঙ্গু ও মাতামুহুরী নদীর পানি বেড়ে থানচি, রুমা, লামা ও আলীকদম উপজেলায় বন্যার আশঙ্কাও বেড়েছে।

রুমার কেওক্রাডং এলাকায় ৫০ জনের বেশি পর্যটক আটকা পড়েছেন। তবে থানচি ও রেমাক্রিতে আটকে পড়া পর্যটকদের স্থানীয় প্রশাসন ও স্বেচ্ছাসেবীরা নিরাপদে সরিয়ে নিয়েছে। বৈরী আবহাওয়ার কারণে আগামী শুক্রবার পর্যন্ত জেলার সব পর্যটন কার্যক্রম বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।

বান্দরবান পৌরসভার প্রশাসক মঞ্জুরুল আলম বলেন, কয়েক দিনের টানা বৃষ্টিতে পাহাড়ধস ও নিম্নাঞ্চলে জলাবদ্ধতার ঝুঁকি বেড়েছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় আমরা সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে আছি।

জেলা প্রশাসক সানিউল ফেরদৌস বলেন, দুর্যোগ মোকাবিলায় সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। পাহাড়ধসপ্রবণ এলাকায় বসবাসকারীদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সাত উপজেলায় মাইকিং চলছে এবং ১২০টি আশ্রয়কেন্দ্র ও আটটি মেডিক্যাল টিম প্রস্তুত রাখা হয়েছে।

কক্সবাজারে ৩৩ ইউনিয়ন প্লাবিত, বাড়ছে প্রাণহানি

টানা বর্ষণে কক্সবাজারের নয়টি উপজেলার অন্তত ৩৩টি ইউনিয়ন প্লাবিত হয়েছে। বাকখালী ও মাতামুহুরী নদীর পানি বৃদ্ধি এবং পাহাড়ি ঢলে রামু, চকরিয়া, পেকুয়া, মহেশখালী, টেকনাফ, উখিয়া, ঈদগাঁও ও কুতুবদিয়ার বিস্তীর্ণ এলাকা পানিতে তলিয়ে গেছে। শত শত পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে।

গত দুই দিনে পাহাড়ধসে অন্তত ১১ জনের মৃত্যু হয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ি এলাকা থেকে এক হাজারের বেশি মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।

বৈরী আবহাওয়ার কারণে টেকনাফ-সেন্ট মার্টিন নৌপথে যাত্রীবাহী নৌযান চলাচল বন্ধ রয়েছে। টানা পাঁচ দিন যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকায় দ্বীপে খাদ্যসংকটের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। কুতুবদিয়ায় একটি সেতু ভেঙে পড়ায় স্থানীয় যোগাযোগও ব্যাহত হচ্ছে।

কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. এ. মান্নান বলেন, বৃষ্টির তীব্রতা কিছুটা কমায় সার্বিক পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে। তবে পাহাড়ধসের ঝুঁকি বিবেচনায় কক্সবাজার শহর, রামু, উখিয়া ও টেকনাফের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা থেকে অন্তত এক হাজার মানুষকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। আগামী কয়েক দিন ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা থাকায় সর্বোচ্চ সতর্কতা বজায় রাখা হয়েছে।

ক্ষতিগ্রস্ত রোহিঙ্গা শিবির

টানা বৃষ্টি, আকস্মিক বন্যা ও পাহাড়ধসে কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শিবিরগুলোতেও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।

জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা (ইউএনএইচসিআর) জানিয়েছে, গত কয়েক দিনে অন্তত ১০ জন রোহিঙ্গার মৃত্যু হয়েছে এবং আহত হয়েছেন আরও ১০ জন। প্রায় ১৫ হাজার ৮১৩ জন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন এবং বাস্তুচ্যুত হয়েছেন ৩ হাজার ১৮২ জন। শিবিরগুলোতে ৫২টি পাহাড়ধস, ১৪টি বন্যা এবং ৮৩টি ঝড়জনিত ঘটনার তথ্য পাওয়া গেছে। ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তায় মানবিক সংস্থাগুলো জরুরি ত্রাণ কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।

চট্টগ্রামে রেকর্ড বৃষ্টি, বিমান ও রেল চলাচলে বিঘ্ন

গত ২৪ ঘণ্টায় চট্টগ্রামে ৩৩০ দশমিক ৮ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। এতে নগরের বহু এলাকা হাঁটু থেকে কোমরসমান পানিতে তলিয়ে যায়। সৃষ্টি হয় তীব্র জলাবদ্ধতা, যানজট এবং ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে পানি ঢুকে পড়ে।

রেললাইন তলিয়ে যাওয়ায় প্রায় এক হাজার যাত্রী নিয়ে কক্সবাজারগামী ট্যুরিস্ট এক্সপ্রেস কয়েক ঘণ্টা আটকা পড়ে।

বৈরী আবহাওয়ার কারণে শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ফ্লাইট চলাচলেও বিঘ্ন ঘটে। কয়েকটি আন্তর্জাতিক ফ্লাইট ঢাকায় সরিয়ে নেওয়া হয় এবং একটি অভ্যন্তরীণ ফ্লাইট চট্টগ্রামে অবতরণ করতে না পেরে ঢাকায় ফিরে যায়।

বিমানবন্দরের জনসংযোগ কর্মকর্তা মোহাম্মদ ইব্রাহিম খলিল বলেন, বৈরী আবহাওয়ার কারণে কয়েকটি ফ্লাইট ঢাকায় ডাইভার্ট করা হয়েছে। একটি ফ্লাইট চট্টগ্রামে নামতে না পেরে ঢাকায় ফিরে গেছে। বর্তমানে বিমানবন্দরে ঘণ্টায় ৮০ থেকে ৯০ কিলোমিটার বেগে বাতাস বইছে। আবহাওয়া স্বাভাবিক হলে ফ্লাইট চলাচলও স্বাভাবিক হবে।

রাঙামাটিতে প্রাণহানি

রাঙামাটির বাঘাইছড়িতে পাহাড়ধসে উপড়ে পড়া গাছের নিচে চাপা পড়ে এক বৃদ্ধ নিহত হয়েছেন।

কাপ্তাইয়ে পাহাড়ধস ও গাছ পড়ে চট্টগ্রাম-কাপ্তাই সড়কে সাময়িকভাবে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। পরে তা স্বাভাবিক করা হয়। জেলা প্রশাসন বিভিন্ন স্থানে আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রেখেছে এবং ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ি এলাকায় বসবাসকারীদের নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।

সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় প্রশাসন

দেশের বিভিন্ন জেলায় জেলা প্রশাসন, ফায়ার সার্ভিস, সেনাবাহিনী, স্থানীয় প্রশাসন এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে জরুরি প্রস্তুতিতে রাখা হয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় সতর্কতামূলক প্রচার, আশ্রয়কেন্দ্র চালু, পর্যটনকেন্দ্র বন্ধ, উদ্ধার তৎপরতা এবং চিকিৎসাসেবা জোরদার করা হয়েছে।

বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদফতর জানিয়েছে, আগামী ৪৮ থেকে ৭২ ঘণ্টা দেশের বিভিন্ন এলাকায় ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টি অব্যাহত থাকতে পারে। এতে বন্যা, পাহাড়ধস ও দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতার ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে।