সরকার নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণের কাজ শুরু করেছে। এ জন্য সরকারের বিপুল পরিমাণ অর্থের প্রয়োজন হবে। পদ্মা সেতুর জন্য জাতীয় বাজেটে বরাদ্দের পাশাপাশি ব্যাংক থেকেও সরকার কিছু অর্থ নিতে চায়। প্রচলিত ব্যাংকের পাশাপাশি ইসলামি ব্যাংকগুলো থেকেও অর্থ নেওয়ার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। এ কারণে ইসলামি বিনিয়োগ বন্ডকে আরও আকর্ষণীয় করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এরই অংশ হিসাবে ইসলামি বিনিয়োগ বন্ড জনপ্রিয় করার উদ্যোগ নিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
ইতোমধ্যে ইসলামি বিনিয়োগ বন্ড নীতিমালা সংশোধন করা হয়েছে। ইসলামি ব্যাংকগুলোর পাশাপাশি সাধারণ সঞ্চয়কারীরাও যেন এই বন্ডে বিনিয়োগ করতে পারে সে জন্য ‘ইসলামি বন্ড’ জনপ্রিয় করতে বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এই উদ্যোগের অংশ হিসেবে বৃহস্পতিবার (৪ জানুয়ারি) একটি সার্কুলারও জারি করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সার্কুলারে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ সরকার ইসলামি বিনিয়োগ বন্ড (ইসলামি বন্ড) এর বিনিয়োগ কার্যক্রমকে গতিশীল ও আধুনিক করার লক্ষ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক ইসলামি বন্ড সিস্টেম (আইবিএস) প্রবর্তন করা হয়েছে। উক্ত সিস্টেমে ইসলামি বন্ডের ডিপোজিটরি, নিলামে বিড দাখিলের জন্য অনলাইন প্লাটফরম, ইসলামি বন্ড ইস্যু, মেয়াদপূর্তিতে আসল পরিশোধ, মুনাফা বণ্টন এবং ইসলামি বন্ড ফান্ড হতে তহবিল গ্রহণের সুবিধা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
জানা গেছে, প্রচলিত ব্যাংকগুলোর মতো ইসলামি ব্যাংকগুলোর হাতেও এখন বিপুল পরিমাণ অর্থ পড়ে রয়েছে। আবার ধর্মীয় বিশ্বাসের কারণেও অনেক সঞ্চয়কারী ‘ইসলামি বন্ডে’ বিনিয়োগ করতে চান। কিন্তু নানা প্রতিবন্ধকতার কারণে এই বন্ড ব্যাংক ও সঞ্চয়কারীদের কাছে আকর্ষণীয় হয়নি। দীর্ঘ মেয়াদ, বিনিয়োগের মুনাফা তুলনামূলক কম হওয়ায় ইসলামি ব্যাংকগুলো এ বন্ডে তুলনামূলক কম বিনিয়োগ করে থাকে। কিন্তু ভবিষ্যতে ইসলামি বিনিয়োগ বন্ডের মাধ্যমে সরকার বিপুল পরিমাণ ঋণ নিতে চায়। এ কারণে জন সাধারণের কাছে এই বন্ডকে জনপ্রিয় করার চেষ্টা চলছে।
এ প্রসঙ্গে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, বিভিন্ন বন্ডে সরকার প্রচলিত ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে যে পরিমাণ অর্থ নিয়ে রেখেছে, যার ফলে ব্যাংক একটা সময় বিনিয়োগকারীদের কাছে ঋণ দিতে পারেনি। এখন ব্যাংকগুলোর ঋণ দেয়ার সামর্থ্য হলেও অধিকাংশ টাকা আটকে রয়েছে বিভিন্ন বন্ডের। এ কারণে সরকার ইসলামি বন্ড থেকে টাকা নিতে চায়। এরই অংশ হিসাবে ইসলামি বন্ডকে জনপ্রিয় করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এ প্রসঙ্গে বলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক শুভঙ্কর সাহা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ট্রেজারি বন্ডের মতো সরকার এই বন্ড থেকেও অর্থ নিতে পারে। যখন সরকারের প্রয়োজন হবে তখন এই বন্ড থেকে ঋণ নেবে। আবার যখন ফেরত দিতে চাইবে নিয়ম অনুযায়ী তখন ফেরত নেওয়া হয়। তিনি বলেন, ইসলামি বিনিয়োগ বন্ড জনপ্রিয় করার উদ্যোগটি অনেকটা পুরনো। তবে, এই বন্ড যত জনপ্রিয় হবে ততই ইসলামি ব্যাংকগুলোর জন্য সুবিধা হবে। পাশাপাশি সরকারও এখান থেকে অর্থ নিতে পারবে।
সরকার তার বাজেট ঘাটতি মেটাতে ব্যাংকিং খাত থেকে যে পরিমাণ ঋণ নেয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে তা শুধু প্রচলিত ব্যাংক থেকে উত্তোলন করা হয়। এতে সময়ে সময়ে তহবিল সংকটে পড়ে প্রচলিত ব্যাংকগুলো। সংকট মেটাতে বাংলাদেশ ব্যাংক প্রচলিত ব্যাংকগুলোকে বিশেষ তারল্য সহায়তার আওতায় ধার দিয়ে থাকে। অনেক সময় সরকারের ঋণের জোগান দিতে গিয়ে প্রচলিত ব্যাংকগুলো সাধারণ বিনিয়োগকারীদের ঋণ দিতে অপারগ হয়। সরকারের কম সুদে ঋণের জোগান দেওয়া হয়। এটা সমন্বয় করতে শিল্পঋণসহ বিভিন্ন ধরনের ঋণের সুদের হার বেড়ে যায়। নীতিমালা চূড়ান্ত হওয়ায় ঋণ গ্রহণে প্রচলিত ব্যাংকের ওপর সরকারের চাপ কমবে।
উল্লেখ্য, সাধারণ সঞ্চয়কারীরাও এই বন্ড কিনতে পারেন। এর বিপরীতে সরকারের শতভাগ গ্যারান্টি রয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে নিলামের মাধ্যমে এই বন্ডগুলো বিক্রি করা হয়। ইসলামি শরিয়া ভিত্তিতে পরিচালিত ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, যেসব ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ইসলামি ব্যাংকিং শাখা বা ইউনিট রয়েছে তারা এসব বন্ড কিনতে পারে। এ ছাড়া, ওই সব ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এসব বন্ড যে কোনও ব্যক্তিও কিনতে পারেন। এই বন্ডের মালিক সরকারের অর্থ মন্ত্রণালয়। তাদের পক্ষে বাংলাদেশ ব্যাংক বন্ডটি পরিচালনা করে। এই বন্ড সর্বনিম্ন ১ লাখ টাকার কিনতে হয়। মূলত মাঝারি ধরনের সঞ্চয়কারীরা এই বন্ডে বিনিয়োগ করতে পারেন।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সার্কুলারে আরও বলা হয়েছে, ইসলামি বন্ড সিস্টেমের ডিপোজিটরিতে বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক প্রদত্ত ISIN (International Securities Identification Number) অনুসারে সকল ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও অন্য বিনিয়োগকারীদের ধারণকৃত ইসলামি বন্ডের স্থিতি সংরক্ষিত থাকবে । আইবিএস সিস্টেমের মাধ্যমে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো ইসলামি বন্ড ক্রয় ও ইসলামি বন্ড ফান্ড থেকে তহবিল গ্রহণ সম্পর্কিত কার্যক্রম সম্পাদন করতে পারবে।
এ অবস্থায় ইসলামি বন্ড ক্রয় সংক্রান্ত কার্যক্রমে গতিশীলতা আনয়নের লক্ষ্যে ইসলামি বন্ডে বিনিয়োগকারীদের স্কিম ব্যবহারের পরিবর্তে সিস্টেম থেকে পাওয়া System Generated Advice ব্যবহার করার নির্দেশনা দেওয়া হলো। এ প্রসঙ্গে শুভঙ্কর সাহা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, এই সার্কুলার মূলত অটোমেশিনের জন্য দেওয়া হয়েছে। দ্রুত সঙ্গে এটি কাজ করবে। এই পদ্ধতিতে ব্যাংকিং সিস্টেম ডিজিটাল করার ক্ষেত্রে আরও এক ধাপ এগিয়ে গেল।
এর আগে ২০১৪ সালে ২ সেপ্টেম্বর ইসলামি বন্ড নীতিমালা সংশোধন করে সরকার। তখন থেকে দেশের যেকোনও ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান শরিয়াভিত্তিক ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে বাংলাদেশ ব্যাংকের এই বন্ডে বিনিয়োগ করতে পারেন। তবে অনাবাসীরাও শর্তসাপেক্ষে বিনিয়োগের যোগ্যতা রাখেন। এক লাখ টাকা বা তার যেকোনও গুণিতক মূল্যের অভিহিত মূল্যে তিন মাস ও ছয় মাস মেয়াদে বন্ড বিক্রি হবে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকসূত্র জানায়, দীর্ঘ দিন ধরে সরকারের ট্রেজারি বিল ও বন্ড সুদভিত্তিক হওয়ায় ইসলামি ব্যাংকগুলো সরকারের ঋণের আওতামুক্ত ছিল। তবে ইসলামি বন্ড নীতিমালা সংশোধন করার পর থেকে ইসলামি ব্যাংকগুলোর কাছ থেকেও সরকার ঋণ নিতে পারে।
নিয়ম অনুযায়ী, ইসলামি ব্যাংকগুলো একটি প্রকল্পের মাধ্যমে মুনাফাভিত্তিক ইসলামি বন্ডে বিনিয়োগ করে। এর মাধ্যমে ব্যাংকগুলো সংবিধিবদ্ধ তারল্যের হার (এসএলআর) দেবে। সব ধরনের ট্রেজারি বিল ও বন্ডের মালিক সরকার, তাই এ বন্ডের মাধ্যমে সরকার ঋণও নিতে পারে। একইসঙ্গে কোনও ব্যাংকে নগদ টাকার সমস্যা হলে সংকট মেটাতে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক বন্ড বন্ধক রেখে বাংলাদেশ ব্যাংক পরিচালিত ইসলামি তহবিল থেকে ধার নিতে (রেপো) পারে।
/এমএনএইচ/আপ-এআর/







