৪২ ডলারের শার্ট থেকে বাংলাদেশ পায় ৩.৩০ ডলার

Send
ইব্রাহীম হুসাইন অভি
প্রকাশিত : ১৩:২১, মে ০৪, ২০১৭ | সর্বশেষ আপডেট : ০৯:৩৭, মে ০৫, ২০১৭

বাংলাদেশ থেকে তৈরি পোশাক কিনে বিদেশি ক্রেতারা অনেক মুনাফা করলেও তারা উৎপাদকদের অনেক কম মূল্য পরিশোধ করে। বাংলাদেশে তৈরি পোশাক পণ্যের উৎপাদন খরচ এবং উন্নত দেশগুলোতে সেই পণ্যের খুচরা বিক্রয় মূল্যের মধ্যে ব্যবধান অবাক করার মতো।

দেখা গেছে, বিদেশি ক্রেতারা বাংলাদেশ থেকে তৈরি পোশাক কিনে একটি পণ্যে ৬শ’ শতাংশ পর্যন্ত মুনাফা করছে। অর্থাৎ  খুচরা ক্রেতাকে এক টাকার পণ্যের জন্য সাত টাকা ব্যয় করতে হচ্ছে।

সম্প্রতি দুটি বিদেশি ব্রান্ডের কয়েকটি পণ্যের খুচরা মূল্যের ট্যাগ ও বাংলাদেশে ওই পণ্যের উৎপাদন খরচ বিশ্লেষণ করে এ চিত্র পাওয়া গেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের একটি খুচরা প্রতিষ্ঠানে পোলো ব্যান্ডের শার্টের ট্যাগে দেখা গেছে, শার্টটির খুচরা বিক্রয় মূল্য ৪২ ডলার বা তিন হাজার ৪৭৫ টাকা। যদিও বাংলাদেশে শার্টটির উৎপাদন খরচ হয়েছে মাত্র ৩ দশমিক ৩০ শতাংশ বা ২৭৩ টাকা।

ফ্রান্সের একজন ক্রেতা নারীদের জন্য বাংলাদেশ থেকে দুই ধরনের টপস ক্রয় করেন যথাক্রমে ৩ দশমিক ৫৫ ডলার বা ২৯৪ টাকা ও ৫ দশমিক ১০ ডলার বা ৪২২ টাকায়। কিন্তু তিনি এই দুটি পণ্য ফ্রান্সে বিক্রি করেন যথাক্রমে ১৪ দশমিক ৯৯ ইউরো বা এক হাজার ৩৫৪ টাকা ও ২২ দশমিক ৯৯ ইউরো বা ২ হাজার ৭৬ টাকায়।

একইভাবে বাংলাদেশ থেকে ওই ক্রেতা জিনস কেনেন ৫ দশমিক ১৩ ডলার বা ৪২৪ টাকা ও ৬ দশমিক ১০ ডলার বা ৫০৫ টাকায়। যা ফ্রান্সে খুচরা বিক্রি হয় যথাক্রমে ১৯ দশমিক ৯৯ ইউরো বা এক হাজার ৮০৫ টাকা ও ২৫ দশমিক ৯৯ ইউরো বা ২ হাজার ৩৪৭ টাকায়।

পোশাক খাত সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, উৎপাদন ও খুচরা মূল্যের মধ্যে এ বিশাল ব্যবধানের পেছনে কোনও কারণ নেই। তবে স্থানীয় পণ্য পরিবহন ও অন্যান্য সব খরচ উৎপাদন খরচের ৬০ শতাংশ মাত্র।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে খুচরা ক্রেতাদের এক প্রতিনিধি জানান, ৩ দশমিক ১ ডলার মূল্যের তৈরি পোশাক পণ্য খুচরা পর্যায়ে সর্বোচ্চ ৫ ডলার হতে পারে। কিন্তু খুচরা পর্যায়ের মূল্যের সঙ্গে শিপমেন্ট, মজুদ এবং পরিবহন খরচ যুক্ত হয়ে দাম বেড়ে যায়।

তিনি আরও বলেন, কিছু ক্ষেত্রে কয়েকটি দেশের খুচরা ক্রেতাদের পণ্যের মূল্যের সঙ্গে আমদানি শুল্কও পরিশোধ করতে হয়। বিশেষ করে যেসব দেশে বাংলাদেশ ডিউটি ফ্রি বাজার সুবিধা পায় না।

বাংলাদেশ গার্মেন্টস বায়িং হাউজ অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি কেআই হোসেন বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের ক্রেতাদের অবিক্রিত পণ্যের মূল্য পরিশোধ, পরিবহন ও শিপমেন্টের খরচ  এবং আমদানি শুল্ক বহন করতে হয়। তাই কোনও পণ্যের উৎপাদন খরচের দ্বিগুণ বা তিনগুণ দাম নেওয়া একটি সাধারণ বিষয়ে পরিণত হয়েছে।

বাংলাদেশের একটি বায়িং হাউজের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, বিশাল মুনাফা হলেও বিদেশি ক্রেতারা কম মূল্যে পণ্য কিনতে উৎপাদকদের সঙ্গে এক প্রকার যুদ্ধ করে (দর কষাকষি)। তবে এ যুদ্ধে শেষ পর্যন্ত ক্রেতারাই জয়ী হয়। কারণ চরম প্রতিযোগিতাপূর্ণ এ বাজারে টিকে থাকতে উৎপাদকরা যেকোনও মূল্যে কাজ পেতে চায়।

যুক্তরাষ্ট্রের পেনসিলভানিয়া স্টেট বিশ্ববিদ্যালয়ের লেবার অ্যান্ড এমপ্লয়মেন্ট রিলেশন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মার্ক আনারের এক গবেষণা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০০০ থেকে ২০১৪ সালের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে রফতানি করা বাংলাদেশের তৈরি পোশাক পণ্যের উৎপাদন খরচ কমেছে ৪১ শতাংশ।

কেআই হোসেন বলেন, ‘বাংলাদেশের এক পঞ্চমাংশ উৎপাদক সরাসরি খুচরা বিক্রেতাদের কাছে পণ্য বিক্রি করেন এবং ভালো দাম পাওয়ার জন্য তারা ফরওয়ার্ড মার্কেটিং করে থাকেন। ফরওয়ার্ড মার্কেটিং হলো, ক্রেতারা অর্ডার নিয়ে উৎপাদকদের কাছে যাওয়ার পরিবর্তে উৎপাদকরা সরাসরি ক্রেতাদের কাছে বিভিন্ন অফার নিয়ে যান।’

এরপরও বিশাল উৎপাদন সক্ষমতা থাকায় বাংলাদেশি উৎপাদকরা মুনাফা করতে পারে।

বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, ‘অতিরিক্ত উৎপাদন সক্ষমতা থাকায় বাংলাদেশি তৈরি পোশাক পণ্যের দাম কম। যা কাজ পেতে উৎপাদকদের বেপরোয়া করে তোলে। এ জন্য উৎপাদন অব্যাহত রাখতে তারা ক্রেতাদের কম মূল্য পণ্য সরবরাহের অফার দেয়।’

বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর সভাপতি মো. সিদ্দিকুর রহমান বলেন, ‘দাম বাড়ার আরেকটি কারণ উৎপাদন ও শিমেন্টের মধ্যবর্তী দীর্ঘ সময়। কারণ বাংলাদেশে কোনও গভীর সমুদ্রবন্দর নেই। ফলে পণ্য সরবরাহের সময় দীর্ঘ হতে থাকে এবং উৎপাদক ও ক্রেতাদের মধ্যে একটি অস্বাস্থকর প্রতিযোগিতা শুরু হয়।’

তিনি আরও বলেন, ‘ক্রেতারা পণ্যের দাম কমাতে এ পরিস্থিতির সুযোগ নেয়। তাই সরকারকে আমাদের বন্দরের সক্ষমতা বাড়াতে হবে। পাশাপাশি উৎপাদকদেরও উচ্চ মানের পণ্য উৎপাদনে সক্ষমতা বাড়াতে হবে, পণ্যে বৈচিত্রতা আনতে হবে এবং ক্রেতাদের কাছ থেকে সঠিক দাম পেতে পণ্যের ডিজাইনে নতুনত্ব আনতে হবে।’

/এসএনএইচ/ 

লাইভ

টপ
X