ইসলামী ব্যাংকে দ্রুত পূর্ণাঙ্গ পেশাদার পর্ষদ গঠনের দাবি গ্রাহক ফোরামের

বাংলা ট্রিবিউন রিপোর্ট
১৫ জুন ২০২৬, ১৪:৪২ আপডেট : ১৫ জুন ২০২৬, ১৪:৪২

দেশের বৃহত্তম শরিয়াভিত্তিক বাণিজ্যিক ব্যাংক ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসিকে ঘিরে নতুন করে অনিশ্চয়তা ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক একজন প্রশাসক নিয়োগ দেওয়ার পর ব্যাংকটির গ্রাহক, আমানতকারী ও প্রবাসীদের মধ্যে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। এরই মধ্যে ‘ইসলামী ব্যাংক সচেতন গ্রাহক ফোরাম’ এক সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে দাবি করেছে, প্রশাসক নিয়োগ কোনও স্থায়ী সমাধান নয়; বরং দ্রুত একটি পূর্ণাঙ্গ, যোগ্য ও পেশাদার পরিচালনা পর্ষদ গঠন করাই ব্যাংকের প্রতি আস্থা ফিরিয়ে আনার একমাত্র পথ।

সোমবার (১৫ জুন) রাজধানীর দিলকুশায় ইসলামী ব্যাংক টাওয়ারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনটির আহ্বায়ক অধ্যাপক নূরনবী মানিক লিখিত বক্তব্যে এসব কথা বলেন। তিনি অভিযোগ করেন, দীর্ঘদিনের সংকট, অনিয়ম, ঋণ কেলেঙ্কারি এবং পরিচালনাগত দুর্বলতার কারণে ইসলামী ব্যাংক যে পরিস্থিতিতে পৌঁছেছে, সেখানে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্ত পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।

আস্থার সংকটে দেশের সবচেয়ে বড় ইসলামী ব্যাংক

ইসলামী ব্যাংক শুধু একটি ব্যাংক নয়; এটি প্রায় কোটি কোটি গ্রাহকের আমানত, প্রবাসীদের রেমিট্যান্স, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের অর্থায়ন এবং দেশের গ্রামীণ অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ। ফলে ব্যাংকটিকে ঘিরে যে কোনও সিদ্ধান্ত সরাসরি আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতার সঙ্গে সম্পর্কিত।

গ্রাহক ফোরামের দাবি, সাম্প্রতিক সময়ে তারা বারবার বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে ব্যাংকটির চেয়ারম্যানের অপসারণ, সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক ওমর ফারুক খানের পুনর্বহাল এবং একটি গ্রহণযোগ্য পরিচালনা কাঠামো গঠনের দাবি জানিয়ে আসছিলেন। কিন্তু এসব দাবির পরিবর্তে বাংলাদেশ ব্যাংক পুরো পরিচালনা পর্ষদ বাতিল করে একজন প্রশাসকের হাতে সব ক্ষমতা তুলে দিয়েছে।

সংগঠনটির মতে, একটি বৃহৎ বাণিজ্যিক ব্যাংকের ক্ষেত্রে দীর্ঘ সময় প্রশাসকনির্ভর ব্যবস্থা কোনোভাবেই কাঙ্ক্ষিত নয়। কারণ এতে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হয়ে যায় এবং অংশীজনদের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত হয় না।

তবে তারা এটিও স্বীকার করেছে, ব্যাংকের লেনদেন সচল রাখতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক যে তারল্য সহায়তা দিয়েছে এবং বিতর্কিত চেয়ারম্যানকে সরিয়ে দিয়েছে, তা কিছুটা স্বস্তির কারণ হয়েছে।

কেন ক্ষুব্ধ গ্রাহকরা?

সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা বলেন, গত কয়েক সপ্তাহ ধরে গ্রাহকরা ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে মানববন্ধন, স্মারকলিপি প্রদান এবং বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করলেও কার্যকর কোনও ইতিবাচক পদক্ষেপ দেখতে পাননি।

তাদের অভিযোগ, একদিকে সরকার ও সংশ্লিষ্ট মহল থেকে পরস্পরবিরোধী বক্তব্য দেওয়া হচ্ছে, অন্যদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের বিভিন্ন মন্তব্যও গ্রাহকদের মধ্যে অনিশ্চয়তা বাড়াচ্ছে। ফলে ব্যাংকের প্রতি আস্থা পুনর্গঠনের পরিবর্তে উদ্বেগ আরও গভীর হচ্ছে।

গ্রাহক ফোরামের ভাষ্য, একটি ব্যাংকের সবচেয়ে বড় সম্পদ হলো জনগণের বিশ্বাস। সেই বিশ্বাস যখন নড়বড়ে হয়ে যায়, তখন শুধু প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন

সংগঠনটির পক্ষ থেকে বলা হয়, একটি নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংকের দায়িত্ব হলো আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষা করা, ব্যাংকিং খাতে সুশাসন নিশ্চিত করা এবং কোনো ব্যাংকে অনিয়ম বা দুর্বলতা দেখা দিলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া।

তাদের অভিযোগ, ইসলামী ব্যাংকে অতীতে যেসব অনিয়ম, ঋণ বিতরণে অসঙ্গতি এবং মালিকানা পরিবর্তন নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছিল, সেসব বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক সময়মতো কার্যকর ব্যবস্থা নিতে পারেনি। ফলে সংকট ধীরে ধীরে গভীর হয়েছে।

বিশেষ করে ২০১৭ সালে ব্যাংকটির মালিকানা ও পরিচালনা কাঠামোয় যে পরিবর্তন আসে, তা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়। ফোরামের দাবি, ওই সময়ের ঘটনাগুলো নিয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন।

প্রশাসক নাকি পূর্ণাঙ্গ পর্ষদ?

ব্যাংকিং খাতের বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনও ব্যাংকে গুরুতর সংকট দেখা দিলে প্রশাসক নিয়োগ একটি অস্থায়ী সমাধান হতে পারে। এর মাধ্যমে নিয়ন্ত্রক সংস্থা দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের সুযোগ পায়। তবে দীর্ঘমেয়াদে একটি ব্যাংককে স্বাভাবিক কার্যক্রমে ফিরিয়ে আনতে দক্ষ ও স্বাধীন পরিচালনা পর্ষদের বিকল্প নেই।

গ্রাহক ফোরামও একই মত তুলে ধরে বলেছে, প্রশাসকের মেয়াদ সীমিত রেখে দ্রুত যোগ্য, সৎ ও পেশাদার ব্যক্তিদের সমন্বয়ে নতুন পরিচালনা পর্ষদ গঠন করতে হবে। না হলে গ্রাহকদের মধ্যে আস্থাহীনতা আরও বাড়তে পারে।

গ্রাহকদের সাত দফা দাবি

সংবাদ সম্মেলনে ইসলামী ব্যাংক সচেতন গ্রাহক ফোরাম সাতটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি তুলে ধরে। সেগুলোর মধ্যে রয়েছে– দ্রুত যোগ্য ও পেশাদার ব্যক্তিদের নিয়ে পূর্ণাঙ্গ পরিচালনা পর্ষদ গঠন; বিতর্কিতভাবে হস্তান্তর হওয়া শেয়ার ও মালিকানা কাঠামো পুনর্মূল্যায়ন; ব্যাংক লুটপাট ও আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ তদন্তে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন; ইসলামী ব্যাংকসহ সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোতে আতঙ্ক সৃষ্টিকারী সিদ্ধান্ত থেকে বিরত থাকা; বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনার জন্য বিশেষ টাস্কফোর্স গঠন; আর্থিক অপরাধে জড়িত ব্যক্তিদের পুনর্বাসনের সুযোগ বন্ধ করা এবং ইসলামী ব্যাংক নিয়ে বিভ্রান্তিকর বক্তব্য ও রাজনৈতিক বিতর্ক পরিহার করা।

সংগঠনটি জানিয়েছে, এসব দাবি আদায়ের লক্ষ্যে তারা ১৬ জুন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের কাছে স্মারকলিপি দেবে।

সামনে কোন পথে যাবে ইসলামী ব্যাংক?

বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, প্রশাসক দিয়ে কতদিন চলবে ইসলামী ব্যাংক এবং কবে গঠিত হবে নতুন পরিচালনা পর্ষদ?

ব্যাংকিং খাতের অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের মতে, ইসলামী ব্যাংকের মতো বৃহৎ প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘ সময় প্রশাসক ব্যবস্থা চালু থাকলে সিদ্ধান্ত গ্রহণ, ব্যবসা সম্প্রসারণ এবং গ্রাহক আস্থা পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জ তৈরি হতে পারে। তাই প্রশাসকের প্রধান কাজ হওয়া উচিত ব্যাংকের আর্থিক অবস্থার প্রকৃত চিত্র মূল্যায়ন, সুশাসন নিশ্চিত করা, অনিয়মের তদন্ত এগিয়ে নেওয়া এবং দ্রুত একটি গ্রহণযোগ্য পরিচালনা পর্ষদ গঠনের পরিবেশ তৈরি করা।

কারণ ইসলামী ব্যাংক কোনও ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা ব্যবসায়িক স্বার্থের প্রতিষ্ঠান নয়; এটি দেশের লাখো আমানতকারী, কোটি গ্রাহক এবং বিপুলসংখ্যক প্রবাসীর আস্থা ও সঞ্চয়ের সঙ্গে জড়িত একটি জাতীয় আর্থিক প্রতিষ্ঠান। সেই আস্থা পুনর্গঠনই এখন বাংলাদেশ ব্যাংক ও সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

/জিএম/আরকে/
সম্পর্কিত
৩৪ লাখ টাকা ছিনতাইয়ের ছক ব্যাংকের ভেতরেই, কর্মকর্তাসহ গ্রেফতার ৬
দুই কর্মকর্তাকে পিটিয়ে ইসলামী ব্যাংকের ৩৪ লাখ টাকা ছিনতাই
প্রধানমন্ত্রীর নিউইয়র্ক সফর নিয়ে সংবাদ সম্মেলন আজ
সর্বশেষ খবর
‘লুপাস’ রোগে ভুগছেন সেলেনা গোমেজ, বদলে গেছে কণ্ঠ
‘লুপাস’ রোগে ভুগছেন সেলেনা গোমেজ, বদলে গেছে কণ্ঠ
সরকার চায় ঐক্য, কিন্তু একটি মহল ছড়াচ্ছে বিভ্রান্তি : প্রধানমন্ত্রী
সরকার চায় ঐক্য, কিন্তু একটি মহল ছড়াচ্ছে বিভ্রান্তি : প্রধানমন্ত্রী
দাঙ্গা-লুটপাটে উত্তাল ফ্রান্স, পিএসজি-বার্সা ম্যাচ নিয়ে যা জানা গেলো
দাঙ্গা-লুটপাটে উত্তাল ফ্রান্স, পিএসজি-বার্সা ম্যাচ নিয়ে যা জানা গেলো
নতুন চাকরিতে যোগ দিয়ে বাড়ি ফেরা হলো না আনোয়ারের
নাটোরে বাস-ট্রাক সংঘর্ষ নতুন চাকরিতে যোগ দিয়ে বাড়ি ফেরা হলো না আনোয়ারের
সর্বাধিক পঠিত
ইশরাকের পদত্যাগের পরই ‘ক্ষমতা’ নিয়ে স্ত্রীর বার্তা
ইশরাকের পদত্যাগের পরই ‘ক্ষমতা’ নিয়ে স্ত্রীর বার্তা
‘পাপের লাশ বাংলাদেশে আসুক তা চাই না’ মন্তব্যের জন্য ক্ষমা চাইলেন এমপি রতন
‘পাপের লাশ বাংলাদেশে আসুক তা চাই না’ মন্তব্যের জন্য ক্ষমা চাইলেন এমপি রতন
সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর প্রসঙ্গে যা বললেন জামায়াত আমির
সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর প্রসঙ্গে যা বললেন জামায়াত আমির
বাবার চোখ এড়াতে ঢোলা জামা, আড়ালে চলতো শিশুর ওপর নির্যাতন
বাবার চোখ এড়াতে ঢোলা জামা, আড়ালে চলতো শিশুর ওপর নির্যাতন
সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড: যা বললেন প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির
সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড: যা বললেন প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির