বিদ্যুৎ উৎপাদনে সঠিক মাত্রার জ্বালানি মিশ্রণ নির্ধারণে লাগবে আরও ১০ বছর

Send
সঞ্চিতা সীতু
প্রকাশিত : ০৭:৫৬, ডিসেম্বর ১২, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৭:০৬, ডিসেম্বর ১২, ২০১৯

বিদ্যুৎসঠিক মাত্রায় ফুয়েল মিক্সিং বা জ্বালানি মিশ্রণে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য আরও ১০ বছর অপেক্ষা করতে হবে। সম্প্রতি দেশে উৎপাদনে আসা প্রকল্পের সঙ্গে ভবিষ্যৎ প্রকল্পগুলো বিশ্লেষণ করে এ কথা বলা হচ্ছে। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) এক গবেষণা প্রতিবেদনে এ তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।

ওই প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, ২০৩০ সালে মিশ্র জ্বালানিতে উৎপাদনে একটি ভারসাম্য আসতে পারে। এখন বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড জ্বালানি হিসেবে তেলের ব্যবহার বেশি করাতে দাম বাড়ছে বলে দাবি করছে। তবে এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আরও অন্তত ১০ বছর সময় অপেক্ষা করতে হবে। ওই সময় তেলচালিত বিদ্যুতের উৎপাদন ১২ ভাগে নামিয়ে আনা সম্ভব হবে বলে প্রতিবেদনটিতে মনে করা হচ্ছে।
পিডিবির জেনারেল ম্যানেজার (বাণিজ্যিক) মীর কাউসার আলী জানান, আমরা তেলচালিত বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর মেয়াদ শেষ হলে আর নবায়ন করছি না। এভাবে তেলচালিত কেন্দ্রগুলোকে উৎপাদন থেকে সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে।
ফুয়েল মিক্সিং সাধারণত দুই কারণে করা হয়। এর একটি কারণ হচ্ছে জ্বালানির সংস্থান করা। অন্য কারণ দাম নিয়ন্ত্রণ। যে জ্বালানির দাম কম সেই জ্বালানিতে বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদন করলে উৎপাদন খরচ কমে আসে। আবার অনেক সময় সেই জ্বালানি না পাওয়া গেলেও বিকল্প জ্বালানিতে বিদ্যুৎ পাওয়া যায়। যেমন এখন ডিজেলে বিদ্যুৎ উৎপাদন করলে দাম পড়ে ইউনিট প্রতি ২৭ টাকা। আবার ফার্নেস অয়েলে যার দাম পড়ে ১৩ টাকা। অন্যদিকে, কয়লাতে বিদ্যুতের উৎপাদন খরচ হয় ৬ টাকার মতো। আর এলএনজিতে সাত টাকা আর দেশীয় গ্যাসে ভরচ পড়ে আড়াই থেকে তিন টাকা। তবে যেহেতু দেশে গ্যাসের সংকট রয়েছে তাই বিভিন্ন ধরনের জ্বালানিতে বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে হয়।
পাওয়ার সিস্টেম মাস্টার প্ল্যানে বলা হচ্ছে, মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের ৩৫ ভাগ হবে কয়লাতে, ৪৫ ভাগ হবে গ্যাস এবং এলএনজিতে, তরল জ্বালানি থেকে আসবে ১০ ভাগ। এরসঙ্গে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে আসবে ১০ ভাগ। কিন্তু, এখন সব কিছুর চেয়ে তেল এবং গ্যাসেই বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে।
বিইআরসির প্রতিবেদন বলছে, ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের বিদ্যুতের উৎপাদন ক্ষমতা ৪৬ হাজার ৫৯৮ মেগাওয়াট করার লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করেছে সরকার। এরমধ্যে এলএনজি মিশ্রিত গ্যাস থেকে ২০ হাজার ৩০৮ মেগাওয়াট উৎপাদন করা হবে-যা মোট উৎপাদনের ৪৪ শতাংশ। এরপর কয়লা থেকে ১৪ হাজার ৯৩২ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া যাবে-যা মোট উৎপাদনের ৩২ শতাংশ, এরপর তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে উৎপাদন হবে ৫ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট, যা মোট উৎপাদনের ১২ শতাংশ। এছাড়া ৩ হাজার ৪৯৬ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানি করা হবে, যা হবে চাহিদার ৮ শতাংশ। অন্যদিকে, জল থেকে এখন পযন্ত যে ২৩০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া যায়, তাইই ঠিক থাকবে, এর পরিমাণ মোট উৎপাদনের মাত্র ১ শতাংশ।
এ হিসেব থেকে এটা পরিষ্কার, তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে ২০৩০ সালেও বের হয়ে আসতে পারবে না বাংলাদেশ। ২০১৬ সালে যেখানে ৩ হাজার ৬৯২ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ তেল থেকে উৎপাদন হতো, এখন ২০১৯ সালে তা আরও বেড়ে ৭ হাজার ৪৪৪ মেগাওয়াটে পৌঁছেছে। আগামী বছর তা আরও বেড়ে ৭ হাজার ৮৫৫ মেগাওয়াট হবে। ২০২২ সাল পর্যন্ত এই পরিমাণ বৃদ্ধি চলতেই থাকবে। তবে এরপর আবার কিছুটা কমে যাবে। সরকারের লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী, ২০২৩ সালে গিয়ে তেল থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন হবে ৬ হাজার ৭৮৭ মেগাওয়াট। এরপর ২০৩০ সালে গিয়ে হবে ৫ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট।
এছাড়া অন্য জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনও বাড়বে। এরমধ্যে সবচেয়ে বেশি বাড়বে গ্যাস থেকে। ২০১৬ সালে যেখানে গ্যাস থেকে সাত হাজার ৪০১ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হতো চলতি ২০১৯ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১০ হাজার ৭৪৬ মেগাওয়াট, পাঁচ বছর পর ২০২৪ সালে তা গিয়ে দাঁড়াবে ১৫ হাজার ৯ মেগাওয়াট, এরপরের তিন বছর পর ২০২৬ সালে ১৭ হাজার ৬৯৮ মেগাওয়াটে এবং ২০৩০ সালে তা গিয়ে দাঁড়াবে ২০ হাজার ৩০৮ মেগাওয়াটে।
একইভাবে কয়লা দিয়ে এখন বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হচ্ছে ২৫০ মেগাওয়াটের মতো। সেটি ২০৩০ সালে গিয়ে দাঁড়াবে ১৪ হাজার ৯৩২ মেগাওয়াটে, আমদানি করা বিদ্যুৎ এখন প্রায় দেড় হাজার মেগাওয়াট, ভবিষ্যতে এর পরিমাণ আরও বাড়বে। ২০৩০ সালে গিয়ে তা দাঁড়াতে পারে ৩ হাজার ৪৯৬ মেগাওয়াটে। অবশ্য বিদ্যুৎ উৎপাদনের এই লক্ষ্যমাত্রা সরকারের দিক-নির্দেশনা এবং আনুষাঙ্গিক নানা পরিস্থিতির ওপর নির্ভরশীল।

বিইআরসি সদস্য মিজানুর রহমান এ বিষয়ে বলেন, বিদ্যুৎ উৎপাদনে ফুয়েল মিক্সিং একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কিন্তু নানা সংকটের কারণে সব ক্ষেত্রে তা ঠিক রাখা যায় না। এখন যেমন তেলের আধিক্য বেশি। এটা আস্তে আস্তে কমিয়ে আনতে হবে। সরকার সেই পদক্ষেপগুলো নিচ্ছে।

 

/টিএন/

লাইভ

টপ