নতুন বছরে অর্থনীতির ৮ চ্যালেঞ্জ

শফিকুল ইসলাম
০৩ জানুয়ারি ২০১৬, ০৭:৩৬আপডেট : ০৩ জানুয়ারি ২০১৬, ১৬:৪৩

নতুন বছরে অর্থনীতির ৮ চ্যালেঞ্জ বছরের শুরুতে নানা রকম চাপ সামলেও ২০১৫ সালে দেশের অর্থনীতি এগিয়েছে। বছরটির শুরুতে রাজনৈতিক অস্থিরতা, তৈরি পোশাক খাতে জিএসপি না পাওয়া, প্রত্যাশা অনুযায়ী জনশক্তি রফতানি না হওয়ায় অর্থনীতির ওপর চাপ ছিল বেশ। সেই চাপ সামলে দেশের অর্থনীতি এখন অনেকের কাছেই হিংসার কারণ। জিডিপি প্রবৃদ্ধির বিষয়ে বিশ্বব্যাংক, এডিবি (এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক), আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) নেতিবাচক মন্তব্যের পরেও এগিয়ে চলেছে দেশের অর্থনীতি। যদিও পরে এডিবি ও বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশের অর্থনীতি সম্পর্কে তাদের ধারণা পাল্টিয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম অস্বাভাবিক হারে কমে যাওয়ার বিপরীতে দেশে গ্যাস-বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি, ঋণের উচ্চসুদ হার ও অবকাঠামোগত সুযোগ-সুবিধার ঘাটতিতে মনোপুত বিনিয়োগ না হওয়াসহ নানা ধরনের জটিলতা কাটিয়ে নতুন বছরের জন্য অর্থনীতির এই অগ্রযাত্রা অব্যাহত রাখতে আট চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার সক্ষমতা অর্জনের বিষয়ে গুরুত্ব দিয়েছেন বিশ্লেষকরা।
বিশ্লেষকদের মতে, নতুন বছরের অর্থনীতির এই অগ্রযাত্রা ঠিক রাখতে চলমান অর্থনীতির সকল সূচকের গতি ঠিক রাখতে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চতকরণের পাশাপাশি মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখা জরুরি বলে মনে করেন তারা। একই সঙ্গে দেশে রেমিটেন্স প্রবাহ ঠিক রাখতে বিশ্বে নতুন শ্রমবাজার খুঁজে বের করার কথাও বলেছেন অনেকে। তাদের মতে, ২৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার পরিমাণের আকাশসম রিজার্ভের সুষ্ঠু ব্যবহার নিশ্চিত করতে সঠিক ম্যানেজমেন্ট প্রয়োজন। তবে, দেশি-বিদেশি নতুন বিনিয়োগ, বিশেষ করে বেসরকারি বিনিয়োগ না হলে জিডিপি প্রবৃদ্ধি কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছানো সম্ভব নয় বলেও জানান তারা। তাদের মতে, নতুন-নতুন দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াতে গ্যাস ও বিদ্যুতের সরবরাহ বাড়ানোসহ অবকাঠামো উন্নয়ন প্রয়োজন। একই সঙ্গে নতুন নতুন রফতানিযোগ্য পণ্য সৃষ্টির পাশাপাশি বিশ্বে বাংলাদেশি পণ্যের বাজার সৃষ্টির দিকেও নজর বাড়ানোর তাগিদ দিয়েছেন তারা।

বিশ্লেষকদের মতে, এই চ্যালেঞ্জগুলো মোকবিলায় সরকার সক্ষমতা অর্জনের ওপর নির্ভর করছে আগামী দিনের অর্থনীতি। পাঁচবছর মেয়াদি এই সরকারের তৃতীয় বছর শুরু হচ্ছে আগামী ৫ জানুয়ারি। শেষ হবে ২০১৭ সালের ৪ জানুয়ারি। সরকার এর আগে পার করেছে নতুন মেয়াদের দুই বছর। সামনে বাকি আছে আরও দুই বছর। মেয়াদের মধ্যে এই একবছরের সাফল্যের ওপর নির্ভর করছে সরকারের পুরো অর্থনীতিক সাফল্য।

বাংলাদেশ ব্যাংক ও অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ২০০৮-০৯ অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি হয়েছিল ৫ দশমিক ০৫ শতাংশ। সেখানে সর্বশেষ অর্থবছর ২০১৪-১৫ এর ৬ দশমিক ৫১ শতাংশসহ গত ছয় অর্থবছরে গড়ে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৬ দশমিক ২ শতাংশ। বিশ্ব অর্থনীতিতে প্রবৃদ্ধি মন্দার পরিবেশেও অব্যাহতভাবে গড়ে ৬ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি অর্জন দেশে-বিদেশে যদিও প্রশংসিত হয়েছে, তার পরেও সরকার কাঙ্ক্ষিত ৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে পারছে না।

বাংলাদেশ ব্যাংক বিচক্ষণ মুদ্রানীতি দিয়ে মূল্যস্ফীতির হারকে নিয়ন্ত্রণ করছে। ইতোমধ্যেই এতে অনেকটাই সাফল্য এসেছে। ২০১১’র পর থেকে মূল্যস্ফীতির হার ধারাবাহিকভাবে কমছে। বার্ষিক গড় মূল্যস্ফীতি ২০১৪ সালের ডিসেম্বর ৬ দশমিক ৯৯ ও জুন ২০১৫ তে ৬ দশমিক ৪ শতাংশ থেকে আরও কমে নভেম্বর ২০১৫ শেষে তা ৬ দশমিক ২ শতাংশে নেমে এসেছে, যা সন্তোষজনক ও সহনীয়। এই অঞ্চলের মধ্যে বাংলাদেশের মূল্যস্ফীতির উত্থান-পতন সর্বনিম্ন—যা বিদেশি বিনিয়োগকারী আকর্ষণে সামষ্টিক স্থিতিশীলতার শক্তিশালী ভিতের পরিচায়ক বলে মনে করে বাংলাদেশ ব্যাংক। মুল্যস্ফীতির এই নিম্নগামী প্রবাহকে অব্যাহত রাখা সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।

২০০৮-০৯ অর্থবছরে মোট রফতানি আয় হয়েছে ১৫ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার, সেখানে গত অর্থবছরে মোট রফতানি আয় হয়েছে ৩১ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় ৩ দশমিক ৪ শতাংশ বেশি। চলতি অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসে রফতানি আয় হয়েছে ১২ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলার, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ৬ দশমিক ৭ শতাংশ বেশি। চাঙ্গা অর্থনীতির জন্য রফতানি আয় বৃদ্ধি জরুরি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব মতে, ২০০৮-০৯ অর্থবছরে রেমিট্যান্স এসেছিল ৯ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে রেকর্ড ১৫ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স আসে। আর চলতি অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসে রেমিট্যান্স এসেছে ৬ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের সমান। বাংলাদেশ ব্যাংকের নানা প্রণোদনা ও প্রচারণা, রেমিট্যান্স বিতরণের নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ ও প্রদান পদ্ধতি সহজ ও গতিশীল করা এবং স্থিতিশীল টাকার মূল্য রেমিট্যান্সে সাফল্য ধরে রাখতে অবদান রেখেছে বলে মনে করে বাংলাদেশ ব্যাংক।

বাংলাদেশ ব্যাংক মনে করে, দেশের অর্থনীতিতে কৃষির গুরুত্ব অপরিসীম। এটিকে বিবেচনা করে এ খাতের উন্নয়নে সরকারের উদ্যোগের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে বাংলাদেশ ব্যাংক প্রতিবছর কৃষি ঋণ নীতিমালা প্রণয়নসহ কৃষকবান্ধব নানা উদ্যোগ গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করছে। দেশি-বিদেশি সব ব্যাংককেই এখন কৃষি খাতে ঋণ দিতে হয়, কৃষকদের পাশে দাঁড়াতে হয়। অর্থনীতিকে সামনে এগিয়ে নিতে এ কার্যক্রমকে সচল রাখা একটি বড় চ্যালেঞ্জ বলে মনে করেন অনেকে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য মতে, গত অর্থবছরে কৃষি ঋণ বিতরণ করা হয়েছে ১৬ হাজার ৩৭ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরে কৃষি ঋণ বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ১৬ হাজার ৪০০ কোটি টাকা, যার বিপরীতে অক্টোবর ২০১৫ পর্যন্ত বিতরণ ৪ হাজার ৬৩১ কোটি টাকা বা ২৮ শতাংশ।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে অর্থনীতিবিদ ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ড. এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, সরকারকে অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে বিনিয়োগের পাশাপাশি, অলস টাকার মুভমেন্ট জরুরি। রেমিটেন্স প্রবাহ ঠিক রাখতে হবে। এর জন্য নতুন নতুন শ্রমবাজার খুঁজে বের করতে হবে। বিনিয়োগ উৎসাহিত করতে গ্যাস বিদ্যুতের সরবরাহ বাড়াতে হবে। চট্টগ্রাম, মংলা ও পায়রা সমুদ্র বন্দরের আধুনিক সুযোগ-সুবিধা বাড়ানোসহ অবকাঠামো উন্নয়ন জরুরি। শিল্পভিত্তিক অর্থনৈতিক অঞ্চল গঠনও জরুরি বলে মনে করেন মির্জ্জা আজিজ। তিনি যোগাযোগ খাতে কানেকটিভিটি বাড়ানোরও পরামর্শ দিয়েছেন।

এ প্রসঙ্গে অর্থনীতিবিদ ড. তৌফিক আহমেদ বাংলা ট্রিবিউনকে জানিয়েছেন, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৬ শতাংশ থেকে ৭ শতাংশে উন্নীত করতে চাইলে বিনিয়োগের কোনও বিকল্প নেই। আর বিনিয়োগ বাড়ানোর জন্য সবাই শুধু বড়-বড় অবকাঠামো গড়ার কথা বলেন। যা আমি মনে করি না। আমি মনে করি, এসএমইকে গুরুত্ব দিয়ে ব্যাংকিং কার্যক্রম বাড়ানোর মধ্য দিয়ে এ বিনিয়োগ বাড়ানো সম্ভব। আর এটি করতে পারলেই জিডিপি প্রবৃদ্ধি বাড়বে বলে মনে করেন তিনি। একটি একটি বড় চ্যালেঞ্জ বলেও মনে করেন তিনি।

জানতে চাইলে অর্থনীতিবিদ ড. মোস্তফা কে মুজেরী বাংলা টিব্রিউনকে জানান, সরকারি বিনিয়োগ সন্তোষজনক হলেও দেশে বেসরকারি বিনিয়োগ পরিস্থিতি ভালো নয়। এক কথায় হতাশাজনক। সত্যি কথা বলতে বেসরকারি বিনিয়োগে আকৃষ্টে আমরা কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছতে পারিনি। জিডিপি প্রবৃদ্ধি বাড়াতে বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানোর বিষয়ে নজর দিতে হবে। এর জন্য রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা প্রয়োজন। আকাশসম রিজার্ভের বিষয়ে তিনি বলেছেন, বর্তমানের রিজার্ভ দেশের অর্থনীতিকে একটা শক্ত ভিত্তি দিয়েছে এ কথা ঠিক। তবে এই ভিত্তির ওপর কিছু না কিছু তো দাঁড় করাতে হবে। তাই আপনি এই ভিত্তির ওপর কী দাঁড় করাবেন তা আপনাকেই ঠিক করতে হবে। শুধু ভিত্তি হলেই তো হবে না। তবে রিজার্ভ কে সঠিকভাবে ব্যবহার করতে একটা শক্ত ম্যানেজমেন্ট জরুরি বলে মনে করেন তিনি।   

এ বিষয়ে অগ্রণী ব্যাংকের চেয়ারম্যান অর্থনীতিবিদ ড. জায়েদ বখত বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, অনেকদিন ধরেই আমাদের জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ৬ শতাংশের ঘরেই ঘুরপাক খাচ্ছে। এটিকে কাঙ্ক্ষিত ৭ শতাংশে উন্নীত করতে চাইলে বেসরকারি বিনিয়োগ উৎসাহিত করতে হবে। আর বেসরকারি বিনিয়োগ উৎসাহিত করতে হলে বিদ্যুৎ, গ্যাস, যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নসহ সরকারের ৭ মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন জরুরি। এ প্রকল্পগুলোর শতভাগ বাস্তবায়ন হলে বেসরকারি বিনিয়োগ আকৃষ্ট হবে। তাই এই প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়নই বড় চ্যালেঞ্জ বলে মনে করেন ড. জায়েদ বখত।

/এমপি/এমএনএইচ/

সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
হবিগঞ্জে নারীর মুখে এসিড নিক্ষেপ, আশঙ্কাজনক অবস্থায় ঢাকায় প্রেরণ
হবিগঞ্জে নারীর মুখে এসিড নিক্ষেপ, আশঙ্কাজনক অবস্থায় ঢাকায় প্রেরণ
বগুড়ায় দই বিক্রি করে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা গুনলেন ব্যবসায়ী 
বগুড়ায় দই বিক্রি করে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা গুনলেন ব্যবসায়ী 
৩৮ বছর বাড়ি ফিরে বিপদে জবেদ, স্ত্রী বললেন স্বামী হিসেবে মেনে নেওয়া সম্ভব নয়
৩৮ বছর বাড়ি ফিরে বিপদে জবেদ, স্ত্রী বললেন স্বামী হিসেবে মেনে নেওয়া সম্ভব নয়
বিপর্যয়ের মুখে সুন্দরবন
বিপর্যয়ের মুখে সুন্দরবন
সর্বাধিক পঠিত
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ
দায়িত্ব ছাড়ার প্রসঙ্গে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর উদাহরণ টানলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী
দায়িত্ব ছাড়ার প্রসঙ্গে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর উদাহরণ টানলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী
যুদ্ধবিরোধী প্রস্তাব পাসের পর এবার কী ঘটবে ইরানে
যুদ্ধবিরোধী প্রস্তাব পাসের পর এবার কী ঘটবে ইরানে
শিশু রামিসা হত্যাকাণ্ড: নিজেকে নির্দোষ দাবি ডলারের
শিশু রামিসা হত্যাকাণ্ড: নিজেকে নির্দোষ দাবি ডলারের
আপা ডাকায় নয়, বাসি মিষ্টি পাওয়ায় জরিমানা করেছি
সংবাদ সম্মেলনে ইউএনও মুনমুন নাহার আশাআপা ডাকায় নয়, বাসি মিষ্টি পাওয়ায় জরিমানা করেছি