সকাল তো বটেই, রাতের তপ্ত বাতাসেও এখন শীতলতার ছোঁয়া। দেশের গ্রাম-গঞ্জ, হাট-মাঠ পেরিয়ে শীতের আগমনী বার্তা পৌঁছে গেছে রাজধানী ঢাকাতেও। রাতের নিয়ন আলোয় ফাঁকা রাজপথের দিকে তাকালেই চোখে পড়ে ঋতু বদলের আভাস। বাতাসে মিশে থাকা হিমেল পরশ আর কুয়াশার মায়াবী চাদরে ধীরে ধীরে বদলে যাচ্ছে চেনা নগরীর রূপ। প্রকৃতিজুড়ে যেন শীতের নীরব পদধ্বনি কুয়াশার আবরণ সরিয়ে, শিশিরের পরশ মেখে দুয়ারে কড়া নাড়ছে শীত।
হেমন্তের শেষ বিকালে শিউলির ঝরে পড়া পাপড়ি, জিনিয়া, ডেইজি আর স্ন্যাপড্রাগনের রঙিন বাহার। দিগন্তজোড়া সরিষার খেতে হলুদের উৎসব, তারই পাশে সূর্যমুখীর মায়াবী সৌন্দর্য। শিশিরভেজা ঘাস, কুয়াশার চাদর আর হিমেল বাতাসের পরশে প্রকৃতি মেলে ধরবে তার চিরচেনা অথচ অধরা রূপ। ফুলের রং, সুবাস আর ঋতুবদলের মায়ায় এবারও শীত রাঙিয়ে তুলবে বাংলার মাঠ-ঘাট, প্রান্তর আর জনপদ।
বাংলার প্রত্যেকটি ঋতুর আলাদা বৈচিত্র রয়েছে। শীতকেও আলাদা করা সম্ভব সেই বৈচিত্রময়তা দিয়ে। সেই আমেজর শুরুই পাওয়া যাচ্ছে গ্রামগঞ্জে ভোর ও সন্ধ্যায়। কোথাও কোথাও পড়ছে কুয়াশা। শহরেও সন্ধ্যার পর খোলা জায়গায় গেলে গায়ে লাগছে হিমেল বাতাস। আগের মতো তপ্ত গরমের অনুভূতি কমে এসেছে। দিনের গরমের পর সন্ধ্যায় বাতাসে মিলছে কিছুটা স্বস্তি। ঋতু পরিবর্তনের এই সময়ে দিনের সঙ্গে রাতের আবহাওয়ার অনুভূতিতেও পার্থক্য স্পষ্ট হয়ে উঠছে। যদিও হেমন্তকাল। কিন্তু বাতাসে শীতের আগমনী বার্তা ইতোমধ্যে বইতে শুরু করেছে।
আবহাওয়া অধিদফতরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী কয়েক দিন দেশের আবহাওয়া প্রধানত শুষ্ক থাকতে পারে। ১৭ অক্টোবর প্রকাশিত পাঁচ দিনের পূর্বাভাসে তাপমাত্রা সামান্য ওঠানামার কথা বলা হয়েছে। শনিবার দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৩০ থেকে ৩৩ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে ছিল। কোনও কোনও অঞ্চলে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কাছাকাছি নেমেছে। তবে অঞ্চলভেদে তাপমাত্রার পার্থক্য রয়েছে। ফলে দেশের সব জায়গায় একই ধরনের তাপুমাত্রা অনুভূত হচ্ছে না।
দিনের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা তুলনামূলক বেশি থাকলেও রাতের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা কমে আসার কারণে দিনের গরমের অনুভূতি সন্ধ্যায় অনেকটাই বদলে যাচ্ছে।
আবহাওয়াবিদের বক্তব্য
আবহাওয়াবিদ আব্দুল হামিদ বলেন, ‘এতদিন মৌসুমি বায়ুর প্রভাব ছিল। তার প্রভাবে বৃষ্টি আর ভ্যাপসা গরম ছিল। এরপর শীতের সময় উত্তরের বাতাস বইতে শুরু করে। এই বাতাস পরিবর্তনের এই সময়ে আবহাওয়ায় একটা বড় পরিবর্তন হতে থাকে। এখন সেই সময়টাই চলছে।’
তিনি বলেন, ‘শীতের সময় বাতাসে জ্বলীয় বাষ্প কমে আসে। এখন জ্বলীয় বাষ্প কমতে শুরু করেছে। আমাদের দেশে সবার আগে শীতের অনুভূতি শুরু হয় উত্তরাঞ্চলের দিকে। সেদিক থেকে হিমালয় কাছে বলে তাপমাত্রা বরাবর আগেই কমে যায়। ফলে এখন ভোরের দিকে সেদিকের অঞ্চলে ঠান্ডা অনুভূতি পাওয়া যায়। কুয়াশা পড়তে শুরু করেছে। তবে শহরের অবস্থা আলাদা। গাছপালা কম থাকায়, অবকাঠামো বেশি থাকায় শীতের অনুভূতি দেরিতে আসে। এদিকে দক্ষিনাঞ্চলে শীতের অনুভূতি আসে সবার পরে একই কারণে।
তিনি আরও বলেন, ‘চলতি মাসে তাপমাত্রা খুব একটা ওঠানামা করবে না। তবে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা আস্তে আস্তে কমতে শুরু করবে। দিনের সময়ও কমে আসবে। নভেম্বরের দিকে এই অনুভূতি আরও বাড়বে।’
গ্রামগঞ্জের পরিস্থিতি
গ্রামের দিকে ভোরের পরিবেশে পরিবর্তন বেশি চোখে পড়ছে। ভোরে বাইরে বের হলে বাতাসে ঠান্ডা ভাব অনুভূত হচ্ছে। কোথাও কোথাও কুয়াশা পড়ায় সকালের পরিবেশেও শীতের আবহ পাওয়া যাচ্ছে। সন্ধ্যার পরও গ্রামাঞ্চলে তাপমাত্রা কমে যাওয়ার অনুভূতি হচ্ছে। দিনের বেলায় গরম থাকলেও ভোর ও সন্ধ্যার এই পরিবর্তন মানুষের কাছে ঋতু বদলের বার্তা নিয়ে আসছে।
শহরের পরিস্থিতি
শহরে দিনের বেলায় গরমের অনুভূতি পুরোপুরি চলে যায়নি। তবে সন্ধ্যার পর খোলা জায়গায় গেলে বাতাসে ঠান্ডা ভাব টের পাওয়া যাচ্ছে। দিনের ব্যস্ততা শেষে বাইরে বের হওয়া মানুষ সন্ধ্যার বাতাসে কিছুটা স্বস্তি পাচ্ছেন। বিশেষ করে খোলা জায়গায় বাতাসের সংস্পর্শে এলে দিনের গরমের তুলনায় আবহাওয়া আরামদায়ক মনে হচ্ছে। যদিও শহরের সব এলাকায় একই রকম পরিস্থিতি নেই, সন্ধ্যার পর বাতাসের এই পরিবর্তন গরমের অস্বস্তি কমার অনুভূতি তৈরি করছে। রাজধানীতে সন্ধ্যার পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা, মতিঝিল, রমনা, সোহরাওয়ার্দী উদ্যান, আগারগাঁও এর দিকের খোলা জায়গায় এই অনুভূতি বেশি পাওয়া যাচ্ছে।
এল নিনোর প্রভাব
বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার (ডব্লিউএমও) ৮ অক্টোবর প্রকাশিত বৈশ্বিক পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালের অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর সময়ে এল নিনোর প্রভাব আরও শক্তিশালী হতে পারে। ডিসেম্বরে এটি সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছানোর পূর্বাভাস রয়েছে। এ সময়ে বিশ্বের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি তাপমাত্রা এবং বৃষ্টিপাতের ধরনে পরিবর্তনের আশঙ্কা রয়েছে।
অপরদিকে ১৪ অক্টোবর প্রকাশিত দক্ষিণ এশিয়ার মৌসুমি জলবায়ু পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর সময়ে বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার অধিকাংশ এলাকায় সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন তাপমাত্রা স্বাভাবিকের সমান অথবা তার চেয়ে বেশি থাকতে পারে। তবে এই মৌসুমি পূর্বাভাসের অর্থ এই নয় যে প্রতিদিনই তাপমাত্রা বেশি থাকবে।