জামানত জালিয়াতি ব্যাংক খাতের প্রধান সমস্যা

Send
গোলাম মওলা
প্রকাশিত : ১৪:৫৩, অক্টোবর ০২, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ২২:২৭, অক্টোবর ০২, ২০১৯





বাংলাদেশ ব্যাংক

ব্যাংকের টাকা ফেরত দিচ্ছেন না যেসব গ্রাহক,তাদের বেশির ভাগই জামানত জালিয়াতির মাধ্যমে ঋণ নিয়েছেন। আর জালিয়াতির বন্ধকি সম্পত্তি বিক্রি করেও নগদ অর্থ আদায় করতে পারছে না ব্যাংকগুলো। এ কারণে ব্যাংক খাতে বাড়ছে মন্দ ঋণের পরিমাণ। বাংলাদেশ ব্যাংকের এক প্রতিবেদনে এতথ্য তুলে ধরা হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, জামানত জালিয়াতি এখন ব্যাংক খাতের অন্যতম প্রধান সমস্যা। তিনভাবে জামানত জালিয়াতির ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে ব্যাংক ঋণ পেতে অনেকে ভুয়া জামানত বন্ধক রেখেছে। একই জামানত একাধিক ব্যাংকের কাছে বন্ধক রাখার ঘটনাও ঘটেছে। এছাড়া বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই বন্ধকি সম্পত্তির মূল্য অনেক বেশি দেখিয়ে ঋণ নিয়েছে। খেলাপি ঋণ আদায়ে প্রচলিত আইনি কাঠামোর সুফল না পাওয়ার বিষয়ে অনুসন্ধান করতে গিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক এসব তথ্য পেয়েছে।
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক সিরাজুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘খেলাপি ঋণ আদায়ে ব্যাংকগুলোকে কঠোরভাবে মনিটরিং করা হচ্ছে। ঋণ দেওয়ার সময়ই বন্ধকি সম্পত্তি বা জামানত দেখেশুনে নেওয়ার জন্য ব্যাংকগুলোকে নির্দেশনা দেওয়া আছে।’ তিনি বলেন, ‘জামানত জালিয়াতি ঠেকাতে ঋণের মতো করে জামানতের একটি তথ্যভাণ্ডার গড়ে তুলেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ব্যাংকগুলো থেকে জামানতের সব ধরনের তথ্য নিয়ে এই ভাণ্ডার গড়ে তোলা হচ্ছে।’ তিনি উল্লেখ করেন, জামানতের তথ্যভাণ্ডারে পুরোদমে কাজ শুরু হলে একই জামানত একাধিক ব্যাংকে বন্ধক রেখে ঋণ নেওয়ার প্রবণতা কমানো যাবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের ঋণগুলোতে জামানত জালিয়াতির ঘটনা বেশি ঘটেছে। এক্ষেত্রে ব্যাংক ও গ্রাহকের যোগসাজশে জামানতের মূল্য বেশি দেখানো হয়। আবার ঋণ নেওয়ার সময় যে জামানত দেওয়া হয়, ওই ঋণ খেলাপি হলে ব্যাংক নিলাম করতে গিয়ে পায় অন্য জামানত। এসব কারণে ব্যাংক খেলাপি ঋণ আদায়ে সম্পত্তি বিক্রি করে যথাযথ মূল্য পায় না। ফলে ঋণের টাকাও আদায় হয় না।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সূত্র বলছে, বড় অঙ্কের ঋণগুলো বেশি খেলাপি হচ্ছে। যেগুলোর বিপরীতে ব্যাংকের কাছে যথেষ্ট জামানত থাকে না। এছাড়া খেলাপি হওয়া ঋণের বেশিরভাগ জামানতই ভুয়া। ফলে আদায়ের প্রক্রিয়ায় আইনি লড়াই করতে গিয়ে ব্যাংকের অর্থ খরচ হলেও ব্যাংক নগদ টাকা উদ্ধার করতে পারে না।
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘প্রকৃত ব্যবসায়ীরা জামানত জালিয়াতি করার কথা নয়। তবে ইচ্ছাকৃত খেলাপিরাই জামানত জালিয়াতির আশ্রয় নেয়। আর এই ধরনের ঋণের সঙ্গে ব্যাংকের কিছু অসাধু কর্মকর্তা যুক্ত থাকেন। এ কারণে অপরাধীদের শাস্তি নিশ্চিত করা জরুরি। অপরাধীদের শাস্তি হলে তবেই সব ধরনের জালিয়াতি কমবে। ইচ্ছেকৃত খেলাপিও কমে আসবে।’
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঋণের বিপরীতে চার ধরনের জামানত নেওয়া হয়। গ্রাহকের সরাসরি জামানত, পরোক্ষ জামানত, ব্যক্তিগত বা করপোরেট গ্যারান্টি এবং গ্যারান্টারের জামানত। প্রত্যক্ষ জামানত থেকে ঋণ আদায় না হলে ব্যাংক তখন পরোক্ষ জামানতের দিকে নজর দেয়। যদিও ব্যাংক ইচ্ছে করলেই পরোক্ষ জামানত বা বন্ধকি সম্পত্তি বিক্রি করতে পারে না। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, কোনও গ্রাহকের ব্যক্তিগত বা করপোরেট গ্যারান্টির বিপরীতে ব্যাংকগুলো ঋণ আদায় করতে পেরেছে, এমন নজির নেই। প্রচলিত আইন অনুযায়ী, গ্রাহক নিজে ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হলে গ্যারান্টারের কাছে চাইতে পারে ব্যাংক। কিন্তু গ্রাহক পর্যায়েই নিষ্পত্তি হতে অনেক জটিলতা তৈরি হয়।

প্রসঙ্গত, ব্যক্তিগত ঋণগুলোতে তৃতীয় পক্ষের গ্যারান্টার থাকলেও প্রকল্প বা বড় ঋণে কোনও গ্যারান্টার থাকে না।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, ঋণের টাকা আদায় করতে না পারার কারণে ব্যাংক খাতে খেলাপির পরিমাণ বেড়েই চলেছে। গত এক বছরের ব্যবধানে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ বেড়েছে প্রায় ২২ হাজার কোটি টাকা। ২০১৮ সালের জুন পর্যন্ত অবলোপন বাদে খেলাপি ঋণ ছিল ৯০ হাজার ৩৭২ কোটি টাকা। এ বছরের জুন মাসের শেষে অবলোপন বাদে খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে এক লাখ ১২ হাজার ৪২৫ কোটি টাকা। আর অবলোপনসহ ব্যাংকিং খাতে এখন প্রকৃত খেলাপি ঋণ প্রায় এক লাখ ৫২ হাজার ৫২৬ কোটি টাকা।
এদিকে খেলাপি ঋণ কম দেখাতে ব্যাংকগুলো পুনঃতফসিলের দিকে ঝুকছে। যেসব গ্রাহক টাকা ফেরত দিতে পারছেন না, তাদেরকে ডেকে এনে পুনঃতফসিলের সুযোগ করে দেওয়া হচ্ছে।

 

/এপিএইচ/

লাইভ

টপ