এবার বাংলাদেশ ছাড়তে চাইছে পোসকো দাইয়ু

Send
সঞ্চিতা সীতু
প্রকাশিত : ২১:২৩, নভেম্বর ২০, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ২১:২৪, নভেম্বর ২০, ২০১৯

পোসকো-দাইয়ুঅনিশ্চিত হয়ে উঠেছে সাগরে তেল গ্যাস অনুসন্ধান কার্যক্রম। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক কোম্পানি কনোকো ফিলিপসের পর এবার বাংলাদেশ ছাড়তে চাইছে দক্ষিণ কোরিয়ার কোম্পানি পোসকো দাইয়ু। বিনিয়োগ অংশীদার না পাওয়ায় ও গ্যাসের মূল্য বাড়ানোর বিষয়ে বাংলাদেশের রাজি না হওয়ায় কোম্পানিটি সাগরে আর কাজ করবে না বলে চিঠি দিয়েছে পেট্রোবাংলাকে। তবে, পোসকো দাইয়ুর সঙ্গে আরও ছয় মাস চুক্তির মেয়াদ বাড়ানোর চিন্তা করছে পেট্রোবাংলা।

২০১৬ সালের ৭ ডিসেম্বরে বঙ্গোপসাগরের গভীর সমুদ্রের ডিএস-১২ নম্বর ব্লকে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে পোসকো দাইয়ুর সঙ্গে উৎপাদন-অংশীদারিত্ব চুক্তি (পিএসসি) অনুস্বাক্ষর করে পেট্রোবাংলা। ‘বিদ্যুৎ, জ্বালানি দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি আইন-২০১০’ (বিশেষ বিধান)-এর আওতায় ব্লকটি দাইয়ুকে ইজারা দেওয়া হয়েছে।

এরপর তারা দ্বিতীয় মাত্রার ভূ-মাত্রিক জরিপের কাজ শুরেু করে। জরিপ শেষে তারা জানায়, সাগরের ১২ নম্বর ব্লকে বিপুল পরিমাণ তেল-গ্যাস মজুত থাকার নমুনা পাওয়ার সম্ভাবনার আছে। এই ব্লকের তিন হাজার ৫৬০ লাইন কিলোমিটার জরিপ করে সম্ভাবনাময় পাঁচটি লিড বা প্রসপেক্ট পাওয়া গেছে। এর মধ্যে তিনটিতে বেশ সম্ভাবনা দেখছে জ্বালানি বিভাগ। সমুদ্র উপকূল থেকে ব্লকটির দূরত্ব ১৮০ কিলোমিটার, অর্থাৎ এটি বঙ্গোপসাগরের ১৮০ কিলোমিটার গভীরে। ব্লকটির ওপর পানির গভীরতা গড়ে একহাজার ৭০০ মিটার। এরপর গ্যাসের সম্ভাবনা নিশ্চিত হতে দুই হাজার লাইন কিলোমিটার তৃতীয় মাত্রার বা ত্রিমাত্রিক ভূকম্পন জরিপ করার কথা পসকো দাইয়ুর।

প্রসঙ্গত, মিয়ানমারের সমুদ্র ব্লক এডি-৭-এর থালিন-১-এ গ্যাসক্ষেত্রের পাশেই বাংলাদেশের ডিএস-১২ নম্বর ব্লকটি অবস্থিত। ওই গ্যাসক্ষেত্রেও গ্যাস পেয়েছে দাইয়ু। এখন গ্যাস উত্তোলনও করছে তারা। বাংলাদেশের ডিএস-১২ ও মিয়ানমারের ব্লক এডি-৭ একই ভৌগোলিক কাঠামোয় অবস্থিত। ফলে সেখানেও গ্যাস পাওয়ার উজ্জ্বল সম্ভাবনা আছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

পেট্রোবাংলা সূত্র জানায়, এই সম্ভবনার মধ্যে ত্রিমাত্রিক জরিপ কাজ শুরু না করে তারা তাদের সঙ্গে বিনিয়োগ অংশীদার খুঁজতে শুরু করে। এর পাশাপাশি তারা পিএসসির বাইরে গিয়ে গ্যাসের মূল্য বাড়ানোর প্রস্তাব দেয় বাংলাদেশকে। সে প্রস্তাবে পেট্রোবাংলা রাজি হয়নি। এরপর তারা চিঠিতে জানায়, গ্যাসের মূল্য না বাড়ালে কোম্পানিটি বাংলাদেশ ছেড়ে চলে যাবে। গ্যাসের মূল্য না বাড়ালে যদি অন্য সুবিধাগুলো দেওয়া হয়, তাহলে তারা বিষয়টি বিবেচনা করবে।

চিঠিতে আরও বলা হয়, তারা আরও এক বছর চুক্তির মেয়াদ বাড়াতে চায়। তবে, সেক্ষেত্রে পিএসসির অধীন বাণিজ্যিক বিষয়গুলো আবার পর্যালোচনা করতে হবে। এই বাণিজ্যিক বিষয়গুলোর মধ্যে আছে, গ্যাসের ভাগ, মুনাফা ও গ্যাসের মূল্য। অর্থাৎ গ্যাসের মূল্য না বাড়ালে গ্যাসের ভাগ বা মুনাফার ভাগ বেশি চায় তারা।

পেট্রোবাংলার একজন ঊর্ধ্বতন কমর্কতা বলেন, ‘দ্বিমাত্রিক জরিপে গ্যাস পাওয়ার পর পরই তারা গ্যাসের মূল্য বাড়ানোর বিষয়ে বলতে শুরু করে। পেট্রোবাংলা ওই সময় জানিয়েছিল, পিএসসির বাইরে গিয়ে গ্যাসের মূল্য বাড়ানো সম্ভব নয়।’ তিনি বলেন, ‘এছাড়া কনোকো ফিলিপসের সময় বিষয়টি ভিন্ন ছিল। তাদের সঙ্গে আমরা রিভিউ করতে পারতাম। কিন্তু তা করা হয়নি। কারণ কনোকো ফিলিপসের সঙ্গে ২০০৮-এর পিএসসি করা হয়েছে। পরে আবার পিএসসি সংশোধন করে গ্যাসের মূল্য বাড়িয়ে নতুন পিএসসি করা হয়েছে। এই নতুন পিএসসির অধীনেই পোসকো দাইয়ুর সঙ্গে চুক্তি হয়েছে। তারা জেনে শুনে চুক্তি করেছে। একই ধরনের চুক্তি হয়েছে ভারতীয় কোম্পানি ওএনজিসির সঙ্গেও। ফলে তাদের যদি পিএসসির বাইরে গিয়ে সুবিধা দিতে হয়, তাহলে ওএনজিসিসহ নতুন যেসব কোম্পানি আগ্রহ দেখাচ্ছে, তারাও এই সুবিধা চাইবে। যা মোটেও বিধিসম্মত নয়।

এর আগে ২০০৮ সালে মার্কিন কোম্পানি কনোকো ফিলিপস বঙ্গোপসাগরের ১০ ও ১১ নম্বর ব্লকে তেল গ্যাস অনুসন্ধানের কাজ পায়। একইভাবে দ্বিমাত্রিক জরিপের ভালো ফল পাওয়ার পর গ্যাসের মূল্য বাড়ানোর প্রস্তাব দেয় তারা। কিন্তু বাংলাদেশ সেই প্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় ২০১৫ সালে তারা  চলে যায়।

এরপর দীর্ঘদিন চেষ্টা করেও সাগরে তেল গ্যাস অনুসন্ধানে কোনও বহুজাতিক কোম্পানিকে রাজি করানো সম্ভব হয়নি। এখন বঙ্গোপোসাগরে কোরীয় কোম্পানি দাইয়ু ছাড়া বর্তমানে ভারতীয় কোম্পানি অয়েল অ্যান্ড ন্যাচারাল গ্যাস করপোরেশন (ওএনজিসি) অগভীর সমুদ্রে ৪ ও ৯ নম্বর ব্লকে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের কাজ করছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে পেট্রোবাংলার জেনারেল ম্যানেজার (জিএম) শাহনেওয়াজ পারভেজ বলেন, ‘আমরা পসকো দাইয়ুর চিঠি পেয়েছি গত সপ্তাহের শেষে। বিষয়টি নিয়ে আলোচনা চলছে। আমরা চাই না, পসকো দাইয়ু চলে যাক।’ তাই তাদের উৎপাদন-অংশীদারিত্ব চুক্তির মধ্যে থেকেই কীভাবে সুবিধা দেওয়া যায়, তা নিয়ে আলোচনা চলছে বলেও তিনি জানান।

/এমএনএইচ/

লাইভ

টপ