‘হালখাতা’ আমাদের গ্রাম-বাংলার ঐতিহ্য। বৃহস্পতিবার (১৩ এপ্রিল) এই হালখাতার আয়োজন করে গ্রাম-বাংলার ঐতিহ্যকেই ধারণ করেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। চৈত্র সংক্রান্তির এই দিনে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সব অফিসকে সাজানো হয়েছে বাঙালি সাজে।
ঢাকার কর অঞ্চলগুলোর পাশাপাশি সারাদেশের কর, ভ্যাট ও কাস্টমস অফিসগুলোতে বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত হয় ‘রাজস্ব হালখাতা’। এনবিআরের কয়েকটি কর অঞ্চল ঘুরে দেখা গেছে, হালখাতায় যোগ দিতে করদাতারা এসে বকেয়া পরিশোধ করেছেন, অনেকে আবার আগেই কর পরিশোধ করে এসেছেন হালখাতার মিষ্টি খেতে। এনবিআরের নিমন্ত্রণে হালখাতায় যোগ দিয়েছেন বড় বড় শিল্পোদ্যোক্তারাও।
এনবিআর চেয়ারম্যান মো. নজিবুর রহমান নববর্ষে বকেয়া রাজস্ব আহরণে এই ‘হালখাতা’ আয়োজনের উদ্যোগ নিয়েছেন এ বছর। এনবিআর সূত্রে জানা গেছে, এনবিআরের বৃহৎ করদাতা ইউনিটের (এলটিইউ) অধীনে ১ হাজার ১৪১ বৃহৎ করদাতা ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান রয়েছে। চলতি বছর এলটিইউয়ের আদায়যোগ্য ৫শ কোটি টাকার বকেয়ার বিপরীতে মার্চ পর্যন্ত আদায় হয়েছে প্রায় সাড়ে ৩শ কোটি টাকা। বাকি কর আদায়েই ব্যতিক্রমী ‘রাজস্ব হালখাতার’ আয়োজন করা হয়েছে। চৈত্র সংক্রান্তির দিনে এই আয়োজনের স্লোগান রাখা হয়েছে ‘বকেয়া কর আদায় নয়, পরিশোধ’।
মেটলাইফ অ্যালিকোর প্রতিনিধি রওশন হোসেন এসেছিলেন এই হালখাতায়। ১ কোটি ৬৭ লাখ টাকা বকেয়া রাজস্ব দিতে এসে তিনি বলেন, ‘এমন উৎসবমুখর পরিবেশে প্রথমবারের মতো বকেয়া কর দিলাম। এনবিআরের এমন আয়োজন দেখে আমরা মুগ্ধ হয়েছি।’
এলটিইউতে হালখাতার বেশ কয়েকদিন আগেই বাংলাদেশ থাই অ্যালুমিনিয়ামের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জাহিদ মালেক ৩ কোটি ৬১ লাখ টাকা বকেয়া রাজস্ব পরিশোধ করেছেন। তিনিও এসেছেন হালখাতায়, মিষ্টি খেতে।
হালখাতার এই আয়োজন করতে এনবিআরের ভবনগুলো সাজানো হয়েছে গ্রামীণ উপকরণে। মাটির হাড়ি, কলা গাছ, কুলা, হাতপাখা, মুখোশে ভবনগুলো পেয়েছে নতুন রূপ। এনবিআরের মূল ভবনে ঢুকতেই চোখে পড়ছে বিশালকৃতির হাতির শুঁড় দিয়ে সাজানো গেট। করদাতাদের জন্য খোলা হয়েছে হালখাতার ঐহিত্যবাহী নতুন রেজিস্ট্রার খাতা। মাটির সানকিতে দেওয়া হয়েছে মিষ্টি, বাতাসা, নারিকেলের নাড়ু, সন্দেশ, খৈ, কদমা, মুরালি, নিমকি, মুড়ির মোয়া, চিড়ার মোয়া, তিলের খাজা, সুন্দরী পাকন পিঠা, শাহী পাকন পিঠা, নকশি পিঠা, ঝিনুক পিঠা, রসগোল্লা, দই, ডাবের পানি, তরমুজ, পেয়ারা, বরই।
হালখাতার মাধ্যমে সম্পর্ক আরও সুদৃঢ় করা ও রাজস্ববান্ধব পরিবেশ তৈরির লক্ষ্যে এলটিইউ’র সম্মেলন কক্ষে ‘রাজস্ব হালখাতা’ বিষয়ে এক আলোচনা সভাও অনুষ্ঠিত হয়। এলটিইউর কর কমিশনার মো. আলমগীর হোসেনের সভাপতিত্বে সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন স্বাস্থ্য ও পরিকল্পনা কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী জাহিদ মালেক এবং বিশেষ অতিথি ছিলেন এফবিসিসিআই সভাপতি আব্দুল মাতলুব আহমাদ।
ব্যতিক্রমী রাজস্ব হালখাতার এই আয়োজনের জন্য জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে ধন্যবাদ জানান প্রধান অতিথি জাহিদ মালেক। নতুন বছরে কর প্রদানের মাধ্যমে ব্যবসায় আরও গতিশীলতা আসবে বলে মন্তব্য করেন তিনি। তিনি বলেন, ‘চিকিৎসক ও আইনজীবী ছাড়াও আরও অনেক পেশাজীবীই তাদের আয় অনুযায়ী কর দেন না। এ বিষয়গুলো এনবিআরকে খতিয়ে দেখতে হবে। এছাড়া, দেশের ছয় হাজার হাসপাতাল ও ক্লিনিক থেকেও আয়কর আদায় করা যেতে পারে।’ বাংলার ঐতিহ্য নববর্ষে এমন ব্যতিক্রমী আয়োজনের জন্য প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে এনবিআরকে ধন্যবাদ জানান তিনি।
সভায় আব্দুল মাতলুব আহমাদ বলেন, ‘কর ফাঁকির দিন শেষ। এখন ব্যবসায়ী ও এনবিআর কর্মকর্তারা অনেক বেশি স্বচ্ছ। রাজস্ব হালখাতার মাধ্যমে এনবিআর-ব্যবসায়ীদের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সর্ম্পক আরও দৃঢ় হবে। রাজস্ব হালখাতা আয়োজনের মধ্য দিয়ে এনবিআর তার বাঘের চেহারা থেকে ফুলের চেহারা ধারণ করছে। সেজন্য এনবিআরকে ধন্যবাদ।’ রাজস্ব হালখাতার মাধ্যমে এনবিআরের প্রতি ব্যবসায়ী ও করদাতাদের আস্থা আরও বাড়বে।
চৈত্র সংক্রান্তিতে এনবিআরের আহ্বানে রাজস্ব হালখাতায় অংশগ্রহণের জন্য করদাতাদের ধন্যবাদ জানান এলটিইউ কমিশনার মো. আলমগীর হোসেন। তিনি বলেন, ‘এর মধ্য দিয়ে নতুন ও আস্থার সর্ম্পক তৈরি হবে, যাতে করে করদাতাদের ভয়-ভীতি দূর হবে।’
অনুষ্ঠানে অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব আব্দুর রউফ, যুগ্ম সচিব আশরাফুন্নেছা, সিআইসি’র মহাপরিচালক মো. বেলাল উদ্দিন, ব্যাংক এশিয়ার ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আরফান আলী, ন্যাশনাল হাউজিং ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. খলিলুর রহমানসহ ব্যবসায়ী প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
আরও পড়ুন-
বৃহস্পতিবার এনবিআরের ‘হালখাতা’
/জিএম/টিআর/








