সরকার চাইলে পেঁয়াজের দর বেঁধে দিতে পারতো

Send
শফিকুল ইসলাম
প্রকাশিত : ২০:৩৭, নভেম্বর ১৭, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৬:৫৫, নভেম্বর ১৮, ২০১৯

খাতুনগঞ্জ আড়তমুক্তবাজার অর্থনীতিতে নিত্যপণ্যের মূল্য বেঁধে দেওয়া যায় না বলে মনে করেন বাজার বিশ্লেষকরা। তবে, তারা এও মনে করেন, পরিস্থিতি বাধ্য করলে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের তৈরি  ‘এলোকেশন অব বিজনেসের-১০’ অনুযায়ী সরকার মূল্য বেঁধে দিতে পারে। এই লক্ষ্যে গঠিত ‘প্রাইস অ্যাডভাইজিং বোর্ড’-এর পরামর্শ নেওয়ারও বিধান রয়েছে। কিন্তু নিত্যপ্রয়োজনীয় এই পণ্যটির মূল্য অসহনীয় পর্যায়ে চলে গেলেও সরকার দর বেঁধে দেয়নি।  

প্রসঙ্গত, গত ২৯ সেপ্টেম্বর ভারত সরকার পেঁয়াজ রফতানি বন্ধ ঘোষণা করার পরের দিন থেকে ধীরে ধীরে দেশে পেঁয়াজের বাজার অস্থির হতে শুরু করে। ভারতীয় পেঁয়াজের পাশাপাশি ৩৫ টাকা কেজি দরের ভালো মানের দেশি পেঁয়াজ ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে ৮০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হতে শুরু করে। এরপর মাত্র একদিনের ব্যবধানে তা ১২০ টাকায় ওঠে। পরবর্তী সময়ে তা ১৪০, ১৫০, ১৬০, ১৮০, ২০০ ২২০, ২৪০, ২৫০ এবং সর্বোপরী শনিবার (১৬ নভেম্বর) পর্যন্ত তা ২৭০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হয়েছে। সরকার টিসিবির মাধ্যমে ৪৫ টাকা কেজি দরে খোলাবাজারে পেঁয়াজ বিক্রি শুরু করলেও বাজারে তার কোনও প্রভাব পড়েনি।

মিয়ানমার, মিসর ও তুরস্ক থেকে পেঁয়াজ আমদানিতে ব্যবসায়ীদের উৎসাহিত করতে ব্যাংকের এলসি মার্জিন তুলে দেওয়া ও ব্যাংক ঋণের সুদহার কমানোসহ বহুমুখী উদ্যোগ নিলেও তা ইতিবাচক ফল দেয়নি। উল্টো দিনের পর দিন মূল্য বেড়েছে।  

এ বিষয়ে জানতে চাইলে একটি বেসরকারি ব্যাংকের কর্মকর্তা আরিফ হোসেন বলেন, ‘পেঁয়াজের বাজারদর যখন ধীরে ধীরে ওপরের দিকে উঠতে থাকে, তখনই সরকার চাইলে মূল্যনিয়ন্ত্রণ করতে পারতো। এটি করলে পরিস্থিতি এত ভয়াবহ হতো না। সরকার চাইলে পেঁয়াজের বাজার স্থিতিশীল রাখতে আমদানি খরচ, পরিবহন খরচ, সরকারের ভ্যাট ট্যাক্স যদি থাকে তা পরিশোধ করার পর কেজিপ্রতি বা মণপ্রতি একটি নির্দিষ্ট হারে মুনাফা যুক্ত করে পেঁয়াজের দর নির্ধারণ করে দিতে পারতো। এটি যদি সরকার করতো, তাহলে পেঁয়াজের বাজারের এমন অস্থিরতার মুখোমুখি ক্রেতাদের হতে হতো না।’

এদিকে, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ কর্মকর্তারা বলছেন, মুক্তবাজার অর্থনীতিতে দর বেঁধে দেওয়ার বিষয়টি বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। মূল্য বেঁধে দিলে ভোক্তার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। এতে আন্তর্জাতিক বাজারে আমদানিপণ্যের মূল্য কমলে পুনরাদেশ না দেওয়া পর্যন্ত সেই সুফল ক্রেতারা পাবেন না। অন্যদিকে, এতে বাজারে প্রতিযোগিতার পথ বন্ধ হয়ে যায়। তবে সরকার চাইলে উৎপাদন ও পরিবহন খরচ বাদ দিয়ে যৌক্তিক মুনাফা নির্ধারণ করে দিতে পারেন। এরপরও বিশেষ প্রয়োজনে বিশেষ আইটেমের মূল্য নির্ধারণ করে দেওয়ার মতো পরিবেশ সৃষ্টি করতে পারে মাত্র।

সরকারের সংশ্লিষ্টরা কর্মকর্তারা বলছেন, নির্ধারিত দর সারা দেশে বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা রয়েছে। কারণ সেই পরিমাণ জনবল বা অবকাঠামো সরকারের নেই। এতে বরং বাজারের অস্থিরতা বাড়তো।

এক প্রশ্নের জবাবে ব্যাংক কর্মকর্তা আরিফ হোসেন বলেন, ‘সে মুক্তবাজারে হস্তক্ষেপ করা ঠিক নয়, যে মুক্তবাজার স্থিতিশীল বা স্বাভাবিক আচরণ করে। কিন্তু আমাদের দুর্ভাগ্য, দেশের বাজার কখনোই স্বাভাবিক বা স্থিতিশীল আচরণ করে না। আর সংকটের সময় পাগলা ঘোড়ার মতো দাবড়িয়ে বেড়ায়। এমন বাজারে প্রয়োজনে সরকারের হস্তক্ষেপ ইতিবাচক সুফল দিতে বাধ্য। কারণ সরকারের কাছে ব্যবসায়ী স্বার্থ নয়, জনস্বার্থই অগ্রাধিকার পাওয়ার দাবি রাখে।’

এসব বিষয়ে জানতে চাইলে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের উপসচিব জিনাত রেহানা বলেন, ‘দেশের এই বিশাল বাজারে সরকারের এলোকেশন অব বিজনেস-২০১৪ এর ক্ষমতা প্রয়োগ করার মতো পরিস্থিতি নেই। কারণ সরকারের হাতে জনবল কম। এটি প্রয়োগ করতে গিয়ে নতুন কোনও অস্থিরতা তৈরি হতে পারতো। যা সামাল দেওয়া হয়তো দুঃসাধ্য হতো।’  

সূত্র জানায়, পেঁয়াজের বাজার নিয়ন্ত্রণে আনতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে মিয়ানমার থেকে আমদানি করা পেঁয়াজের দর ঠিক করে দিয়েছিল। এ ক্ষেত্রে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা ছিল মিয়ানমারের পেঁয়াজ সর্বোচ্চ ৬০ টাকা কেজি দরে বিক্রি করতে হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, পেঁয়াজ আমদানিতে এলসি’র দরের সঙ্গে পরিবহন খরচ যোগ করে আমদানি খরচ পড়ে কেজিতে ৫৫ টাকা। এরসঙ্গে যৌক্তিক হারে মুনাফা সর্বোচ্চ ৫টাকা যুক্ত করে ৬০ টাকা দরে বিক্রির নির্দেশনা দিয়েছিল বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। কিন্তু এই নির্দেশ কার্যকর করা যায়নি।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সদ্য পোস্ট রিটায়ারমেন্ট লিভ (পিআরএল)-এ যাওয়া অতিরিক্ত সচিব শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘মুক্তবাজার অর্থনীতিতে নিত্যপণ্যের দর বেঁধে দেওয়া বা নিত্যপণ্যের আমদানি বা রফতানি নিষিদ্ধ করা যায় না। কারণ এটি ডব্লিউটিও আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। তবে, যেকোনও দেশ চাইলে নিজের দেশের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজন হলে রফতানি বা আমদানি নিষিদ্ধ করতে পারে। ভারত এমন পরিস্থিতিতেই পেঁয়াজ রফতানি নিষিদ্ধ করেছে।’

অন্য এক প্রশ্নের জবাবে শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘বাস্তবায়নের সীমাবদ্ধতার কারণেই দর ঠিক করে দেওয়ার পরেও তা বাস্তবায়ন করা যায়নি। একসঙ্গে দেশের সব জায়গায় নির্দেশনা কার্যকর করা না গেলে মূল্যের তারতম্য ঘটবে। তাতে বাজারে অস্থিরতাও বাড়বে।’ তিনি বলেন, ‘লাখ লাখ খুচরা ব্যবসায়ীকে মনিটরিং করার জনবল বা কাঠামো কোনোটাই মন্ত্রণালয়ের নেই। তবে, সরকার চাইলে যেকোনও প্রয়োজনে যেকোনও সিদ্ধান্ত তো সাময়িক সময়ের জন্য নিতেই পারে।’  

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে এফবিসিসিআইয়ের সাবেক সিনিয়র সহ-সভাপতি হেলাল উদ্দিন বলেন, ‘পণ্যের দর নির্ধারণ করে দিলে বাজারে প্রতিযোগিতার পরিবেশ নষ্ট হয়। আমরা একটি প্রতিযোগিতামুখী বাজার ব্যবস্থাপনা চাই। তবে, সরকার প্রয়োজন মনে করলে সব কিছুই করতে পারে।’

জানতে জাইলে প্রাইভেটাইজেশন কমিশনের চেয়ারম্যান সদ্য বিদায়ী বাণিজ্য সচিব মফিজুল ইসলাম বলেন, ‘পচনশীল পণ্যের দর নির্দিষ্ট করে দেওয়া যায় না। এটি কোনও আইনেই নেই। আর বিদ্যমান মুক্তবাজার অর্থনীতিতে এটি নির্ধারণ করে দেওয়া ডব্লিউটিও আইনের পরিপন্থী।’

বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি বর্তমানে দেশের বাইরে। এ প্রসঙ্গে জানতে বাণিজ্য সচিব ড. জাফর উদ্দিনের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য তার মোবাইল ফোনে কয়েকবার যোগাযোগ করা হলে তিনি ফোন রিসিভ করেননি।

            

/এমএনএইচ/

লাইভ

টপ