জাতীয় গ্রিডের নিরাপত্তার স্বার্থেই সৌরবিদ্যুতে ‘ধীরে চলো’ নীতি

Send
সঞ্চিতা সীতু
প্রকাশিত : ২১:৫৫, নভেম্বর ২১, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ২২:৪০, নভেম্বর ২১, ২০১৯

সৌরবিদ্যুৎদেশে প্রায় দেড় হাজার মেগাওয়াটের সৌর বিদ্যুৎকেন্দ্র তৈরির অনুমোদন দিয়েছে সরকার। আগে এসব কেন্দ্রকে দ্রুত বিদ্যুৎ উৎপাদনে আসতে বললেও এখন বলা হচ্ছে, অতিরিক্ত সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের ফলে জাতীয় গ্রিড ঝুঁকিতে পড়তে পারে। তাই জাতীয় গ্রিডের নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনা করে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে ‘ধীরে চলো’ নীতিতে এগোচ্ছে বিদ্যুৎ বিভাগ।

বর্তমানে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা ২২ হাজার ৫৬২ মেগাওয়াট। এরমধ্যে দেশে গড়ে ৮ থেকে ১০ হাজার মেগাওয়াট উৎপাদন হচ্ছে। বলা হচ্ছে, সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদিত হয় সূর্যের আলো থেকে। এই আলো হুট করে কমে গেলে অন্য উৎস থেকে বিদ্যুতের সরবরাহ বাড়াতে হয়। এটি করতে না পারলে গ্রিড ঝুঁকিতে পড়ে। এমনকি ব্ল্যাকআউটও হতে পারে। এ কারণে সৌর বিদ্যুতের উৎপাদন কমে গেলে বিকল্প উৎস থেকে বিদ্যুৎ সরবরাহ বাড়াতে হবে। এখন সেই বিষয়টি নিয়ে চিন্তা করা হচ্ছে।

এদিকে, টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (স্রেডা) জানায়, দেশে মোট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে ৩৭১ দশমিক ১৬ মেগাওয়াট। এরমধ্যে সব জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হয় না। বেশিরভাগই অফ-গ্রিড সৌরবিদ্যুৎ। ৩৭১ মেগাওয়াটের মধ্যে ২৯৭ দশমিক ৮৯ মেগাওয়াট অফ-গ্রিড ও মাত্র ৭৩ দশমিক ২৭ মেগাওয়াট গ্রিডে সরবরাহ করা হচ্ছে।

জাতিসংঘ টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) বাস্তবায়নে দেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনে ১০ ভাগ নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় নবায়নযোগ্য জ্বালানি নীতিমালায় ২০২০ সালের মধ্যে মোট উৎপাদিত বিদ্যুতের ১০ ভাগ অর্থাৎ ২ হাজার মেগাওয়াট নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎস থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য ঠিক করেছে। সে অনুযায়ী, আগামী বছর অর্থাৎ ২০২০ সালে ৩০০ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ এবং ২০২১ সালে আরও ২৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করার পরিকল্পনা করা হয়েছে। ২০১৮ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত মোট এক হাজার ১৫০ দশমিক ৭৪ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য ঠিক করা হয়েছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিদ্যুৎ সচিব ড. আহমদ কায়কাউস বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমরা সব সময় সৌরবিদ্যুৎকে গুরুত্ব দিচ্ছি। এতদিন মোট উৎপাদনের ১০ ভাগ সৌরবিদ্যুৎ করার পরিকল্পনা করার কথা বলেছি। কিন্তু এই ১০ ভাগ কিন্তু সব সময় চলবে না। এখন আমাদের গড়ে উৎপাদন হয় আট থেকে দশ হাজার মেগাওয়াট। এরমধ্যে যদি দুই হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন করি, তাহলে আমাদের গ্রিড ভারসাম্যহীন হয়ে যাবে। অনেককে এলওআই (লেটার অব ইনটারেস্ট) দিয়েছি। কিন্তু সেটা ধীরে ধীরে আগাতে হবে। কারণ, সৌরবিদ্যুৎ খুব ভেরিয়েবল পাওয়ার।’

বিদ্যুৎ সচিব বলেন, ‘আবহাওয়ার কথা চিন্তা করেই আমরা এই পরিকল্পনা করছি। কিন্তু এখনও আমাদের সৌরবিদ্যুৎ খুব বেশি নেই। ৪০০/৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমাদের জন্য কোনও সমস্যা তৈরি করবে না। আমাদের মোট ক্ষমতার যদি ১০ ভাগ সৌরবিদ্যুৎ হয়, তাহলে গ্রিডের কোনও ক্ষতি হবে না।’

সম্প্রতি বিদ্যুৎ বিভাগে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে জানানো হয়, দেশে জমির খুব অভাব রয়েছে। এছাড়া, দেশে সূর্যের আলোর সঙ্গে আর্দ্রতা বেশি থাকায় সোলারের শক্তি তুলনামূলক কম। এরপরও মন্ত্রণালয় থেকে এ পর্যন্ত ১ হাজার ৬০০ মেগাওয়াট সোলার উৎপাদনের অনুমোদন দেওয়া হলেও মাত্র ৪০ মেগাওয়াট উৎপাদনে এসেছে। বাকিটা বাস্তবায়ন কষ্টসাধ্য ও ব্যয়বহুল হয়ে পড়েছে।

সভায় আরও জানানো হয়, সোলার শুধু দিনের বেলায় বা সূর্যের আলোতে কাজ করে, রাতে করে না। কিন্তু বিদ্যুতের সর্বোচ্চ চাহিদা থাকে রাতে। এক্ষেত্রে সোলার সংখ্যা বাড়ালে রাতের চাহিদা মেটানো যাবে না। না হয় ক্ষমতা দ্বিগুণ করতে হবে।
এদিকে, সোলারের একটি বড় অসুবিধা হলো, দিনের বেলায় হঠাৎ মেঘ এলে সোলার বন্ধ হয়ে যায়। এর ফলে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ সিস্টেম মারাত্মক হুমকির মধ্যে পড়ে যেতে পারে। এ কারণে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ বা অনুপাতের বাইরে সোলার স্থাপন করা সম্ভব নয়।
বর্তমানে বিদ্যুৎ উৎপাদিত হচ্ছে নয় থেকে দশ হাজার মেগাওয়াট। এরমধ্যে সোলারের মাধ্যমে উৎপাদন যদি ২ হাজার মেগাওয়াট রাখা হয় এবং কোনও কারণে বৃষ্টি আসে, তাহলে পুরো গ্রিডে বিপর্যয় ঘটবে। এসব বিষয় বিবেচনা করে সোলারের বিষয়টি নিয়ে ধীরগতিতে এগোনো হচ্ছে।
সভার বিষয়ে জানতে চাইলে বিদ্যুৎ বিভাগের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, সৌরবিদ্যুৎ একটি ব্যয়বহুল ও সময়সাপেক্ষ প্রকল্প। এগুলো হঠাৎ করে নির্মাণ করা যায় না। ধীরে ধীরে কাজ করা হয়। আমরা এক হাজার ৬০০ মেগাওয়াটের অনুমোদন দিয়েছি। এগুলো আসতে সময় লাগবে। ততদিনে আমাদের গ্রিডের ক্ষমতা আরও বেড়ে যাবে। আর সব কেন্দ্র আলোর মুখ দেখবে কিনা, তারও ঠিক নেই। তাই কেন্দ্রের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। যদি সব কেন্দ্র উৎপাদনে চলে আসে, তখন জাতীয় গ্রিডে বিপর্যয় ঘটতে পারে। সে কারণেই ‘ধীরে চলো’ নীতি অনুসরণ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, ‘‘গ্রিডের নিরাপত্তার কথা ভেবেই এই ‘ধীরে চলো’ নীতিতে সৌর বিদ্যুৎ উৎপাদন করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। দেশের ক্লিন এনার্জির জন্য সৌরবিদ্যুৎ আনতে হবে। কিন্তু গ্রিডে কতটা সৌরবিদ্যুৎ সরবরাহ করা সম্ভব, তার সঠিক পরিমাণ নির্ধারণ করা জরুরি।’ তারা সে বিষয়টি মনিটরিং করছেন বলেও তিনি জানান।

/এমএনএইচ/এমওএফ/

লাইভ

টপ