শ্রমিককে কারখানায় টেনে আনার সিদ্ধান্ত অমানবিক, ঝুঁকি ঠেকানোর প্রস্তুতি নেই

Send
উদিসা ইসলাম
প্রকাশিত : ২০:৫৭, এপ্রিল ০৪, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ২১:০৫, এপ্রিল ০৪, ২০২০

সামাজিক দূরত্ব না মেনে চাকরি বাঁচানোর আশায় ট্রাকে গাদাগাদি করে উত্তরবঙ্গ থেকে ঢাকার দিকে আসছেন শ্রমিকরা

করোনাভাইরাসের ঝুঁকির মধ্যেই বন্ধ গার্মেন্টস খুলে দেওয়ার সিদ্ধান্তকে অদায়িত্বশীল, অমানবিক ও পুরো দেশের জন্য বড় হুমকি হিসেবে সমালোচনা করছে শ্রমিক সংগঠনগুলো। এসব সংগঠনের নেতারা বলছেন, যেখান সংক্রমণ এড়াতে সামাজিক ছুটি চলছে সেখানে এ ধরনের সিদ্ধান্ত কারও জন্যই স্বস্তির নয়। এমনকি গার্মেন্টস শ্রমিকের কাজের যে ধরন ও পরিবেশ তাতে স্বাস্থ্যবিধি মেনে সুরক্ষার ব্যবস্থা করা অসম্ভব বলেও মন্তব্য তাদের। এদিকে কারখানাগুলো খুলে দেওয়ায় মালিকদের সমালোচনায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে চলছে ঝড়। তাদের প্রশ্ন, ৫ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনার সিদ্ধান্ত হওয়ার পরে সাধারণ ছুটি শেষ না হতেই গার্মেন্ট খুলে দেওয়ার ঘোষণা কেন?

দেশজুড়ে সামাজিক সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছে  শনিবার (৪ এপ্রিল) স্বাস্থ্য অধিদফতরের সংবাদ সম্মেলনে এমন কথা বলার পর এই  অবরুদ্ধ অবস্থার মধ্যেই পোশাক কারখানাগুলোর ছুটি শেষ হচ্ছে আজ শনিবার। কিছু কিছু কারখানার ছুটি আগামী ১১ এপ্রিল পর্যন্ত বাড়ানো হলেও অধিকাংশ কারখানা খুলছে আগামীকাল রবিবার।

অ্যাকটিভিস্ট আরিফ জেবতিকের স্ট্যাটাস

গার্মেন্টস শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের সাধারণ সম্পাদক জলি তালুকদার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, গার্মেন্টস শ্রমিকরা বেশ ঝুঁকিতে পড়ে গেল। আমাদের শুরু থেকেই দাবি ছিল বেতনসহ ছুটি নিশ্চিত করতে হবে। আজকে শ্রমিকরা যেভাবে ঢাকায় ফিরছে সেটা মারাত্মক স্বাস্থ্য ঝুঁকি ডেকে আনতে পারে। এতে করে মালিকরা যদি ভাবে তারা রক্ষা পেয়ে যাবেন তাহলে সেটা বৈজ্ঞানিক হয় না। তিনি এও বলেন, আমরা বলছি খুলে দেওয়ার কথা, কিন্তু অনেক কারখানা বন্ধই হয়নি সেগুলো নিয়ে কথা বলছি না। শতভাগ কারাখানা তো বন্ধ হয়নি।

সরকার যেখানে মজুরি বাবদ ৫ হাজার কোটি টাকা দিচ্ছে, সেখানে পুরো সময়টা ছুটি কাটাতে দেওয়া যাবে না কেন প্রশ্ন করে জলি বলেন, মালিকরা যে পরিমাণ অর্ডার বাতিল হওয়ার কথা বলছেন, বাস্তবে সে পরিমাণ অর্ডার বাতিল হয়নি। অর্ডার না থাকলে মালিকরা শ্রমিকদের টেনে আনতো না। সবার প্রতি বড় ধরনের অন্যায় করা হচ্ছে।

বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, সামাজিক সংক্রমণ এড়াতে ১১তারিখ পর্যন্ত সাধারণ ছুটি দেওয়া হলো অথচ আগামীকাল গার্মেন্টস খুলে দেওয়ার যে সিদ্ধান্ত সেটি সংক্রমণকে পরোক্ষভাবে ডেকে আনার নামান্তর। এর মধ্য দিয়ে লাখ রাখ শ্রমিকের জীবনকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দেওয়া হচ্ছে। একদিকে ৫ হাজার কোটি টাকা অনুদান দেওয়া হচ্ছে। আরেকদিকে সেই শ্রমিকদের জন্য আপনি সুরক্ষার ব্যবস্থা করছেন না।

শিক্ষক আরিফা রহমান রুমার স্ট্যাটাস

এই নেতা বলেন, গার্মেন্ট কারখানা এখনও লোকসানের মধ্যে নেই, উৎপাদনেই আছে। তার সঙ্গে সরকারের টাকাটা যোগ হয়েছে। দেশের সমস্ত মানুষকে ছুটিতে রেখে গার্মেন্টস শ্রমিকদের কাজে টেনে আনা অমানবিক। বাংলাদেশকে ভয়াবহ করোনা ঝুঁকিতে ফেলে দেওয়া হলো। এটা দায়িত্বশীল কোনও কাজ হতে পারে না।

এদিকে ফেসবুকে নানা প্রশ্ন ছুড়ে স্ট্যাটাস দিয়েছেন নানা পেশাজীবী, উন্নয়নকর্মী, অ্যাক্টিভিস্টরা। সাবেক গণমাধ্যমকর্মী সাইফুল হাসান লিখেছেন,  করোনা থেকে বাঁচতে সারা বিশ্ব যখন সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার কথা বারবার বলছে, সেখানে পোশাক কারখানা খুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত আত্মঘাতী হতে পারে।

স্ট্যাটাসে তিনি আরও লিখেছেন, পোশাক মালিকদের অবস্থাটাও বুঝি। দেশের সবচেয়ে বড় রফতানি খাত। সর্বোচ্চ সংখ্যক কর্মসংস্থানও এ খাতের। এ সত্ত্বেও করোনার মতো ছোঁয়াচে ভাইরাস থেকে বাঁচতে এবং দেশকে রক্ষায় আরও সপ্তাহখানেক কারখানা বন্ধ রাখাটাই সম্ভবত সবচে ভালো হতো। একদিকে ছুটি, অন্যদিকে কারখানা খোলা, কেন এই বৈপরীত্য?

অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট আরিফ জেবতিক একটু বিরূপ মন্তব্য করেই লিখেছেন, খালি গার্মেন্টস কেন, সবকিছু খুলে দেন। দেশে লোকের অভাব নাই, দুই চার লাখ মরলেই কী আর না মরলেই কী। তবে আপনার পরিবারের কেউ মরবে না, এতোটা আবার আশা কইরেন না।

শিক্ষক আরিফা রহমান রুমার স্ট্যাটাসেও এই বৈপরীত্য উঠে এসেছে। তিনি লিখছেন, ত্রুটি বিচ্যুতি ধরার জন্য নয় কেবল জ্ঞান আহরণের নিমিত্তে নিম্নোক্ত জিজ্ঞাসা: ১। বাংলাদেশ ছাড়া পৃথিবীর আর কোনও কোনও করোনা আক্রান্ত দেশে কি গতকালের জুমার নামাজের জামাত অনুষ্ঠিত হয়েছে? ২। গার্মেন্টস সেক্টরে সরকারের পক্ষ থেকে ৫ হাজার কোটি টাকা প্রণোদনার ঘোষণার পাশাপাশি আজ সুরক্ষার শর্ত সাপেক্ষে গার্মেন্টস সেক্টর খুলে দেওয়া হলো ওদিকে আবার গণপরিবহন বন্ধ থাকায় তারা কেউবা ট্রাকে গাদাগাদি করে আবার কেউবা পদব্রজে ঢাকার উদ্দেশ্য রওনা হওয়ার পুরো বিষয়টা নিয়ে আমি গুবলেট পাকিয়ে বসে আছি। কেউ কি জটটা খুলে দেবেন?

সাবেক গণমাধ্যমকর্মী সাইফুল হাসানের ফেসবুক স্ট্যাটাস

তবে এসব বিষয়ে সমালোচনা না করে সহনশীল হতে বললেন বিজিএমইএ সাবেক সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, দেশের জন্য আমরা যেটুকু রফতানি করার করবো না? যদি শ্রমিকরা না যেত সেটা সবচেয়ে ভাল হতো উল্লেখ করে তিনি বলেন, ১৪ দিনের পরে যখন আসবে তখন রাস্তায় সে সংক্রমিত হবে না সেটাই বা কীভাবে বলবো। তিনি বলেন, ফলে কিছুই যখন নিশ্চিত না তখন একটুও যদি রফতানি করা যায় সেটাতো দেশের জন্যইতো ভালো।

তিনি বলেন, আমাদের শ্রমিকরা তাদের যার যার জায়গাতেই ছিল, ঢাকায় খুব বেশি আসবে না। আমাদের কারখানায় অনেক কাজও নেই। কারো অসুবিধা থাকলে না আসুক। তাতে তার চাকরির সমস্যা হবে না।

কারখানা বন্ধ করার আগেই আমরা স্বাস্থ্যবিধি মেনে শ্রমিকদের কারখানায় ঢুকিয়েছি। ঢুকতেই বেসিন দেওয়া হয়েছে, তাদের উপযোগী করে দেওয়া হয়েছে। সময় লাগলেও শরীরের তাপমাত্রা মাপা হয়। ফ্লোর পরিষ্কার রাখা হয়।

এ বিষয়ে জানতে বিজিএমইএ সভাপতি রুবানা হককে একাধিকবার চেষ্টা করেও ফোনে পাওয়া যায়নি। 

 

/ইউআই/টিএন/

লাইভ

টপ