বিদ্যুতের মূল্য বাড়ানোর শুনানি প্রশ্নের মুখে!

Send
সঞ্চিতা সীতু
প্রকাশিত : ২০:৫৬, ডিসেম্বর ০১, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৮:৪৩, ডিসেম্বর ০২, ২০১৯

বিদ্যুতের-মুল্য-বাড়ানো-ইস্যুতে-গণশুনানিবিদ্যুতের মূল্য বাড়ানোর শুনানি প্রশ্নের মুখে পড়েছে। ভোক্তা, ব্যবসায়ী ও রাজনীতিবিদদের অভিযোগ—বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) ও নর্দার্ন ইলেকট্রিসিটি সাপ্লাই কোম্পানি লিমিটেড (নেসকো)—এই দুটি কোম্পানির কোনোটিই লোকসানের কোনও প্রমাণ দিতে পারেনি। তারা লাভ করছে। তাদের প্রশ্ন—এরপরও কেন বিদ্যুতের মূল্য বাড়ানোর উদ্যোগ নিতে হচ্ছে এবং তা শুনানি করতে হচ্ছে? বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনে (বিইআরসি) শুনানিতে এসব প্রশ্নের কোনও উত্তর মিলছে না। গণশুনানির বেশিরভাগ প্রশ্নই এড়িয়ে যাচ্ছে কমিশন, উৎপাদনকারী ও বিতরণকারীরা।

বিদ্যুৎ উৎপাদনে ক্যাপাসিটি পেমেন্ট দিতে গিয়েই লোকসানে পড়েছে পিডিবি। কেন চাহিদার দ্বিগুণ উৎপাদন ক্ষমতা তৈরি করা হলো—এমন প্রশ্নের উত্তর এড়িয়ে গেছে কমিশন ও পিডিবি। অন্যদিকে রবিবার (১ ডিসেম্বর) দুটি বিতরণ প্রতিষ্ঠান পিডিবি ও নেসকো তাদের লোকসান প্রমাণ করতে ব্যর্থ হয়েছে। লাভে থাকা প্রতিষ্ঠানের শুনানি করতে পারে কিনা, কমিশনে তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

যদিও কমিশনের সদস্য মিজানুর রহমান বলছেন, ‘পাইকারি মূল্য বাড়ানো পাস থ্রু (পাইকারি পর্যায়ে মূল্য বাড়লে স্বয়ংক্রিয়ভাবে গ্রাহক পর্যায়েও বাড়বে) হবে। এক্ষেত্রে মূল্য কমলেই পাস থ্রু হবে।’ এই সময় কমিশনের চেয়ারম্যান মনোয়ার ইসলাম, সদস্য ইমদাদুল হক ভুঁইয়া ও রহমান মুর্শেদ উপস্থিত ছিলেন।

ভোক্তাদের বক্তব্য শোনার চেয়ে বিতরণ কোম্পানির কথা শোনায় আগ্রহী কমিশন বলে অভিযোগ করেছেন কনজুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)-এর জ্বালানি উপদেষ্টা শামসুল আলমসহ অনেকেই। এ সময় বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য রুহিন হোসেন প্রিন্স, লেবার পার্টির চেয়ারম্যান ডা. মোস্তাফিজুর রহমান ইরান, বাংলাদেশ মুঠোফোন গ্রাহক অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মহিউদ্দিন আহমেদ, বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রফতানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ)-সহ বিভিন্ন ব্যবসায়ী সংগঠন ও সাংবাদিকরা কথা বলেন।

মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল অভিযোগ করেন, ‘এখন বিদ্যুতের লাইন নষ্ট হলে কেউ যদি অভিযোগ করেন, তাহলে বিতরণ কোম্পানির লোকজন এসে সেই লাইন ঠিক করে। এরপর যে ফোন দিয়েছিল, তাকে একটি বিল ধরিয়ে দেয়। যা আইনসম্মত নয়। প্রায়ই এ ধরনের ঘটনা ঘটছে। এমনকি আমরা বাসার সামনেই লাইনের সমস্যার কারণে ফোন দিলে দ্রুত লাইন ঠিক করা হয়। কিন্তু লাইন ঠিক করে আমার হাতে মেরামত বাবদ একটি বিল ধরিয়ে দেওয়া হয়।’ তিনি বলেন, ‘বিদ্যুৎ খাতে নানা অপচয় হচ্ছে। একটি বিশেষ কোম্পানির কাছ থেকে বেশি মূল্যে বিদ্যুৎ কেনা হচ্ছে। অন্যদিকে, কম মূল্যের অন্য কোম্পানির বিদ্যুৎ না কেনায় সেসব কোম্পানির বিদ্যুৎকেন্দ্র মাসের পর মাস বসে থাকছে। এতে বিনিয়োগকারী ও সরকার—দুই পক্ষেরই লোকসান গুনতে হচ্ছে। এসব অপচয়ের বোঝা জনগণের ঘাড়ে দেওয়া যাবে না।’

ক্যাবের জ্বালানি উপদেষ্টা শামসুল আলম বলেন, ‘প্রতিবার গণশুনানিতে আমরা কথা বলি। সেসব অভিমত নোট করা হয়। কিন্তু সেগুলোর কোনও বাস্তবায়ন আমরা দেখি না। এমনকি সেগুলো আসলে কেন নোট করা হয়, তারও কোনও ব্যাখ্যা নেই। কমিশন বরাবরই কোম্পানিগুলোর অভিমতেরই গুরুত্ব দেয়। মূল্য বাড়িয়েই দেই। গত কয়েক বছরের শুনানির দিকে তাকালে আমরা তাই দেখতে পাই। জনগণের কথা যদি শোনা না হয়, তাহলে গণশুনানি না করে শুধু কোম্পানিগুলোর প্রস্তাবের ভিত্তিতে নিজেরা যাচাই-বাছাই করে মূল্য বাড়িয়ে দিলেই হয়।’ সাধারণ মানুষকে শুনানিতে ডাকার কী দরকার বলেও তিনি প্রশ্ন তোলেন।

এর আগে এক বছরের জন্য তাদের বিদ্যুতের মূল্য কী পরিমাণ হওয়া উচিত, তা নির্ধারণের প্রস্তাব দেয় বিতরণ কোম্পানিগুলো। কিন্তু এবার বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানিগুলো তাদের বিতরণ ব্যয় নির্ধারণের বিষয়ে আলোচনা করছে।

এ বিষয়ে রুহিন হোসেন প্রিন্স বলেন, ‘গণশুনানিতে গত দুই দিনে যেসব প্রস্তাব কোম্পানিগুলো জমা দিয়েছে, তাতে কোথাও বিদ্যুতের মূল্য বাড়ানোর পরিমাণের কথা উল্লেখ করা হয়নি। বিষয়টি এমন যে, কমিশনের ওপর তারা ছেড়ে দিয়েছে। এভাবে একক অভিমতের ভিত্তিতে মূল্য বাড়ানো কোনও যুক্তির মধ্যেই পড়ে না।’ কমিশনকে ভোক্তাদের অভিমত শোনা ও তা বাস্তবায়নের অনুরোধ করেন তিনি।

মোস্তাফিজুর রহমান ইরান বলেন, ‘বিদ্যুৎ খাতে যে পরিমাণ অপচয় হচ্ছে, এসব অপচয় বন্ধ করা গেলে বিদ্যুতের মূল্য বাড়ানোর প্রয়োজনই হয় না। এর মাধ্যমে বিদ্যুৎ খাতে অপচয় করা হবে আবার বিদ্যুতের মূল্য বাড়িয়ে জনগণকে হয়রানিতেও ফেলা হবে।’ বিষয়টি মোটেও গ্রহণযোগ্য নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

/এমএনএইচ/এমওএফ/

লাইভ

টপ