শরিয়াহ বোর্ডকে স্বাধীনভাবে কাজ করার আহ্বান গভর্নরের

বাংলা ট্রিবিউন রিপোর্ট
০৭ এপ্রিল ২০২৬, ১৯:১৫আপডেট : ০৭ এপ্রিল ২০২৬, ১৯:১৫

ইসলামী ব্যাংকিং খাতে সুশাসন নিশ্চিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সুরক্ষার আশ্বাস দেশে ইসলামী ব্যাংকিং খাতে সুশাসন ও শরিয়াহ পরিপালন জোরদার করতে শরিয়াহ বোর্ডের সদস্যদের স্বাধীনভাবে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর। তিনি বলেন, শরিয়াহ বোর্ড যাতে নির্ভয়ে দায়িত্ব পালন করতে পারে, সে জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষ থেকে পূর্ণ সুরক্ষা দেওয়া হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত ‘ইসলামী ব্যাংকিংয়ের বর্তমান পরিস্থিতি, চ্যালেঞ্জ ও ভবিষ্যৎ করণীয়’ শীর্ষক মতবিনিময় সভায় সভাপতির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

সভায় বাংলাদেশ ব্যাংকের ইসলামী ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত ডেপুটি গভর্নর, নির্বাহী পরিচালক, পরিচালক ও কর্মকর্তাদের পাশাপাশি নবগঠিত বাংলাদেশ ব্যাংক শরিয়াহ অ্যাডভাইজরি বোর্ডের সদস্য, দেশের প্রায় সব ইসলামী ব্যাংকের শরিয়াহ বোর্ডের চেয়ারম্যান ও সদস্যরা অংশ নেন। এছাড়া খ্যাতিমান দাঈ, আলেম, শিক্ষাবিদ ও বিভিন্ন শ্রেণির আলেম-উলামাও সভায় উপস্থিত ছিলেন।

অতীতে তদারকির ঘাটতির কথা স্বীকার

স্বাগত বক্তব্যে গভর্নর বলেন, অতীতে ইসলামী ব্যাংকিং খাতের কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে অর্থপাচারের ঘটনা ঘটেছে। এর অন্যতম কারণ ছিল যথাযথ তদারকির অভাব।

তিনি বলেন, ইসলামী ব্যাংকিং মূলত পণ্যভিত্তিক বা অ্যাসেট-ব্যাকড কাঠামোর ওপর পরিচালিত হওয়ার কথা। এই কাঠামো যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হলে বড় ধরনের ক্ষতির সম্ভাবনা কম থাকার কথা। কিন্তু বাস্তবে কিছু ক্ষেত্রে ক্ষতি হয়েছে; যা গভীরভাবে পর্যালোচনার বিষয়।

গভর্নর আরও বলেন, ইসলামী ব্যাংকিং ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করতে শরিয়াহ বোর্ডকে ক্ষমতায়ন করা জরুরি। তাদের সিদ্ধান্ত ও দিকনির্দেশনাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। এর মাধ্যমে কার্যকর তদারকি নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।

ইসলামী ব্যাংকিং সংস্কারে বিভিন্ন প্রস্তাব

সভায় অংশ নেওয়া আলেম-উলামা ও শরিয়াহ বিশেষজ্ঞরা ইসলামী ব্যাংকিং খাতে সুশাসন ও শরিয়াহ মান্যতা জোরদারের জন্য বিভিন্ন প্রস্তাব তুলে ধরেন।

তাদের প্রস্তাবের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল– ইসলামী ব্যাংকিংয়ের তিনটি মূলনীতি নিশ্চিত করা; সুদমুক্ত ব্যবস্থা, প্রতারণামুক্ত লেনদেন এবং লাভ-ক্ষতির ঝুঁকি ভাগাভাগি; ব্যাংকগুলোর শরিয়াহ সুপারভাইজরি কমিটি, শরিয়াহ সেক্রেটারিয়েট ও শরিয়াহ অডিট ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করা; শরিয়াহ সুপারভাইজরি কমিটিকে পরিচালনা পর্ষদের প্রভাবমুক্ত রেখে স্বাধীনভাবে কাজ করার আইনি ক্ষমতা দেওয়া; বড় বিনিয়োগ অনুমোদনের ক্ষেত্রে শরিয়াহ কমিটির অন্তত তিন সদস্যের সম্মতি বাধ্যতামূলক করা; ইসলামী ব্যাংকিং খাতের জন্য পৃথক ‘ইসলামী ব্যাংকিং আইন’ প্রণয়ন; বাংলাদেশ ব্যাংকে ইসলামী ব্যাংকিং তদারকির জন্য আলাদা ডেপুটি গভর্নর ও নির্বাহী পরিচালক নিয়োগ; শরিয়াহ পরিপালনের মাত্রা নির্ধারণে শরিয়াহ কমপ্লায়েন্স রেটিং চালু করা; বছরে অন্তত একবার বহিঃস্থ শরিয়াহ নিরীক্ষা চালু করা; ইসলামী ব্যাংকগুলোর জন্য পৃথক কোর ব্যাংকিং সিস্টেম ব্যবহারের ব্যবস্থা করা।

এছাড়া ইসলামী ব্যাংকিংয়ের জন্য পর্যাপ্ত শরিয়াহসম্মত আর্থিক উপকরণ চালু করা; ইসলামী মুদ্রাবাজার শক্তিশালী করা এবং খেলাপি বিনিয়োগ দ্রুত আদায়ের জন্য কার্যকর নীতিমালা প্রণয়নের আহ্বান জানান বক্তারা।

গবেষণা, প্রশিক্ষণ ও জনসচেতনতার ওপর গুরুত্ব

সভায় বক্তারা ইসলামী অর্থনীতি ও ব্যাংকিং বিষয়ে গবেষণা বাড়াতে বাংলাদেশ ব্যাংকের উদ্যোগে একটি সমৃদ্ধ লাইব্রেরি ও গবেষণা কেন্দ্র গড়ে তোলার প্রস্তাব দেন।

তারা বলেন, ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ সদস্য, শরিয়াহ বোর্ডের সদস্য ও নির্বাহী কর্মকর্তাদের জন্য মানসম্মত প্রশিক্ষণ চালু করা প্রয়োজন। একইসঙ্গে আলিয়া ও কওমি মাদ্রাসার দক্ষ আলেমদের বিশেষ প্রশিক্ষণের মাধ্যমে ইসলামী ব্যাংকিংয়ের গবেষণা ও কমপ্লায়েন্স বিভাগে যুক্ত করার আহ্বান জানান তারা।

জনসাধারণের মধ্যে ইসলামী ব্যাংকিং সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে শরিয়াহ ও ইসলামী ব্যাংকিং লিটারেসি কর্মসূচি এবং সেমিনার আয়োজনেরও প্রস্তাব দেওয়া হয়।

রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ব্যাংকিংয়ের আহ্বান

সভা শেষে গভর্নর বলেন, শরিয়াহ বোর্ডের সদস্যরা স্বাধীনভাবে কাজ করবেন এবং তাদের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রয়োজনীয় সহায়তা দেবে।

তিনি বিশেষভাবে উল্লেখ করেন, ব্যাংক ও হাসপাতালের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রেখে সেবামুখী প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে হবে।

সভায় বাংলাদেশ ব্যাংকের শরিয়াহ অ্যাডভাইজরি বোর্ডের সদস্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন– অধ্যাপক ড. আবু বকর রফিক, মুফতি শাহেদ রহমানী, ড. মোহাম্মদ মনজুরে ইলাহী, ড. মুফতি ইউসুফ সুলতান এবং মাওলানা শাহ মোহাম্মদ ওয়ালী উল্লাহ।

এছাড়া বিভিন্ন ব্যাংকের শরিয়াহ সুপারভাইজরি কমিটির চেয়ারম্যান বা প্রতিনিধিদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসির মুফতি শামছুদ্দিন জিয়া, আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংকের ড. মুরতবা রিজা আহমেদ, স্ট্যান্ডার্ড ইসলামী ব্যাংকের ড. মুহাম্মদ তাজাম্মুল হক, ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকের ড. শামসুল আলম, আইসিবি ইসলামী ব্যাংকের মুফতি মুহাম্মদ আবদুস সালাম, যমুনা ব্যাংকের ড. আবু ইউসুফসহ বিভিন্ন ব্যাংকের শরিয়াহ বিশেষজ্ঞরা।

এছাড়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক এবং দেশের বিশিষ্ট ইসলামী চিন্তাবিদ ও আলেমরা সভায় অংশ নেন।

/জিএম/আরকে/
সম্পর্কিত
গভর্নরের কাছে সাত দফা সুপারিশ দিলো বিসিআই
নতুন নোট কালোবাজারে বিক্রি বন্ধে গভর্নরকে আইনি নোটিশ
গভর্নরের পারফরমেন্স দেখতে বিরোধী দলকে অপেক্ষা করতে বললেন অর্থমন্ত্রী
সর্বশেষ খবর
টিভিতে আজকের খেলা (৫ জুন, ২০২৬)
টিভিতে আজকের খেলা (৫ জুন, ২০২৬)
হবিগঞ্জে নারীর মুখে এসিড নিক্ষেপ, আশঙ্কাজনক অবস্থায় ঢাকায় প্রেরণ
হবিগঞ্জে নারীর মুখে এসিড নিক্ষেপ, আশঙ্কাজনক অবস্থায় ঢাকায় প্রেরণ
বগুড়ায় দই বিক্রি করে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা গুনলেন ব্যবসায়ী 
বগুড়ায় দই বিক্রি করে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা গুনলেন ব্যবসায়ী 
৩৮ বছর বাড়ি ফিরে বিপদে জবেদ, স্ত্রী বললেন স্বামী হিসেবে মেনে নেওয়া সম্ভব নয়
৩৮ বছর বাড়ি ফিরে বিপদে জবেদ, স্ত্রী বললেন স্বামী হিসেবে মেনে নেওয়া সম্ভব নয়
সর্বাধিক পঠিত
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ
দায়িত্ব ছাড়ার প্রসঙ্গে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর উদাহরণ টানলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী
দায়িত্ব ছাড়ার প্রসঙ্গে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর উদাহরণ টানলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী
যুদ্ধবিরোধী প্রস্তাব পাসের পর এবার কী ঘটবে ইরানে
যুদ্ধবিরোধী প্রস্তাব পাসের পর এবার কী ঘটবে ইরানে
শিশু রামিসা হত্যাকাণ্ড: নিজেকে নির্দোষ দাবি ডলারের
শিশু রামিসা হত্যাকাণ্ড: নিজেকে নির্দোষ দাবি ডলারের
আপা ডাকায় নয়, বাসি মিষ্টি পাওয়ায় জরিমানা করেছি
সংবাদ সম্মেলনে ইউএনও মুনমুন নাহার আশাআপা ডাকায় নয়, বাসি মিষ্টি পাওয়ায় জরিমানা করেছি