গত ছয় মাসের ব্যবধানে রাজধানীর বাজারগুলোতে নিত্য প্রয়োজনীয় বেশ কিছু পণ্যের দাম বেড়েছে। বিশেষ করে ডিম, কয়েক ধরনের সবজি ও মাছের দামে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে। তবে মুরগির দাম কিছুটা বাড়লেও গরুর মাংসের দামে বড় কোনো পরিবর্তন হয়নি। একই পণ্যের দাম বাজারভেদে ১০ থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত পার্থক্যও দেখা গেছে।
শুক্রবার (৪ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর বিভিন্ন বাজার ঘুরে ছয় মাস আগের বাজারদরের সঙ্গে বর্তমান দামের তুলনায় এমন চিত্র পাওয়া গেছে।
সবজিতে বড় পরিবর্তন
ছয় মাস আগে শীতকালীন সবজির সরবরাহ বেশি থাকায় বেশির ভাগ সবজির দাম তুলনামূলক কম ছিল। এখন মৌসুম পরিবর্তনের কারণে কিছু সবজির দাম বেড়েছে।
বাজারে দেখা যায়, বর্তমানে লম্বা বেগুন ৭০ টাকা এবং গোল বেগুন ১০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। মার্চের শুরুতে বেগুনের দাম ছিল ৬০ থেকে ৮০ টাকা। অর্থাৎ ধরনভেদে দাম বেড়েছে ২০ থেকে ৩০ টাকা।
ছয় মাস আগের তুলনায় কিছুটা কমেছে করলার দাম, সবজিটি বিক্রি হচ্ছে এখন ৮০ টাকা কেজি দরে; যা মার্চে ছিল প্রায় ১০০ টাকা। আর বরবটি বিক্রি হচ্ছে ৮০ টাকা কেজি দরে। ছয় মাস আগে শীতকালীন সবজির সরবরাহ বেশি থাকায় এর দাম তুলনামূলক কম ছিল।
হাইব্রিড জাতের শসা বর্তমানে ৫০ থেকে ৬০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে, আর দেশি শসা ৮০ থেকে ১০০ টাকা কেজি। মার্চে হাইব্রিড শসার দাম ছিল ৪০ থেকে ৫০ টাকা। টমেটোর দাম বেড়েছে সবচেয়ে বেশি। এখন ১২০ থেকে ১৪০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হলেও মার্চে ছিল ৩০ থেকে ৪০ টাকা।
আগাম শিমের দাম এখন ১৮০ থেকে ২০০ টাকা কেজি। মার্চে সরবরাহ বেশি থাকায় এর দাম কম ছিল। পটোল, ঢেঁড়স, কাঁকরোলসহ কয়েক ধরনের সবজি বর্তমানে ৬০ থেকে ৮০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে, যা ছয় মাস আগে কম ছিল।
পেঁপের দাম অবশ্য প্রায় একই রয়েছে। এখন প্রতি কেজি ৪০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। কাঁচা মরিচের দামও বেড়েছে। বর্তমানে ১৬০ টাকা কেজি, গত সপ্তাহে ছিল ১২০ টাকা। মার্চের শেষ দিকে কাঁচা মরিচের দাম ছিল ৮০ থেকে ১০০ টাকা।
শাকের বাজারেও দামে পার্থক্য রয়েছে। লালশাক ও কলমিশাক ২০ টাকা আঁটি, ডাঁটাশাক ৩০ থেকে ৪০ টাকা, পুঁইশাক ৩০ থেকে ৫০ টাকা, লাউশাক ৪০ থেকে ৬০ টাকা এবং কচুশাক ২৫ থেকে ৩০ টাকা আঁটি বিক্রি হচ্ছে।
বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মৌসুমভেদে এ সবজির দামে ওঠানামা থাকে।
ডিমে ৫০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে
ছয় মাসের ব্যবধানে ডিমের দামেও বড় পরিবর্তন এসেছে। বর্তমানে এক ডজন ডিম ১৫০ টাকা এবং চারটি ৫০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। খুচরা পর্যায়ে দাম আরও বেশি। মার্চে প্রতি ডজন ডিমের দাম ছিল ১১০ থেকে ১২০ টাকা। অর্থাৎ ছয় মাসে ডজনে দাম বেড়েছে প্রায় ৪৫ থেকে ৫০ টাকা।
ডিম বিক্রেতা মাসুম বলেন, ফার্মের মুরগির ডিম চারটি ৫০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। দাম নিয়মিত বাড়ছে, কমার কোনো লক্ষণ নেই।
মুরগিতে কিছুটা বাড়তি দাম
ব্রয়লার মুরগি বর্তমানে ১৯০ টাকা এবং সোনালি মুরগি ৩২০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। মার্চে ব্রয়লার মুরগির দাম ছিল ১৭০ থেকে ১৮০ টাকা এবং সোনালি মুরগি প্রায় ৩০০ টাকা। অর্থাৎ ছয় মাসে মুরগির দাম কিছুটা বেড়েছে।
অন্যদিকে গরুর মাংসের দামে বড় কোনো পরিবর্তন হয়নি। বর্তমানে প্রতি কেজি ৮০০ টাকা, মার্চেও প্রায় একই দামে বিক্রি হয়েছে।
মাছেও বেড়েছে দাম
মাছের বাজারে ছয় মাসের ব্যবধানে বেশ কিছু মাছের দাম বেড়েছে। বর্তমানে তেলাপিয়া ২৫০ থেকে ২৬০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। মার্চে ছিল ২০০ থেকে ২৩০ টাকা। পাঙাশ এখন ২৩০ থেকে ২৫০ টাকা, মার্চে ছিল ১৮০ থেকে ২২০ টাকা।
রুই-কাতলার দাম বর্তমানে ৪০০ থেকে ৪৫০ টাকা। মার্চে আকারভেদে রুই মাছ ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা ছিল। তবে মাঝারি আকারের রুই এখন ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকা, যা ছয় মাস আগেও প্রায় একই ছিল। বড় রুইয়ের দাম ৪৫০ থেকে ৫০০ টাকা।
চিংড়ি বর্তমানে ১ হাজার থেকে ১ হাজার ৩০০ টাকা কেজি। ছয় মাস আগে তুলনামূলক কম ছিল। তবে আকার ও মানভেদে এ মাছের দামে বড় পার্থক্য রয়েছে। পাবদা ৪০০ থেকে ৪৫০ টাকা, যা ছয় মাস আগেও প্রায় একই দামে ছিল। টেংরা প্রায় ৭০০ টাকা, ছয় মাস আগে আকার ও ধরনভেদে দাম কম ছিল।
এ ছাড়া ভেটকি ৪০০ থেকে ৫৫০ টাকা, মৃগেল ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা, বাইম ৬০০ থেকে ৮০০ টাকা এবং দেশি কই ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। চাষের কই প্রায় ৩০০ টাকা, যা ছয় মাস আগে বাজারভেদে কম ছিল। পোয়া ২৬০ টাকা এবং শোল ৭০০ টাকা কেজি, দুটির দামই ছয় মাস আগের কাছাকাছি। রূপচাঁদা, নদীর বেলে ও অন্যান্য চাহিদাসম্পন্ন দেশি মাছের দাম কেজিতে ১ হাজার টাকার বেশি।
রায়সাহেব বাজারের মাছ বিক্রেতা মঞ্জুরুল ইসলাম বলেন, মাঝারি রুই ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। নদীর বেলে ও চাহিদাসম্পন্ন দেশি মাছের দাম ১ হাজার টাকার বেশি। ছয় মাসে মাছের দাম বেড়েছে এবং বাড়তে থাকছে। মাছের আকার, মান, জীবিত বা মৃত এবং সরবরাহের ওপর দাম নির্ভর করে। একই মাছের দামও বাজারভেদে কেজিতে ১০ থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত পার্থক্য হতে পারে।
ক্রেতার চাপ কমেনি
নারিন্দা বাজারের ক্রেতা আবাবিল কবির বলেন, ছয় মাসে বাজারের চিত্র বদলে গেছে। কিছু পণ্যের দাম কমলেও ডিম, মাছ ও বেশির ভাগ সবজির দাম এখনো নাগালের বাইরে। ছয় মাস আগে ৫০০ টাকা দিয়ে কয়েকটি প্রয়োজনীয় পণ্য কেনা গেলেও এখন একই টাকায় তা সম্ভব হয় না। চাল, ডালসহ অন্যান্য খরচও বেড়েছে। ফলে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের ওপর চাপ বাড়ছে।
আরেক ক্রেতা আবু দাউদ বলেন, বেশির ভাগ সবজির দাম বেড়েছে। কিছু পণ্যে অন্তত ১০ টাকা বেশি দিতে হচ্ছে। ৮০ টাকার নিচে সবজি কমই পাওয়া যাচ্ছে। টমেটো, বেগুন ও করলার দাম ১০০ টাকার বেশি। দৈনিক ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা আয় করে মাছ, সবজি ও চালের মধ্যে কোনটি কিনবেন, সেটি ঠিক করাই কঠিন হয়ে পড়েছে। গত ছয় মাসে অধিকাংশ প্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বেড়েছে উল্লেখ করে তিনি তাদের মতো মানুষের কথা বিবেচনায় নেওয়ার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।
সব মিলিয়ে ছয় মাসের ব্যবধানে সবচেয়ে বেশি পরিবর্তন এসেছে ডিম ও মৌসুমি কয়েক ধরনের সবজির দামে। কয়েক ধরনের মাছের দামও বেড়েছে। মুরগির দাম কিছুটা বাড়লেও গরুর মাংসের দাম প্রায় অপরিবর্তিত রয়েছে। ফলে কিছু পণ্যে দাম স্থির থাকলেও নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের বাজারের চাপ কমেনি।









