ব্যাংক ঋণ: করুণ দশা বেসরকারি খাতে

Send
গোলাম মওলা
প্রকাশিত : ২৩:৩৪, ডিসেম্বর ০৪, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১১:৪২, ডিসেম্বর ০৫, ২০১৯

টাকাবেসরকারি খাতে ঋণ পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে। গত কয়েক বছর ধরে অব্যাহতভাবে বেসরকারি খাতে ঋণের হার কমছে। চলতি বছরের সেপ্টেম্বরের তুলনায় অক্টোবরে বেসরকারি খাতে ঋণের হার কমেছে প্রায় দশমিক ৬২ শতাংশ। অক্টোবরে ব্যাংক ১০ দশমিক ০৪ শতাংশ ছিল ব্যাংক ঋণের হার। এই হার গত দশ বছরের মধ্যে সবচেয়ে কম। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, ব্যাংক ঋণের ক্ষেত্রে বর্তমানে বেসরকারি খাতে করুণ দশা বিরাজ করছে।  আর এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে উৎপাদন ও কর্মসংস্থানে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত কয়েক মাস ধরে ঋণ প্রবৃদ্ধির হার ধারাবাহিক কমছে। চলতি অর্থবছরের অক্টোবরে ঋণ প্রবৃদ্ধি ১০ দশমিক ০৪ শতাংশ হয়েছে। যা আগের মাস, সেপ্টেম্বরে ছিল ১০ দশমিক ৬৬ শতাংশ। আগস্টে ছিল ১০ দশমিক ৬৮ শতাংশ।

এ প্রসঙ্গে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, ‘আগামীতে বেসরকারি খাতে ঋণের হার আরও কমে যেতে পারে। কারণ, আগামী মাসগুলোয় সরকারের ঋণ নেওয়া বেড়ে যাবে।’ তিনি বলেন, ‘২০১৩ ও ২০১৪ এর অস্থির সময়ের চেয়েও বর্তমানে ঋণ প্রবৃদ্ধি কম।’

সামগ্রিক অর্থনীতি নাজুক পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে উল্লেখ করে ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, ‘ব্যবসায়ীরা এদেশে ব্যবসা করার পরিবেশ পাচ্ছেন না। গত দশ বছরে ব্যাংক থেকে অনেকেই টাকা তুলে বিদেশে পাচার করেছেন। যে কারণে এখন ব্যাংকে টাকার সংকট দেখা দিয়েছে। তবে এই করুণ  অবস্থার মধ্যেও সরকার ব্যাংক থেকে বিপুল পরিমাণ ঋণ নিয়েছে। এর সঙ্গে খেলাপি ঋণ বেড়ে গেছে। আর খেলাপি বেড়ে যাওয়ায় সুদের হারও বেড়ে গেছে। ফলে ঋণের প্রবৃদ্ধি কমে গেছে।’

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, রাজনৈতিক অস্থিরতা তথা বিএনপি-জামায়াতের জ্বালাও-পোড়াও অগ্নিসংযোগ, ও নাশকতার সময়ও (২০১৩ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত) বেসরকারি খাতে এত কম প্রবৃদ্ধি ছিল না। ২০১৩ সালে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি ছিল ১০ দশমিক ৮০ শতাংশ। ২০১৪ সালে ঋণের প্রবৃদ্ধি ছিল ১২ দশমিক ০৩ শতাংশ। অথচ বর্তমানে ঋণ প্রবৃদ্ধি কমে ১০ শতাংশে নেমে এসেছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হিসেবে এই অর্থবছরের প্রথম মাস  জুলাইতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ছিল ১১ দশমিক ২৬ শতাংশ। জুনে ঋণ প্রবৃদ্ধি ছিল ১১ দশমিক ২৯ শতাংশ। মে মাসে ছিল ১২ দশমিক ১৬ শতাংশ। এর আগের মাস এপ্রিলে ছিল ১২ দশমিক শূন্য ৭ শতাংশ, মার্চে প্রবৃদ্ধি ছিল ১২ দশমিক ৪২ শতাংশ। ফেব্রুয়ারিতে ছিল ১২ দশমিক ৫৪ শতাংশ ও জানুয়ারিতে ছিল ১৩ দশমিক ২০ শতাংশ।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন বলছে, ২০০৮ সালের সেপ্টেম্বর শেষে বার্ষিক ঋণ প্রবৃদ্ধি ছিল ২৬ দশমিক ৫৫ শতাংশ। ২০১০ সালের সেপ্টেম্বর শেষে বার্ষিক ঋণ প্রবৃদ্ধি ছিল ২৬ দশমিক ৬৫ শতাংশ। ২০১১ সালে মার্চে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ২৯ দশমিক ১৩ শতাংশে উঠে।

এদিকে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি কমলেও সরকারের ঋণ গ্রহণের হার বাড়ছে। এই অর্থবছরের বাজেট ঘাটতি মেটাতে ব্যাংক খাত থেকে সরকারের ঋণ গ্রহণের কথা ছিল ৪৭ হাজার ৩৬৪ কোটি টাকা। এর মধ্যে গত ১ জুলাই থেকে ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত সরকার ঋণ নিয়েছে ৩৮ হাজার ৬৯৭ কোটি টাকা। অর্থাৎ মাত্র চার মাসেই সরকার ৮১ শতাংশের বেশি ঋণ নিয়েছে।

এনবিআরের ট্যাক্স রেভিনিউ কমে যাওয়ার কারণে সরকারের ঋণ বেড়ে গেছে বলে মনে করেন ড. আহসান এইচ মনসুর। তিনি বলেন, ‘ট্যাক্স রেভিনিউ যেভাবে কমছে, তাতে সরকারকে ব্যাংক থেকে আরও ঋণ করতে হতে পারে। এতে বেসরকারি খাতও আরও সংকুচিত হতে পারে।

ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের (ডিসিসিআই) সাবেক সভাপতি আসিফ ইব্রাহিম বলেন, ‘বেসরকারি খাতের শ্লথগতি লক্ষ করা যাচ্ছে। এর প্রধান কারণ, ব্যাংক ঋণে উচ্চ সুদ হার। এছাড়া, আরেকটি কারণ হলো বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল ছাড়া শিল্পকল-কারখানা করার অনুমতি পাচ্ছেন না ব্যবসায়ীরা। এ কারণেও বেসরকারি খাতে  ঋণের প্রবৃদ্ধি কমে যাচ্ছে।’

বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়ার তথ্যই বলে দেয়, বেসরকারি খাতে বিনিয়োগও হচ্ছে না। অর্থনৈতিক সমীক্ষার তথ্য মতে, গত বছর তথা ২০১৮ সালে জিডিপিতে বেসরকারি খাতের অবদান ২৩ দশমিক ৪ শতাংশ। ২০১৩ সালে জিডিপিতে বেসরকারি খাতের অবদান ছিল ২২ শতাংশ। অর্থাৎ গত ৫ বছরে জিডিপিতে বেসরকারি খাতের অংশ বেড়েছে মাত্র ১ দশমিক ৪ শতাংশ।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের প্রফেসর এম এ তসলিম বলেন, ‘‘ভবিষ্যতের ‘ভয়’ ব্যবসায়ীদের বিনিয়োগে নিরুৎসাহিত করছে।’ তার মতে, ‘দুই কারণে ব্যবসায়ীরা বিনিয়োগে নিরুৎসাহিত হতে পারেন। প্রথম, দুর্নীতি। দ্বিতীয়ত, রাজনীতি। ব্যবসায়ীদের আশঙ্কা, অদূর ভবিষ্যতে দুর্নীতি আরও বেড়ে যেতে পারে। আর সেক্ষেত্রে তাদের ব্যবসার খরচও বাড়বে। ফলে বিনিয়োগ করে হয়ত রিটার্ন ফেরত পাওয়া যাবে না।’

 এম এ তসলিম বলেন, ‘ব্যবসায়ীরা পরবর্তী ১০ থেকে ১৫ বছরের প্ল্যান করার পর বিনিয়োগের কথা চিন্তা করেন। রিটার্ন ফেরত পাওয়ার আশা না থাকলে কেউ বিনিয়োগে যান না। বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহ কমে যাওয়া তারই প্রধান কারন।’ তিনি উল্লেখ করেন, ‘এখনও ব্যাংকে যথেষ্ট পরিমাণ টাকা আছে, তবে বেসরকারি খাতের কেউই এই টাকা নিতে চায় না।’  দেশে দুর্নীতি যেভাবে বেড়েছে, তাতে ব্যাংক থেকে টাকা নিয়ে কোনও প্রতিষ্ঠান গড়ে কেউ লাভ করতে পারবে না  বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

/এমএনএইচ/এমওএফ/

লাইভ

টপ